১৭ আগস্ট ২০১৯
চাপে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি

উত্তরণে বাতলাতে হবে নতুন পন্থা

-

আগামী বাজেটের আগেই দেশের অর্থনীতি চাপে পড়েছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে মন্দা পরিস্থিতি, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ, শেয়ারবাজারের নি¤œগতি, প্রবাসী আয়ে নেতিবাচক ধারা, মূল্যস্ফীতির চাপ ঊর্ধ্বমুখী, ডলারের সঙ্কট, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি প্রভৃতি কারণ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে একধরনের চাপে ফেলেছে। বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ে চলছে ধীরগতি। এডিপির অর্থ খরচ করতে না পেরে ফেরত পাঠাচ্ছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়। নতুন অর্থমন্ত্রীর প্রথম বাজেট ঘোষণার মাত্র দুই মাস আগে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি সূচকই রয়েছে নেতিবাচক ধারায়।
সঙ্কটে ডলার বাজারের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, সময়মতো বিদেশী ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ করাও দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ফলে গুনতে হচ্ছে জরিমানা। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাজারে ডলার ছাড়ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতেও বাজার স্থিতিশীল হচ্ছে না। প্রায় প্রতিদিনই ডলারের দাম বাড়ছে। কমছে টাকার মান। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান, আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের দাম দফায় দফায় বাড়ছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রতি ডলার এখন বিক্রি হচ্ছে ৮৪ টাকা ১৫ পয়সায়। গত মাসের শেষ দিকেও দাম ছিল ৮৪ টাকা। তবে কার্ব মার্কেটে দাম আরো চড়া। প্রতিনিয়ত বাণিজ্যঘাটতি বাড়ছে। চাহিদা অনুযায়ী, ডলার দিতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক।
রোজা শুরুর পক্ষকাল আগেই চাল, ডাল, মাছ, গোশত, সবজিসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে গত বছরের তুলনায়। বেড়েছে পরিবহন খরচ এবং বাসাভাড়াও। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশে দাঁড়ায়। মার্চে তা আরেক দফা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশে। মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বমুখী চাপ এ মুহূর্তে কমিয়ে আনা কঠিন। সামনের দিনগুলোতে চাপ আরো বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দেশে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এক বছরে খেলাপি ঋণ প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। এটি মোট ঋণের ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ। গত বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে খেলাপি ঋণ হয়েছিল ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। মোট খেলাপি ঋণের অর্ধেকই রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের।
দেশের উভয় শেয়ারবাজারে চরম আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়েছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। গত তিন মাসে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসইর বাজার মূলধন প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা কমেছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা চরম সঙ্কটে নিপতিত হচ্ছেন। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায় প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে। এ জন্য ২০১৮-১৯ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করেছিল এনবিআর। তবে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থের সরবরাহ ঠিক রাখার কথা বিবেচনায় রেখে তা ১৬ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে প্রবাসী আয় কমেছে। গত জানুয়ারিতে প্রবাসীরা দেশে অর্থ পাঠান ১৫৯ কোটি ডলার, যা ফেব্রুয়ারিতে কমে দাঁড়িয়েছে ১৩১ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। দ্রুত কমছে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর হার। সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ে বিরাজ করছে ধীরগতি। ২৭ নভেম্বর আর্থিক মুদ্রা ও মুদ্রাবিনিময় হারসংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের বৈঠকে এ বিষয়ে একটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অর্থ বিভাগ।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, দু-এক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। প্রবাসী আয় কমছে। সরকারের রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি রয়েছে। খেলাপি ঋণ বেড়েই চলছে। এসব ক্ষেত্রে একটা নিয়ন্ত্রণ দরকার। এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য কয়েকটি বিষয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। তা হলোÑ যেকোনো উপায়ে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা। অন্যথায় ব্যাংক খাত গভীর সঙ্কটে পড়বে। এ অবস্থায় বহির্বিশ্বের শ্রমবাজারগুলো কিভাবে পুনর্গঠন করা যায় তা খতিয়ে দেখা, নতুন শ্রমবাজারের অনুসন্ধান করা ও বেসরকারি বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন খুব জরুরি।

 


আরো সংবাদ




bedava internet