১৫ নভেম্বর ২০১৮
কয়লার নামে ৮৫০ কোটি টাকা পানিতে!

ওদের ময়লা কয়লার চেয়েও বেশি

-

‘৫ শতাংশ বেশি আর্দ্রতার কয়লা কিনে প্রায় ৮৪৬ কোটি টাকা গচ্চা দিয়েছে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কোম্পানি (বিসিএমসিএল)। এই খনির কয়লা উত্তোলনকারী, চীনের দুই প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়ামের কাছ থেকে ৫ দশমিক ১ শতাংশ আর্দ্রতাসহ কয়লা কেনার চুক্তি করা হয়েছিল; কিন্তু কয়লা কেনা হয়েছে ১০ শতাংশ আর্দ্রতাসহ।’
একটি জাতীয় দৈনিকের লিড নিউজের সূচনা অনুচ্ছেদে এই তথ্য দেয়ার পর জানানো হয়েছে, গত জুলাই মাসে হঠাৎ খবর পাওয়া যায়, খনির এক লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লার হদিস মিলছে না। প্রধানত এই খনির কয়লা দিয়েই চলে বড়পুকুরিয়ার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। কয়লার অভাবে এটি বন্ধ হওয়ার পরই এ ঘটনা উদঘাটিত হলো। ‘চুরি যাওয়া’ কয়লার বাজারে দাম ২৩০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রথমে এটাকে ‘সিস্টেম লস’ বলে হালকাভাবে দেখিয়ে এড়িয়ে যেতে চেয়েছে। কিন্তু তদারকি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা তদন্ত করে জানায়, খনির কর্তৃপক্ষ প্রথমাবধি যথাযথভাবে হিসাব রাখেনি কয়লার। উল্লেখ্য, ১৩ বছর আগে থেকে এখানে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা তোলা হচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে উৎপাদন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত রয়েছে বড় ধরনের গলদ।
২০১১ সালে সরকারের জ্বালানি বিভাগে পেশকৃত তথ্যে জানানো হয়েছিল, দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া খনির কয়লায় আর্দ্রতার হার ১০ শতাংশ। এই আর্দ্রতা পরিমাপ করার প্রয়োজনে কেমিস্ট নিয়োগের কথা। তবে দীর্ঘ ১৩ বছরেও কেউ এ পদে নিয়োগ পাননি। ফলে পূর্ণ আর্দ্রতাসহকারেই সরকারকে এই খনির খয়লা কিনতে হচ্ছে। গত মাসের প্রতিবেদন মোতাবেক, ১৩ বছরে বাংলাদেশ সরকার বড়পুকুরিয়ার এক কোটি এক লাখ ৬৬ হাজার টন কয়লা কিনেছে। চীনের দুই প্রতিষ্ঠানের সাথে পেট্রোবাংলার চুক্তিতে কয়লার আর্দ্রতা ৫ শতাংশ হওয়ার শর্ত থাকলেও দ্বিগুণ আর্দ্রতার কয়লা কেনায় এ যাবৎ পাঁচ লাখ টন বেশি ওজন হয়েছে ক্রয়কৃত কয়লার। এই অতিরিক্ত ওজন বাবদ সরকারের বাড়তি খরচের পরিমাণ ৮৪৬ কোটি টাকা। ২০১০ থেকে দু’বছর অস্থায়ী ভিত্তিতে নিযুক্ত হয়ে একজন কেমিস্ট কয়লার আর্দ্রতার মাত্রা নির্ধারণ করতেন। এই খনিতে কয়লা উত্তোলন করা হয় তিন শিফটে। তাই কমপক্ষে তিনজন কেমিস্ট থাকার কথা বলে ওয়াকিবহাল সূত্র জানিয়েছে। কয়লা খনি কোম্পানির জিএম স্বীকার করেন, কেমিস্ট নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি পর্যন্ত দেয়া হয়নি। বিশেষত যার রিপোর্টের ওপর সরকারের কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হওয়া-না-হওয়া নির্ভর করেÑ এত গুরুত্বপূর্ণ পদে কেন এত বছরেও লোক নিয়োগ করা হয়নি, এর জবাব দেননি তিনি। এ দিকে, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেছেন, ‘চুক্তিতে উল্লিখিত পরিমাণের চেয়ে অধিক আর্দ্রতা কয়লায় থাকলে এবং মেপে দেখার সময় তা বাদ দেয়া না হলে আসলে আমরা আর্দ্রতা কিনেছি। এ ক্ষেত্রে কোনো কেমিস্ট না থাকা সন্দেহজনক।’
গত মাসে ২৩০ কোটি টাকার কয়লা ‘চুরির’ ব্যাপারে গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যদের ধারণা, এই কয়লা হয়তো খনি থেকে না তুলেই সংশ্লিষ্ট কনসোর্টিয়াম বিশাল অঙ্কের টাকা লুটে নিয়েছে। এতে জড়িত খনি কর্তৃপক্ষের বড় কর্তারাও। কেনার হিসাবমাফিক, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য এক লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা থাকার কথা! বাস্তবে খনির মাঠ ছিল কয়লাশূন্য। তখনি সন্দেহ হয় ‘কয়লা চুরির’ ব্যাপারে।
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির আলোচ্য ঘটনা কোনো ছোটখাটো অনিয়ম বা দুর্নীতির নয়। রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা ও মিথ্যাচারের একটা নজিরবিহীন ঘটনা এটি। এর দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের কাঁধেই চাপতে বাধ্য। কারণ, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্পের এমন ব্যয়বহুল এবং জাতীয় স্বার্থ সম্পৃক্ত কাজে সরকারের কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত তত্ত্বাবধান জরুরি। দীর্ঘ দিনেও এ ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সিস্টেম গড়ে না তোলায় প্রশ্রয় পেয়েছে দুর্নীতি ও খামখেয়ালিপনা। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধ না থাকলে এ ধরনের অঘটন আবারো ঘটতে পারে।
বড়পুকুরিয়া খনির ‘চুরি’ কেলেঙ্কারি এবং কোটি কোটি টাকা লোপাটের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই দেশবাসীর দাবি। এরা ‘কয়লার চেয়েও বেশি ময়লা’। এই ময়লা অবশ্যই ধুয়ে সাফ করতে হবে।


আরো সংবাদ