২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
সড়ক একটুও নিরাপদ হয়নি

শুধু সিদ্ধান্ত নয়, বাস্তবায়নও চাই

-

সড়কে মৃত্যুর মিছিল বন্ধ ছিল না ঈদের ছুটিতে। ঈদের পরও তা অব্যাহত রয়েছে। রোববার রংপুরে দু’টি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে শিশু-নারীসহ সাতজন নিহত ও ১৭ জন আহত হয়েছে। সেদিন রাজধানীর মিরপুর এলাকায় বাস জব্দ করে নিয়ে যাওয়ার সময়ে ওই বাসের নিচে চাপা পড়েই পুলিশের একজন কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া, দেশের বিভিন্ন স্থানে একই দিনের আরো ছয়টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ছয়জন নিহত ও ৯৪ জন আহত হয়েছে। আগের দিন শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও একই পরিবারের তিনজনসহ ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছে সড়কপথের দুর্ঘটনায়। ওই দিনের পত্রপত্রিকার খবর, টাঙ্গাইলে বাসে আবার ধর্ষণের মতো নারকীয় অপরাধ ঘটিয়েছে পরিবহন শ্রমিকেরা। সেখানে বাসস্ট্যান্ডেই চালক দ্বারা ধর্ষিত হলেন মানসিক প্রতিবন্ধী নারী। এ দিকে, একটি সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় খবর এসেছে, নাটোরের বড়াইগ্রামে ‘প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চালানো হচ্ছে থ্রি হুইলার।’ মহাসড়কে এগুলোর চলাচল নিষিদ্ধ হলেও তা মানা হচ্ছে না।
সবিশেষ উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, রোববার একটি জাতীয় দৈনিকের লিড নিউজে জানানো হয়েছেÑ সড়কপথে যান চলাচল ও নিরাপত্তার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে বেশ তৎপরতা দেখালেও এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করার দিকে প্রশাসনের মনোযোগ কম। দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয় যে, এক দশক আগে ২০০৮ সালে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছেনÑ অনিবন্ধিত কোনো ধরনের যানবাহন মহাসড়কে চলতে পারবে না। আজো সে আদেশ বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১৫ সালে খোদ প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভা থেকে চলাচলের ব্যাপারে ১৯ দফা নির্দেশ জারি হয়েছিল। সেগুলো কার্যকর করা হয়নি। সম্প্রতি তিনি ৫ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন একই ব্যাপারে। এর বাস্তবায়নও শুরু হয়নি এখন পর্যন্ত। ২০১৫ সালের ১ আগস্ট দেশের ২২টি জাতীয় মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সত্ত্বেও বিগত তিন বছরেও তা কার্যকর হয়নি।
পত্রিকার আলোচ্য প্রতিবেদনের শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে, সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কোনো নির্দেশনাই কার্যকর হচ্ছে না। এমনকি সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশও মানছেন না পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা। ঢাকার যাত্রাবাড়ী-গাবতলী রুটের ‘বিরতিহীন’ নামে ৮ নম্বর বাস সরকারের কোনো সিদ্ধান্তই মানে না বলে জানান একজন চালক। তার প্রশ্ন : ‘সরকার সিদ্ধান্ত দেয়, কিন্তু এর বাস্তবায়ন কে করবে?’ জানা যায়, প্রতিদিন পাঁচ শ’ থেকে হাজার টাকা করে মালিক ও শ্রমিক নেতাদের কথিত চাঁদা দিয়ে বাস চালাতে হয়। এ টাকা যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে। তার সাথে আছে চালকের নিজের উপরি আয়ের ব্যাপার। এ অবস্থায় অনেকে বাধ্য হয়ে চুক্তি ভিত্তিতে গাড়ি চালান বলে দাবি করা হয়েছে। সাধারণ পরিবহন শ্রমিকেরা অভিযোগ করেছেন, পুলিশ ও লাইনম্যানকে টাকা না দিয়ে পারা যায় না। আগে এসব অনিয়ম বন্ধ করা না হলে, দেশে পরিবহন শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সড়ক-মহাসড়ক হয়ে উঠেছে একেকটা ‘মৃত্যু উপত্যকা’। চালকের বেপরোয়া মনোভাব, মাদকাসক্তি, অদক্ষতা, অমনোযোগ অথবা অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করা নতুবা অনুপযুক্ত যানÑ যে কারণেই হোক, প্রতিদিন দেশের নানা স্থানে ঘটে চলেছে সড়কের কথিত দুর্ঘটনা। আসলে এসব অঘটন অনেক ক্ষেত্রেই এড়ানো সম্ভব এবং এগুলো একধরনের ‘হত্যাকাণ্ড’। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১২ জনের মতো প্রাণ দিচ্ছে। পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে অনেকে এবং আহত হচ্ছে বহু মানুষ। ফলে প্রতিনিয়ত অনেক পরিবারে উঠছে স্বজন হারানো এবং অন্ধকার ভবিষ্যতের আহাজারি। অথচ এত মানুষ হতাহত হওয়া এবং এত সম্পদহানির জন্য যারা প্রধানত দায়ী, সেই মালিক-চালকেরা প্রায় ক্ষেত্রে পেয়ে যায় রেহাই। এভাবে আইন অকার্যকর থাকায় সরকার দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। এ অবস্থায় সবার প্রত্যাশা, সড়ক পরিবহন-সংক্রান্ত বাস্তবানুগ সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের পাশাপাশি এগুলোর আশু বাস্তবায়নের গুরুদায়িত্ব পালনেও সরকার তৎপর হবে।


আরো সংবাদ