১৮ জুন ২০১৯
জলবায়ু বিপর্যয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি

স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা প্রয়োজন

-

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী ঘূর্ণিঝড়, প্লাবন, খরা ও লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া এবং বরফ গলে যাওয়াÑ এ পাঁচটি স্পর্শকাতর ঝুঁকির বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে। এর প্রথম চারটি বিষয় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ঝুঁকি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি বয়ে আনতে পারে। দেশে সাম্প্রতিক সময়ে অতি তাপমাত্রা, বৃষ্টি, বন্যা কিংবা খরার বিরূপ আচরণ প্রকট হয়ে উঠেছে। অসময়ে যেমন অতি বৃষ্টি হয়; তেমনি অসময়ে খরা কিংবা বন্যাও হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবাণী ছিলÑ তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণ ও গতিপ্রকৃতি দিন দিন জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির মুখে থাকা অন্যতম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিও ওই সতর্কবাণী ছিল জোরালোভাবে। এত দিন মশাবাহিত ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া বা পানিবাহিত কলেরা, ডায়রিয়ার মতো সংক্রামক রোগ ঘিরেই জলবায়ুর প্রভাবজনিত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছিলেন দেশের জনস্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্ববিদেরা। এবার গবেষণায় শুধু সংক্রামক রোগই নয়, অসংক্রামক রোগের ওপরও জলবায়ুর প্রভাবের তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে, এ দেশে অসংক্রামক রোগে মানুষের মৃত্যুঝুঁকির বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত উচ্চ রক্তচাপের সাথে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের যোগসূত্র মিলেছে। এ ছাড়া হিটস্ট্রোক, গর্ভপাত, শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা, হাঁপানি, পানিশূন্যতাসহ বেশ কিছু রোগ বেড়ে যাওয়ার পেছনে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবকে দায়ী করা হচ্ছে। জলবায়ুর প্রভাবে সমুদ্র-নদীর পানি হ্রাস-বৃদ্ধি যেমন ঘটে; তেমনি তাপমাত্রা প্রভাবিত হয়ে থাকে। বায়ুদূষণের মাত্রাও বেড়ে যায়। শহর কিংবা গ্রামের মানুষই কোনো-না-কোনোভাবে তা প্রতিনিয়ত টের পাচ্ছেন।
আইসিডিডিআরবির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে পানিবাহিত অসহনীয় মাত্রার লবণ থেকে মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ বাড়ছে। গর্ভবতী নারীদের গর্ভপাতের পেছনে অতি লবণাক্ততার প্রভাব থাকার প্রমাণ মিলেছে। বিশেষভাবে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে এমন চিত্র উঠে এসেছে। সমুদ্র ও নলকূপের পানি পরীক্ষা করে অতিমাত্রায় লবণাক্ততার নজির পাওয়া গেছে। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব থেকে এমনটি হচ্ছে বলে জানা গেছে। উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবে ভূস্তরের পানির মতো ভূগর্ভস্থ পানিতেও লবণের মাত্রা বেড়ে গেছে। ফলে নলকূপের পানিতে লবণ উঠছে অসহনীয় মাত্রায়। রাজধানী বা শহরাঞ্চলে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া ও ভূগর্ভে পানির পরিমাণ কমে যাওয়ার পেছনে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এসব কারণে সৃষ্ট, পানীয়জলের সঙ্কটজনিত জনস্বাস্থ্যের সমস্যাকে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে যেসব ঝুঁকি বাড়ে, সেগুলো রোধ করতে বা কমিয়ে আনতে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। সরকারি-বেসরকারি এবং ব্যক্তিগত- সব পর্যায়ে এসব পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। বায়ুদূষণ থেকে রক্ষায় বাইরে বেরোনোর সময় মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। অতি গরমে হালকা কাপড়চোপড় ও ছাতা ব্যবহার, তীব্র রোদ এড়িয়ে চলা এবং বেশি ঘাম হলে পানি পান করা জরুরি। লবণাক্তপ্রবণ এলাকায় যতটা সম্ভব লবণপানি পরিহার করা, খাদ্যে আলাদা লবণ ব্যবহার না করা, নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করাসহ বিশুদ্ধ পানির সংস্থান করা দরকার। ঘরবাড়ি যাতে মশার প্রজননঘাঁটি না হতে পারে, সে জন্য সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। অতি বর্ষায় যতটা সম্ভব শুকনো স্থানে থাকা এবং নিরাপদ পানি ব্যবহার ও পান করা উচিত। এসব ক্ষেত্রে বিশেষত শিশু ও বয়স্কদের প্রতি অধিক যতœ নেয়া প্রয়োজন।


আরো সংবাদ