২২ জুলাই ২০১৯
শিশুদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা

বিচারহীনতায় অপরাধীরা আশকারা পাচ্ছে

-

শিশুর প্রতি ধর্ষণসহ নানা ধরনের হিংস্রতা অনেক বেশি বেড়ে গেছে। আগের বছরের শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার ঘটনার সংখ্যা চলতি বছর প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এ ধরনের জঘন্য অপরাধ এভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণ নিয়ে নানা ধরনের বিশ্লেষণ চলছে। সমাজদেহে এটাকে একটা গুরুতর অসুস্থতা হিসেবে শনাক্ত করছেন অনেকে। বাস্তবতা হচ্ছে, এই দুর্ঘটনা যে হারে ঘটছে আইন বিচার সে হারে অগ্রসর হচ্ছে না। অনেক ঘটনাই নতুন আরেক জঘন্য ঘটনার চাদরে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। কেবল সেইসব জঘন্য ঘটনার বিচার হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে যেগুলোর ব্যাপারে একযোগে মিডিয়া, সরকার ও সুশীলসমাজ সমানভাবে সোচ্চার হচ্ছে। গণমাধ্যম সোচ্চার হলে প্রশাসন ও নাগরিক সমাজ দৌড়ঝাঁপ করে। কিন্তু বেশির ভাগ ঘটনা এভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে না। এ ধরনের ঘটনার সাথে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও ক্ষমতার রাজনীতির সংযোগ রয়েছে।
একটি সহযোগী দৈনিক মানবাধিকার সংস্থা ও শিশু সংগঠনের বরাতে খবর দিচ্ছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে গড়ে মাসে অন্তত ৪৩টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। গত বছর এই হার ছিল অর্ধেকের মতো। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে মোট ধর্ষণের ঘটনা ৬৩০টি। এদের বেশির ভাগের বয়স উল্লেখ রয়েছে ১৮ বছর বা তার নিচে। ধর্ষণ বা ধর্ষণ চেষ্টার কারণে শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে ২১টি। অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটেছে কম বয়সী শিশুদের ক্রমবর্ধমান ধর্ষণের হারে। ধর্ষণের শিকার সবচেয়ে বেশি হয়েছে ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা। আসকের হিসাবে, গত ছয় মাসে শিশু ধর্ষণের মোট ঘটনা ঘটে ২৫৮টি। এ তুলনায় গত বছর ১২ মাসে ঘটেছিল ২৭১টি। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের হিসাবে, গত ছয় মাসে শিশু ধর্ষণের ঘটনা গড়ে ৮৩টি। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে সারা দেশে শিশু ধর্ষণের মামলা হয়েছে তিন শতাধিক। গত পাঁচ বছরে শিশু ধর্ষণ মামলার সংখ্যা তিন হাজারের কিছু বেশি। ঘটনার তুলনায় মামলার সংখ্যা অনেক কম। আবার এসব মামলার গতি সন্তোষজনক এমন বলা যাবে না। সহযোগী দৈনিকটির পক্ষ থেকে ঢাকা জেলার পাঁচটি নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে প্রায় ১৫ বছরে আসা ধর্ষণসংক্রান্ত পাঁচ হাজার মামলার পরিস্থিতি অনুসন্ধান করে তারা দেখতে পেয়েছে, নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোর মাত্র তিন শতাংশের সাজা হয়েছে। শিশু ধর্ষণ নির্যাতন ও শিশুদের বিরুদ্ধে ঘটা সহিংসতা ব্যাপক বেড়ে যাওয়ার কারণটি বোঝা যায়। আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা অনেকটাই এমন অপরাধে প্রণোদনা দিচ্ছে। এ সমাজে সর্বত্র শক্তিমানদের দাপট। ক্ষমতার সাথে এর সম্পর্ক ব্যাপারটিকে আরো জটিল করে তুলছে। ধর্ষক যদি ক্ষমতাধর হন তাহলে পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থা তার পক্ষে কাজ করবে। কোনো কারণে পরিবেশ যদি অপরাধীর বিপক্ষে চলে যায়, বিচারিকপ্রক্রিয়ায় কোনো স্তরে আবারো সে আনুকূল্য পায়। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে এ ধরনের অনেক উদাহরণ রয়েছে।
শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা সমাজের বাইরের কোনো ঘটনা নয়। অনেকে মানুষের অপরাধ প্রবণতাকে এজন্য বড় করে দায়ী করছেন। অর্থাৎ মানুষের অপরাধ প্রবণতাকে আলাদা করে তারা দোষী সাব্যস্ত করতে চাচ্ছেন। প্রকৃত ব্যাপার হলো মানুষ সতত অপরাধপ্রবণ। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব অপরাধ দমন করতে হয়। প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের দেশে এগুলো ক্রমে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। প্রথমত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অনেকটাই অকার্যকর দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রকে অবশ্যই অপরাধের ব্যাপারে আপসহীন মনোভাব নিতে হবে।


আরো সংবাদ

gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi