২৪ অক্টোবর ২০১৮
আনিসুল হকের প্রকল্পগুলোর দুর্দশা

দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকেই

-

ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের বহুলালোচিত সাবেক মেয়র মরহুম আনিসুল হক এই পদে নির্বাচিত হওয়ার পর রাজধানীর উন্নয়নকল্পে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন। এগুলোর কোনোটার কাজ প্রায় শেষ হয়েছিল, কোনোটা অসমাপ্ত এবং কোনো কোনো প্রকল্পের কাজে হাত দেয়ার সময় তিনি পাননি। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার দুই বছরের মাথায় জটিল রোগে আক্রান্ত হন এবং লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। এ দিকে, তার গৃহীত প্রকল্পগুলোর এখন বেহাল অবস্থা। এগুলো সুন্দর সুচারুরূপে বাস্তবায়িত হওয়াই ছিল স্বাভাবিক ও সবার প্রত্যাশিত। আনিসুল হক যে দলের প্রার্থী হিসেবে মেয়র হয়েছিলেন, তিনি শেষ পর্যন্ত সেই দলের সাথেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন এবং সে দলই দেশের শাসনক্ষমতায় রয়েছে প্রায় এক দশক ধরে। অথচ আনিসের স্বপ্নের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো মুখথুবড়ে পড়েছে তার মৃত্যুর সাথে সাথে। বিশেষত, ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেণীর নেতাকর্মীর সংশ্লিষ্টতায় এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রশ্রয় বা উদাসীনতায় এসব প্রকল্পের কোনো কোনোটা নস্যাৎ হতে শুরু করেছিল আনিসুল হকের অসুস্থ থাকার সময়েই।
একটি সহযোগী দৈনিকে প্রকাশিত সচিত্র প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আনিসুল হকের সাড়া জাগানো উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে বেদখল হয়ে যাচ্ছে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড; থমকে গেছে নগরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, সড়কের ‘ইউটার্ন’ প্রকল্প হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত। সেই সাথে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, এলইডি-লাইট এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং গণপরিবহন হিসেবে চার হাজার বাস চালু করার মতো প্রকল্পগুলো আলোর মুখ দেখবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলোÑ ক্ষমতাসীন যে দলটি আনিসুল হকের মতো ব্যাপক ইমেজসম্পন্ন ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বকে নিজেদের প্রার্থী করে মেয়র নির্বাচনে জিতিয়ে এনেছে, এরপর তাকে দলের মহানগর কমিটিতে স্থান দিয়েছে, সেই প্রবল প্রতাপশালী দল এখনো সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকার পরও তার প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ম্লান হয়ে গেছে। অথচ তিনি নগরবাসীর আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে, রাজধানীকে আধুনিক সুন্দর ও উন্নত করার লক্ষ্যে এসব নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। দলের ভেতরেই অনেকে তার এসব পদক্ষেপের পথে বাধা হয়ে উঠছিলেন বলে বাস্তব ঘটনাপ্রবাহ থেকে প্রতীয়মান হয়। বিশেষত, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করে জনস্বার্থে রাজপথ সুগম করতে নেমে আনিসুল হককে জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়েছিল। তার মৃত্যুর আগেই সেই ট্রাকস্ট্যান্ড আবার গজিয়ে ওঠা শুরু হয়ে যায়। ক্ষমতার উচ্চমহলের মদদ কিংবা নীরব অনুমোদন ব্যতিরেকে প্রশাসনের নাকের ডগায় এটা ঘটতে পারে না। তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বেআইনিভাবে দখল করে দীর্ঘ দিন আগে ট্রাকস্ট্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আনিসুল হক প্রাণান্ত প্রয়াস চালিয়ে এটি উচ্ছেদে সফল হয়েছিলেন। টিভির পর্দায় দেশবাসী সে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে। অন্য কোনো ব্যক্তি মেয়র হয়ে হয়তো এত বড় ঝুঁকি নিতে চাইতেন না। কিন্তু আনিসের এত কষ্টের ফসল সবার চোখের সামনে নস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে। দখল হয়ে যাচ্ছে ফুটপাথগুলোও। আনিসের ‘গ্রিন ঢাকা ক্লিন ঢাকা’ শীর্ষক পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি থমকে গেছে। তিনি নগরীতে তিন বছরে পাঁচ লাখ গাছ লাগাতে চেয়েছিলেন। পরিবেশ উন্নতকরণ, দূষণরোধ এবং নগরসৌন্দর্য বৃদ্ধির এ উদ্যোগ ছিল মেয়রের ব্যক্তিগত আগ্রহের সুফল। কিন্তু এখন সিটি করপোরেশনের কোনো পদক্ষেপ নেই এ ব্যাপারে। অনিশ্চিত হয়ে গেছে সাতরাস্তা থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১টি ‘ইউটার্ন’ নির্মাণ প্রকল্প। সরকারের সড়ক ও জনপথ অধিদফতর তাদের জমি এ কাজে ব্যবহারের জন্য সম্মতি দিয়েছিল। কিন্তু আনিস মারা যাওয়ার পর তারা বলছেন, ‘এ জমি কিনে নিতে হবে’। ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে চার হাজার বাস নামানোর উদ্যোগের কাজে কোনো অগ্রগতি নেই আনিসুল হকের মৃত্যুর পর। তদুপরি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়ে সিটি করপোরেশন সিদ্ধান্ত নেয়নি আজো।
জনগণের দুর্দশা লাঘব করে জীবনযাত্রা সহজ এবং রাজধানীকে সত্যিকারভাবে সুন্দর ও উন্নত করতে আনিসুল হকের নেয়া প্রকল্পগুলোর আশু বাস্তবায়নই সবার কাম্য। এ ক্ষেত্রে যে অচলাবস্থা, তার দায় যেমন সরকারের, তেমনি এসব প্রকল্প কার্যকর করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাও সরকারেরই দায়িত্ব।


আরো সংবাদ