২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮
ঢাকার দুঃসহ দূষণ

রোধ করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে

-

রাজধানী ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দূষণের শিকার নগরীগুলোর অন্যতম। নয়া দিগন্ত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের (একিউআই) প্রতিবেদন অনুযায়ী বায়ুদূষণের দিক থেকে ঢাকা বিশে^ দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। এই ইনডেক্স বিশ্বের বিভিন্ন শহরের বায়ুর দৈনিক গুণাগুণ পরীক্ষা করে। ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঢাকায় সবচেয়ে বেশি বায়ু দূষিত হয়েছে। এর ফলে শ^াস-প্রশ^াস প্রক্রিয়ায় বায়ুর সাথে মিশ্রিত বিভিন্ন দূষিত পদার্থ ফুসফুসে গিয়ে নানা ধরনের রোগের সৃষ্টি করে থাকে। একটি নিরাপদ বসবাস উপযোগী শহরের যে নির্মল বায়ু, তার তুলনায় ঢাকার অবস্থা কতটা করুণ তা অনুমান করা যায়। শহরের বায়ুর মান উন্নত করার জন্য পরিবেশ সচেতনতামূলক সে ধরনের কোনো পদক্ষেপ সরকার এখনো নিতে পারেনি।
দূষণের মাত্রা কতটা ভয়াবহ, প্রাপ্ত পরিসংখ্যান থেকে তা অনুমান করা যায়। বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার বাতাসে ২৪ ঘণ্টায় ১০০ কেজি সিসা, তিন হাজার ৫০০ কেজি এসপিএম, এক হাজার ৫০০ কেজি সালফার-ডাই অক্সাইড, ১৪ টন হাইড্রোজেন ক্লোরাইড ও ৬০ টন কার্বন মনোক্সাইড মেশে। রাজধানীতে শুধু ট্রাক থেকে কার্বন-মনোক্সাইড নিঃসরিত হয় ১৩.৪ শতাংশ, হাইড্রোজেন ক্লোরাইড ৮.৬, নাইট্রোজেন অক্সাইড ৫৯.৭ এবং পার্টিকেল পলিউশন (পিএম) ৪৭.৫ শতাংশ। বাস থেকে কার্বন-মনোক্সাইড নিঃসরিত হয় ১০.৩ শতাংশ, হাইড্রোজেন ক্লোরাইড ৯.৭, নাইট্রোজেন অক্সাইড ১৮.৫ এবং পিএম ২৯.৪ শতাংশ। মিনিবাস থেকে কার্বন-মনোক্সাইড নিঃসরিত হয় ৭.৩ শতাংশ, হাইড্রোজেন ক্লোরাইড ৩.৯, নাইট্রোজেন অক্সাইড ৬.৫ এবং পিএম ১৯.১ শতাংশ। অন্যান্য যানবাহন থেকে কার্বন-মনোক্সাইড নিঃসরিত হয় ৩৮.২ শতাংশ, হাইড্রোজেন ক্লোরাইড ১৮.২, নাইট্রোজেন অক্সাইড ৬.৫ এবং পিএম ১.২ শতাংশ। যানবাহনের চালকদের নিয়ন্ত্রণে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। সেখানে একটি যানবাহন কতটা দূষণ করছে, তা নির্ণয় করে তাকে আনফিট ঘোষণা করার মতো কাজ দূরে রয়ে গেছে। অনিরাপদ হাসপাতাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও বায়ুদূষণের জন্য দায়ী। হাসপাতালে ব্যবহৃত সুই ও রক্ত ব্যবহার করে রক্তসহ ব্যাগ, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, গজ-ব্যান্ডেজ, মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রভৃতি উন্মুক্ত স্থানে ফেলে দেয়া হচ্ছে। এসব বর্জ্য থেকে পরিবেশে রাসায়নিক পদার্থ মিশে দূষণ করছে। এই দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা খুব একটা কঠিন ছিল না। কিন্তু রাজধানী কর্তৃপক্ষ খুব একটা মনোযোগী বলে মনে হয় না। ঢাকার আকাশে প্রতিদিন মিশে যাচ্ছে প্রচুর অ্যামোনিয়া গ্যাস। এই অ্যামোনিয়া মিশছে খোলা আকাশের নিচে ত্যাগ করা মলমূত্র থেকে। ঢাকার বাতাসে ক্ষতিকর মাত্রার চেয়ে ৫১.৬ শতাংশ বেশি অ্যামোনিয়া গ্যাস ভাসছে। এটি কেবল সচেতনতামূলক কাজ। তার ওপর সরকারি ব্যবস্থাপনাও জরুরি। ঢাকার মানুষের বাড়তি রোগশোকের জন্য দূষণ দায়ী। এর মধ্যে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি, বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া এবং আইকিউ হ্রাস পাওয়ার মতো নানা ধরনের অসুস্থতায় ভুগছে।
বায়ুদূষণ রোধে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে না পারলে রাজধানীর মানুষের পাশাপাশি সারা দেশের মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর ক্রমেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। দূষণের উৎস সবার জানা অর্থাৎ বিভিন্ন ধরনের গাড়ি, কলকারাখানা, ইটের ভাটায় ইট পোড়ানো, হাসপাতালের অনিরাপদ বর্জ্য ও অনিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশন। কর্তৃপক্ষ চাইলে পরিবেশ রক্ষায় টার্গেট নিয়ে অগ্রসর হতে পারে। একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে কাজ শুরু করতে পারে। পরিবেশ রক্ষায় রয়েছে স্বেচ্ছাসেবী নানা সংগঠন। বায়ুদূষণ রোধ করতে চাইলে তাদের সাহায্যের হাত নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সচেতনতা সৃষ্টির জন্য মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবেশদূষণের ভয়াবহ ক্ষতিকর দিক মাথায় রেখে সবাইকে সম্মিলিতভাবে অগ্রসর হওয়া দরকার।

 


আরো সংবাদ