২৪ অক্টোবর ২০১৮
ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও গোলযোগ

রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব পালন করছে না

-

বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও গোলযোগ বেড়েই চলেছে। বাজেট ঘোষণার পরবর্তী আলোচনায় সংসদ সদস্যরা এ ব্যাপারে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ব্যাংক লুটেরা ও অর্থ পাচারকারীদের ধরতে না পারায় তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অন্য দিকে, দেশের ব্যাংক খাত অভ্যন্তরীণ সমস্যায় পড়েছে নানাভাবে। এর মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাই এবং বাধ্যতামূলক অবসর প্রদানের বিষয় রয়েছে। অবসরে পাঠানোর পর স্টাফদের অবসরকালীন প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা থেকে বিরত থাকছে অনেক ব্যাংক, যা অন্যায়। এভাবে ব্যাংক খাতকে অনিয়ম-দুর্নীতি যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। তার চেয়ে বেশি আশঙ্কার কারণ, রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ব্যাংক খাত নিয়ে প্রত্যাশিত দায়িত্ববোধ ও সচেতনতা দেখাচ্ছে না। সর্বশেষ বাজেটেও সরকারের এ ধরনের গা বাঁচানো মনোভাব পরিলক্ষিত হয়েছে, দুর্দশাগ্রস্ত ব্যাংক খাত উদ্ধার নিয়ে অর্থমন্ত্রী কোনো পরিকল্পনার কথা বলেননি।
ব্যাংক খাত নিয়ে উদাসীনতার কারণে সংসদ অধিবেশনে জাতীয় পার্টির এমপি কাজী ফিরোজ রশিদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভারতের সোমনাথ মন্দিরের লুটপাটের সাথে আমাদের ব্যাংকিং খাতের তুলনা করা যায়। সোমনাথ মন্দির আক্রমণ করে ২০ বিলিয়ন ডলার লুটপাট করা হয়েছিল। অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি প্রশ্ন রাখেনÑ ব্যাংকখেলাপি কারা, এটা কি আপনি জানেন না? কেন তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছেন না? তার মতে, এই লুটপাটকারীরা ২৪ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে। ব্যাংকে রাখা গচ্ছিত টাকা এভাবে যখন লুটপাট হয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখন ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় দেখা যাচ্ছে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি। জোরপূর্বক অবসরে পাঠানোর ঘটনা ঘটছে, কিন্তু তাদের অবসরকালীন সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এ জন্য তারা যখন আবেদন করছেন, উল্টো ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পাওনা না মিটিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ আনছে। ব্যাংক মালিকানা পরিবর্তনের পর বাধ্যতামূলক অবসর প্রদানের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিআইবিএম ২৬টি ব্যাংক থেকে তথ্য নিয়ে তৈরি করা এক প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে ব্যাংক খাতে কর্মী কমেছে ৯ হাজার ২০ জন। ২০১৭ সালে বাধ্যতামূলকভাবে পদত্যাগ করতে হয়েছে পাঁচ হাজার ৪৭০ জনকে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঊর্ধ্বতন ও মধ্যসারির কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক পদত্যাগের ঘটনা উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংকে ১৬ মাসে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কয়েকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে।
প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের অব্যাহত ও অবাঞ্ছিত পতন লক্ষ করা যাচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বাদ যায়নি। অনলাইন জালিয়াতির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের অর্থ লোপাট হয়েছে। এর আগ থেকেই বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রহস্যজনক ও দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপারে হচ্ছে, লুটেরাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের যথেষ্ট আগ্রহ দেখা যায়নি; বরং যারা অর্থ লোপাট করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তারা বুক ফুলিয়ে সমাজে চলছে এবং আরো ঋণ পাচ্ছে বিপুল পরিমাণে। অন্য দিকে, এই লোপাট বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জড়িত ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তারাও কোনো ধরনের জবাবদিহিতার আওতায় আসেন না। ঠিক এই সময় ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের অনেক ঘটনা ঘটেছে। এগুলো নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে দেশবাসীর মনে। এখন চলছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছাঁটাই-‘বাছাই’। অথচ এসব ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনের অনুসরণ করা হচ্ছে না। এভাবে কোনো দেশের ব্যাংক খাত চলতে পারে না। রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের এ ব্যাপারে অবিলম্বে সক্রিয় হওয়া দায়িত্ব।

 


আরো সংবাদ