০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

২৫ বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা

১৯৯০ সালে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় চার হাজার ৬০০ কোটি টাকা। আর ১৯৯৩ সালে ছিল আট হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ গত আড়াই দশকের ব্যবধানে বেড়ে চলতি বছরের জুনে দাঁড়িয়েছে এক লাখ সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকায়। গত ২৫ বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা। আর ২৮ বছরের ব্যবধানে বেড়েছে এক লাখ আট হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গত প্রায় তিন দশকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, এরশাদের পতনের সময় অর্থাৎ ১৯৯০ সালে খেলাপি ঋণ ছিল চার হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই দলের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় থাকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত। পাঁচ বছরের ব্যবধানে ১৯৯৫ সাল শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয় ৯ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরে খেলাপি ঋণ প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা বেড়ে যায়।

১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ সরকার। ক্ষমতায় থাকে ২০০০ সাল পর্যন্ত। ১৯৯৫ সালের পর ২০০০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে খেলাপি ঋণ ৯ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা থেকে এক লাফে বেড়ে হয় ২২ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এ সময় দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে খেলাপি ঋণের হারও হয় সর্বোচ্চ। যেমন, ১৯৯০ সালে যেখানে খেলাপি ঋণের হার ছিল মোট ঋণের ২৬ দশমিক ২৪ শতাংশ, ১৯৯৫ সালে যেখানে ছিল ৩২ শতাংশ, সেখানে ১৯৯৯ সালে খেলাপি ঋণের হার হয় মোট ঋণের ৪১ দশমিক ১১ শতাংশ। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০০০ সালে খেলাপি ঋণের হার ছিল মোট ঋণের ৩৪ দশমিক ৯২ শতাংশ।

২০০০ সালের পর ২০০১ সালে আবার ক্ষমতায় আসে বিএনপিসহ চারদলীয় এই সরকার। এই সরকারের প্রথম দুই বছরের পর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার দুটোই কমে যায়। যেমন, ২০০১ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ২৩ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩১.৪৯ শতাংশ, পরের বছর ২০০২ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ২৩ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৮.১০ শতাংশ। পরের বছর অর্থাৎ ২০০৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার দুটোই কমতে থাকে। যেমন, ২০০৩ সালে খেলাপি ঋণ কমে হয় ২০ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২২.১৩ শতাংশ, ২০০৪ সালে খেলাপি ঋণ আরো দুই হাজার কোটি টাকা কমে হয় ১৮ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৭.৬৩ শতাংশ এবং ২০০৫ সালে খেলাপি ঋণ আরো এক হাজার কোটি টাকা কমে হয় ১৭ হাজার ৫১১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এর পর থেকে খেলাপি ঋণ আর কমেনি, বরং প্রতি বছরই বাড়তে থাকে।

২০০৫ সালের পর খেলাপি ঋণ আবার বাড়তে থাকে। যেমন ২০০৬ সালে খেলাপি ঋণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বেড়ে ২০ হাজার কোটি টাকার ঘরে চলে যায়। ওই বছরে খেলাপি ঋণ ছিল ২০ হাজার ৯৮ কোটি টাকা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিনে অর্থাৎ ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। এর পরের বছর থেকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার টানা দুই মেয়াদ শেষে তৃতীয় মেয়াদ শুরু করে এ সময়ে ব্যাংকিং খাতে ঋণের পরিমাণ যেমন বাড়তে থাকে, সেই সাথে খেলাপি ঋণও বেড়ে এখন ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটিতে পৌঁছেছে। এ হিসাব গত ৩০ জুন পর্যন্ত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৯ সাল শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। পরের বছর ২০১০ সালে এসে খেলাপি ঋণ সামান্য বেড়ে হয় ২২ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা। ২০১১ সালের পর এক লাফে খেলাপি ঋণ দ্বিগুণ হয়ে যায়। যেমন, ২০১২ সালে খেলাপি ঋণ আগের বছরের ২২ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয় ৪২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে ২ হাজার কোটি টাকা কমলেও ২০১৪ সালে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বেড়ে হয় ৫০ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ দেশে প্রথমবারের মতো ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ অর্ধ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করে।

২০১৫ সালের পর খেলাপি ঋণ প্রতি বছরই ১০ হাজার কোটি টাকার উপরে বাড়তে থাকে। যেমন, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বেড়ে হয় ৬২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা, পরের বছর ২০১৭ সালে ১২ হাজার কোটি টাকা বেড়ে হয় ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে তা আরো বেড়ে হয় ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের জুন শেষে তা এক লাফে বেড়ে হয় ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ আরো বেশি। প্রকৃত হিসাব করলে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে খেলাপি ঋণ। অতিসম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ দেখানো হচ্ছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে তা ২ লাখ ৪০ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের প্রায় ২৬ শতাংশ। এসবের মধ্যে আদালতের স্থগিত আদেশ, পুনঃতফসিল ও বিশেষ অ্যাকাউন্টের ঋণও রয়েছে। এই পরিমাণ খেলাপি ঋণ দেশের জাতীয় বাজেটের প্রায় অর্ধেক। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে আইএমএফ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে এ রিপোর্ট হস্তান্তর করে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল।


আরো সংবাদ




Paykwik Paykasa
Paykwik