২৩ অক্টোবর ২০১৮
পুরান ঢাকায় কেমিক্যালের গুদাম ও ফ্যাক্টরি

আবারো ধ্বংসযজ্ঞের অপেক্ষা!

-

২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলী এলাকায় রাতের অন্ধকারের বুক চিরে দাউ দাউ জ্বলে উঠেছিল ভয়াল অগ্নিশিখা। কেমিক্যাল থেকে সৃষ্ট সেই লেলিহান আগুনের গ্রাসে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল গোটা এলাকার বাড়িঘরসহ সব স্থাপনা ও কাঠামো। সর্বোপরি মর্মান্তিক প্রাণ দিতে হয়েছিল ১২৪ জনকে। আধুনিক যুগে কোনো দেশের খোদ রাজধানীর জনাকীর্ণ জনপদে শত শত কেমিক্যাল গোডাউন বা রাসায়নিকের গুদাম থাকা অবিশ্বাস্য হলেও এই বিপজ্জনক চিত্র আজো দৃশ্যমান। ঢাকা নগরী থেকে ট্যানারিগুলো মোটামুটি সরিয়ে দেয়া গেলেও কেমিক্যালের গুদামগুলো নিমতলী থেকে আরমানিটোলা হয়ে লালবাগ পর্যন্ত জনজীবনের নিরাপত্তার প্রতি ভয়াবহ হুমকি হিসেবে বিদ্যমান।
নিমতলীর সেই নজিরবিহীন ট্র্যাজেডির অষ্টম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে একটি সহযোগী দৈনিকের সচিত্র প্রতিবেদনে ওসব এলাকা সম্পর্কে আরো জানানো হয়, কোনো বাড়ির নিচতলায় রাসায়নিকের গুদাম। কোনো বাড়িতে রাবারের স্যান্ডেল বা প্লাস্টিকের কারখানা আবার কোনোটিতে পণ্যের গুদাম। কোথাও দিনভর ঝাঁজালো ধোঁয়া, আবার কোথাও হাতুড়ি আর যন্ত্রের দড়াম দড়াম শব্দ। এর মধ্যেই ঝুঁকি নিয়ে লাখো মানুষের বসবাস। ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকাকে এখন শিল্প এলাকা বললে ভুল হবে না।
২০১০ সালের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় শতাধিক মানুষের শোচনীয় মৃত্যু আর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর তালিকা করে ৮০০ রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম পুরান ঢাকা থেকে বুড়িগঙ্গার ওপারে, কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেয়ার কথা ছিল। তবে শেষ অবধি সরকার তা আর করেনি। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ফাইল বন্দিদশার কারণে সেখানে কেমিক্যাল পল্লী গড়া হয়ে ওঠেনি। এ দিকে রাজধানীর পুরনো অংশের বিভিন্ন এলাকায় এখনো দেখা যায় গুদাম, কারখানা আর মানুষের বাসস্থান পাশাপাশি। এ অবস্থার পরিণতি কী হতে পারে, তা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানা সত্ত্বেও ঝুঁকি নিয়েই শ্রমিকদের কাজ করতে হয়। আবার এটাই বাস্তবতা যে, এই গুদাম ও কারখানাই বহু মানুষের জীবিকার অবলম্বন। অপর দিকে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের দায় এড়াতে বলছেন, ‘নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের পর সেই এলাকায় কোনো কারখানা বা গুদামের লাইসেন্স দেয়া হয়নি। যেগুলো চলছে, সবই অবৈধ।’ জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য, ‘সরে যাওয়ার ওয়াদা পূরণ করেননি ব্যবসায়ীরা।’ এখানে যেসব প্রশ্ন জাগে, তা হলোÑ রাসায়নিকের কারখানা কিংবা গুদামের অনুমতি আর না দেয়া হলেও আগেরগুলো চালু আছে কি না, সেটি দেখে কোনো ব্যবস্থা গত আট বছরেও কেন নেয়া হয়নি? অথচ কর্তৃপক্ষ ভালো করেই জানে, এসব গোডাউন-ফ্যাক্টরি পুরোপুরি বেআইনি। আর জনস্বার্থ উপেক্ষা করে যারা ওয়াদা লঙ্ঘনপূর্বক আজো বিপজ্জনক গুদাম-কারখানা রেখে দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালনে কেন তৎপর হননি?
পত্রিকার খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, লালবাগের ইসলামবাগে রাবার, প্লাস্টিক, জুতা-স্যান্ডেলের কারখানা অনেক। সেখানে কেমিক্যাল, রঙ, প্লাস্টিক গুটির গুদাম ও দোকানও দেখা যায়। আরো আছে প্লাস্টিকের গোডাউন, লেদমেশিন, তারকাঁটা, ইমিটেশন অলঙ্কারের কারখানা। এগুলোর বেশির ভাগেরই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, জুতার আঠার উপাদানে দাহ্য কেমিক্যাল থাকে এবং এই এলাকায় এগুলো অবৈধভাবে মজুদ করা হয়। নিমতলীতে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হওয়ার কারণ এ ধরনের কেমিক্যাল। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ‘সরকার চাপ না দিলে ব্যবসায়ীরা জেনে-বুঝেও কোনো পদক্ষেপ নেবেন না।’ অপর দিকে ব্যবসায়ীরা বলছেনÑ ‘যাবতীয় সুবিধাসমেত অন্যত্র কারখানা সরানো হলে আপত্তি করা হবে না।’
আমরা মনে করি, মহানগরীর ঘনজনবসতির মধ্যে যেকোনো ধরনের রাসায়নিকের গুদাম বা কারখানা থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক। পুরান ঢাকার এসব গুদাম ও কারখানা অবিলম্বে বন্ধ কিংবা স্থানান্তরিত করা না হলে যেকোনো সময় ২০১০ সালের মতো বিরাট বিপর্যয় ঘটতে পারে। শুধু কেমিক্যাল বা রাসায়নিক নয়, প্লাস্টিক ও রাবারের কারখানার বেলায়ও বিস্ফোরক অধিদফতরের অনুমতি বাধ্যতামূলক করতে হবে। আর ঈদের পর সিটি করপোরেশন এসব স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য মাসব্যাপী যে অভিযান চালাবে, তা যেন ফলপ্রসূ হয়, এটা নিশ্চিত করতে হবে।


আরো সংবাদ