১৬ অক্টোবর ২০১৯

পল্লী বিদ্যুতের ৩ কোটি ভোক্তার ক্ষোভ : টাকা দেয় গ্রাহক, মালিকানা সমিতির

পল্লী বিদ্যুতের ৩ কোটি ভোক্তার ক্ষোভ : টাকা দেয় গ্রাহক, মালিকানা সমিতির - ছবি : সংগ্রহ

পাঁচ কিংবা সাত, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বেশি সময় ধরে কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করেও নিজের ব্যবহার করা মিটারের মালিকানা পাচ্ছেন না পল্লী বিদ্যুত সমিতির (পবিস) গ্রাহকরা। সংস্থাটির হিসেব মতেই দুই কোটি ৭২ হাজার গ্রাহক প্রতি মাসে তিন হাজার কোটি টাকা নির্ধারিত হিসাবে জমা দিয়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, একটি মিটারের দাম যেখানে নয় শ’ থেকে ১২ শ’ টাকা, সেখানে তারা মাসিক কিস্তিতে দ্বিগুণের বেশি টাকা পরিশোধ করেও ওই মিটারের মালিকানা পাচ্ছেন না। তবে এ বিষয়ে পবিসের বক্তব্য হচ্ছে, কোনো মিটারই গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা হয়নি। গ্রাহকরা শুধু মাসিক ভাড়ার বিনিময়ে এই মিটার ব্যবহার করবে। প্রয়োজনে পবিস এই মিটার প্রতিস্থাপন কিংবা ফেরতও নিতে পারবে।

উপরন্তু বিদ্যুতের প্রি-প্রেইড মিটার প্রতিস্থানের নামে আবারো কয়েক হাজার কোটি টাকার ঋণের আবরণে আবদ্ধ হচ্ছে পবিস এর দুই কোটি ৭২ হাজার গ্রাহক। কোনো কোনো গ্রাহক ১০ বছর পর্যন্ত নিয়মিতভাবে মিটারের টাকা প্রতি মাসে পরিশোধ করার পরও এখন পুরাতন এই মিটার ফেরত নিয়ে পুনরায় প্রি-পেইড মিটার ভাড়ায় নিতে বাধ্য করছে পবিসের আওতাধীন ১১টি অফিস।

পবিসের গ্রাহকদের সাথে কথা জানা যায়, বর্তমানে বিদ্যুতের যে মিটার গ্রাহকরা ব্যবহার করছেন এগুলোর দাম কম-বেশি নয় শ’ থেকে ১২ শ’ টাকা। প্রতিটি সংযোগের শুরুতেই একটি নির্দিষ্ট অংকের টাকা জমা দিয়েই প্রত্যেক গ্রাহককে এই মিটার নিতে হয়। এর পর প্রতি মাসেই মিটার ভাড়া হিসেবে তাকে বিদ্যুৎ বিলের সাথে অতিরিক্ত আরো ১০ টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে । কিন্তু এভাবে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গ্রাহক তার ব্যবহৃত মিটারের পুরো টাকা পরিশোধ করার পরও ওই মিটারের মালিকানা তিনি পাচ্ছে না। এভাবে প্রতি মাসে তাকে মিটারের ভাড়া দিয়েই যেতে হয়।

গ্রাহকদের অভিযোগ, আমরা যদি প্রতি মাসে মিটার ভাড়ার টাকা পরিশোধ করি তাহলে তো একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরে এই মিটার আমাদের নিজেদেরই হওয়ার কথা। কিন্তু এর কোনো নিয়মই মানা হচ্ছে না। নিয়মিতভাবেই প্রতি মাসেই মিটার ভাড়ার টাকা আমাদের কাছে থেকে নেয়াই হচ্ছে। দীর্ঘ দিনেও ভাড়ার এই টাকা নেয়া বন্ধ হচ্ছে না। এখন আবার আমাদের আগের মিটার ফেরত নিয়ে সেখানে প্রি পেইড মিটার প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। একইভাবে এই প্রি-পেইড মিটারের ভাড়াও আমাদের কাছ থেকেই আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু আশা করেছিলাম আমাদের পুরাতন মিটারের প্রতিস্থাপন করে বিনা ফি বা বিনা ভাড়ায় নতুন মিটার আমারকে দেয়া হবে। অর্থাৎ আমরা যারা দীর্ঘ দিন ধরেই হাজার হাজার কোটি টাকা মিটার ফি হিসেবে জমা দিলাম সেই টাকার হিসাবতো মিলাতে পারছি না।

এদিকে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর দেয়া তথ্যমতে দেশে এখন বিদ্যুতের মোট গ্রাহক প্রায় সাড়ে তিন কোটির উপরে। সব গ্রাহকই প্রতি মাসে মিটার ভাড়া পরিশোধ করছেন। অর্থাৎ মিটার প্রতি গড় হিসেবেও এক হাজার টাকা ধরলে এ যাবৎ গ্রাহকদের কাছ থেকে নেয়া হয়ে গেছে কয়েক হাজার কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ বিভাগের দুর্নীতি বন্ধ করে একদিকে রাজস্ব বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে বিদ্যুতের অপচয় রোধ ও গ্রাহককে উন্নত সেবা দেয়ার লক্ষে পর্যায়ক্রমে সব গ্রাহকবে প্রি- পেইড মিটারের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে বর্তমানে প্রি পেমেন্ট মিটারসমূহ আরো আধুনিকায়ন করে অন-লাইন স্মার্ট প্রি-পেইড মিটারের মানদণ্ড প্রণয়ন করে ২০২৫ সালের মধ্যে দুই কোটি প্রি-পেইড মিটার ক্রয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সবগুলো বিতরণ সংস্থাকে তাদের গ্রাহকদের জন্য এই প্রি পেইড মিটারের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বাপবিবোতে) পল্লী বিদ্যুতায়ন কার্যক্রমের আওতায় ঢাকা বিভাগীয় অ লে প্রি-পেউড-মিটার স্থাপন (পর্যায়-১) নামক একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। আর এই প্রকল্পের মেয়াদকাল ধরা হয়েছে ১/৭/২০১৫ হতে ৩০/৬/২০২০ পর্যন্ত।

শুধু পবিস নয়, এর বাইরেও ঢাকা এবং জেলা শহরগুলোতেও বিভিন্ন বিতরণ সংস্থার মাধ্যমে গ্রাহকরা বিদ্যুত সংযোগ পাচ্ছে। এসব সংস্থার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বাপবিবো), বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড (বাবিউবো), ঢাকা পাওয়ার ডিষ্ট্রিবিউশন কোম্পানি লি: (ডিপিডিসি), ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লি: (ডেসকো), ওয়েষ্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লি: (ওজোপাডিকো) প্রভৃতি।

বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড সূত্র জানায়, দেশে এখন পল্লী বিদ্যুতের মোট গ্রাহক সংখ্যা দুই কোটি ৭২ হাজার। এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। নতুন নতুন উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় আনা হচ্ছে। সূত্র আরো জানায়, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকদের মধ্যে সাত লাখ প্রি-পেইড মিটার প্রতিস্থাপনের টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৩ শ’ ৫৩টি (২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) প্রি পেইড মিটার প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরেই মিটার প্রতিস্থাপন হয়েছিল ৩ লাখ। ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ৪২ হাজার ৭ শ’, ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে ছিল ১০ হাজার ৫০টি, ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে ছিল পাঁচ হাজার এবং ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে ছিল দুই হাজার সাত শ’ ৫০টি।

বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বাপবিবো) প্রি পেইড মিটার স্থাপন প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম রোববার নয়া দিগন্তকে জানান, আমরা গ্রাহকের আগের পোষ্ট পেইড মিটার ফেরত নিয়ে নতুন করে প্রে পেইড মিটার প্রতিস্থাপন করছি। আর মিটারের মালিকানা নিয়ে তিনি বলেন, কোনো গ্রাহকের কাছেই আমরা মিটার বিক্রি করি না। গ্রাহকরা শুধু মাসিক ভাড়ার বিনিময়ে মিটার ব্যবহার করেন। দীর্ঘদিন মিটার ভাড়া পরিশোধের পরও কেন গ্রাহককে মিটারের মালিকানা দেয়া হয় না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, একটি মিটার গ্রাহক যখন ব্যবহার করেন তখন যদি কোনো মিটার অকেজো বা নষ্ট হয় তারপরে আমরাই তাৎক্ষণিকভাবে নতুন মিটার প্রতিস্থাপন করে দেই। অতিরিক্ত কোনো অর্থ নেয়া হয় না। অর্থাৎ গ্রাহক শুধু মিটারের ভাড়া পরিশোধ করার মাধ্যমেই এটি ব্যবহার করার সুযোগ পান।

পুরানো মিটার ফেরত নেয়া প্রসঙ্গে প্রি পেইড মিটার বিতরণের সাথে জড়িত পবিস-১-এর জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মাসুদুর রহমান জানান, আমরা শহর অঞ্চলের গ্রাহকের পোস্ট পেইড মিটার ফেরত এনে সেখানে প্রি পেইড মিটার প্রতিস্থাপন করছি। আর এই পুরাতন মিটারগুলো অপেক্ষাকৃত গ্রাম অঞ্চলে নতুন নতুন গ্রাহকের আবেদনের প্রেক্ষাপটে স্থাপন করছি। তিনি জানান, যেভাবে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে তাতে একসাথে সব গ্রাহককে প্রি পেইড মিটার দেয়া সম্ভব হবে না। তাই নতুন আর পুরাতন মিলিয়েই মিটার দেয়ার কাজটি করছে পবিস।


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum