২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
মোদি ও বিজেপির বিপুল বিজয়

সাম্প্রদায়িকতা নয় সম্প্রীতির প্রত্যাশা

-

আবারো ভারতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি বিপুল জয় পেয়েছে। যতটা ধারণা করা হয়েছিল মোদি ও তার দল বিজেপির প্রতি জনগণের আস্থার পারদ পড়তির দিকে, নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে তার বিপরীত চিত্র। বিজেপি একাই তিন শ’র বেশি আসন পেতে যাচ্ছে। সরকার গঠনের জন্য যদিও দরকার মাত্র ২৭২টি আসন। দলটির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট প্রায় সাড়ে তিন শ’ আসন পেতে যাচ্ছে। বিরোধী জাতীয় ও আঞ্চলিক দলগুলো কোনো ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেনি মোদি ও তার দলের বিপরীতে। সব মিলিয়ে বিজেপি তৃতীয়বারের মতো ভারতে সরকার গঠন করতে চলেছে। জনগণের ম্যান্ডেটের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে আরো বেশি আস্থার সাথে দলটি ভারত শাসন করতে পারবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অনেক কিছু করার সুযোগ এসে গেল মোদির হাতে।
জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পর মোদি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। সবাইকে নিয়ে একসাথে উন্নয়নের সড়কে চলার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বাস্তবে বিজেপি হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশী। তাদের দলীয় কর্মসূচি বিশেষ ধর্মের প্রতি নমনীয় ও অন্য ধর্মের প্রতি কঠোর। জাতীয় নাগরিকপঞ্জি তৈরি, এক ধর্মীয় উপাসনালয় ভেঙে নিজ ধর্মীয় মন্দির প্রতিষ্ঠা, গোরক্ষার নামে পরিচালিত নানান কর্মসূচি বিভক্তিমূলক। দেশটির প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী নয়। বিশেষ করে দ্বিতীয় প্রধান ধর্মগোষ্ঠী মুসলমানরা সেখানে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়েছে। বিজেপির আরো যেসব কর্মসূচি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন হলে মুসলমানদের নাগরিক অধিকার আরো দুর্বল হয়ে পড়বে। মোদি যে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন সেটি বাস্তবে সব নাগরিককে নিয়ে চলার ডাক হলে ধর্মীয় আবেগে পরিচালিত কর্মসূচির সংশোধন প্রয়োজন।
বিজেপির জয়কে মোদি ভারতের জয় বলে আখ্যা দিয়েছেন। যদিও মূলত এটি বিজেপির ভারত জয়। ভারত পৃথিবীর বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বিশাল রাষ্ট্রটির অখণ্ডতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দেশটির সুষ্ঠু গণতন্ত্র চর্চার ওপর। গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে আঞ্চলিক সংহতি ক্ষুণœ হতে পারে। একইভাবে ভারতে উন্নত গণতন্ত্র চর্চা হলে বিশ্বের গণতন্ত্রকামী মানুষেরা এ থেকে অনুপ্রাণিত হবে। সমগ্র বিশ্বে গণতন্ত্রের নানা ধরনের ব্যাধি দেখা যাচ্ছে। এই শাসনব্যবস্থা ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে অনেকে ব্যবহার করছেন। ফলে দেশে দেশে মানুষের মধ্যে বঞ্চনা ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ভারতের নির্বাচন আয়োজন নিয়ে একটা সুনাম ছিল। এবার প্রথম দেশটির নির্বাচন কমিশন বিতর্কিত হলো। ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে না নেয়ার অভিযোগ উঠেছে কমিশনের বিরুদ্ধে। এ ব্যাপারে কমিশনের ভেতর থেকে একজন কমিশনার অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। নির্বাচনী জয়কে ভারতের জয়ে রূপান্তর করতে হলে দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থা যাতে টলে না যায় সে দিকে আন্তরিক হতে হবে মোদিকে।
এবার নির্বাচনটি এমন একসময় অনুষ্ঠিত হলো যার ঠিক কিছু দিন আগে ভারতীয় আধাসামরিক বাহিনীর ২৪ জোয়ান এক জঙ্গি হামলায় নিহত হয়। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পাকিস্তানে কথিত সার্জিকেল অভিযান চালায় ভারত। বালাকোটে চালানো ওই বিমান হামলা নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালান মোদি। মোদি ও তার দলের জনসমর্থন যখন পড়তির দিকে এ হামলা তা ঘুরিয়ে দিয়েছে। যেখানে মোদি জেতার কথা নয়, সেখানে আগের চেয়ে বেশি আসন পেয়েছেন এবং একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। উপমহাদেশে ভারত-পাকিস্তান বিরোধিতা অত্র অঞ্চলের প্রায় ২০০ কোটি মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে আছে। নির্বাচনে বিজয়ের সাথে সাথে বিশ্বনেতাদের সাথে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও মোদিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। আশা করা যায়, মোদি পাকিস্তানের সাথে সম্প্রীতির সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য অগ্রসর হবেন।
নাগরিকপঞ্জি প্রণয়ন ও অনুপ্রবেশ প্রশ্নে বিজেপির নীতি বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক। দলটি তার নির্বাচনী প্রচারণায় যেভাবে বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়েছে বাস্তবে এর বাস্তবায়ন করতে গেলে দুই দেশের মধ্যে টানাপড়েন দেখা দিতে পারে। এর আগে জোর করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করানোর ঘটনা ঘটেছে। ভারতে থাকা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। বিগত এক দশকে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগগুলোকে উৎপাটন করতে বাংলাদেশ শতভাগ চেষ্টা করেছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ তিস্তার পানি চুক্তি কিংবা উভয় দেশের মধ্যে পানিবণ্টন নিয়ে অধিকার পায়নি। সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি। বিপুল সমর্থন নিয়ে আসা মোদি চাইলে এ সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারেন। আমরা অভিনন্দন জানাই নরেন্দ্র মোদিকে। একইভাবে প্রত্যাশা থাকবে ভারতের অভ্যন্তরে অসম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে সরকার পরিচালিত হবে। আর বাংলাদেশের সাথে অমীমাংসিত ইস্যুগুলো ন্যায্যতার সাথে সমাধান হবে।

 


আরো সংবাদ