২২ আগস্ট ২০১৯

ঈদকে ঘিরে বাজারে উড়ছে জাল নোট

ঈদকে সামনে রেখে বাজারে উড়ছে জাল নোট। জাল নোটের কারবারিদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে বিপাকে পড়েছে প্রশাসন। এসব কারবারিরা বার বার আটক হলেও আইনের ফাঁক ফোকরের কারণে পার পেয়ে যাচ্ছে। ছাড়া পেয়ে আবার শুরু করছে তাদের কারবারি। ফলে বড় উৎসবকে সামনে রেখে আতঙ্কে ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণ।

প্রশাসনের তথ্যমতে, এ কারবারে জড়িতদের গ্রেফতার করা হলেও ৮০ শতাংশই জামিনে মুক্তি পেয়ে পরবর্তী সময়ে আবারো নিয়োজিত হচ্ছে জাল নোটের ব্যবসায়। ঈদ এলেই তাদের সিন্ডিকেট সারাদেশে সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিভিন্নভাগে বিভক্ত হয়ে জাল নোটের কারবারী করছে বেশ কিছু অসাধু চক্র।

এরা নগরীর আশপাশ এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে জাল নোট তৈরি করে। ধরা পড়ার ভয়ে তারা এক বাসায় বেশি দিন থাকে না। কয়েক মাস পর পর তারা বাসা বদলে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলে যায়। সেখানেই গড়ে তোলে জাল নোট তৈরির টাকশাল।

এ সিন্ডিকেটে নারী সদস্যও রয়েছে। প্রতিটি স্তরেই ওই সিন্ডিকেটের নারী সদস্য সক্রিয় রয়েছে। কখনো গৃহিণী, কখনো কলেজছাত্রী সেজে জাল টাকা বহন করে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিচ্ছে তারা। আবার তাদের মাধ্যমেই পণ্য কেনাকাটা করে মার্কেটে জাল টাকার বিস্তার ঘটানো হয়। সেজন্য তাদের দেয়া হয় মোটা অঙ্কের কমিশন। ধরা পড়লে তাদের আইনি সহায়তাও দেয় সিন্ডিকেটের সদস্যরা।

এদিকে জাল নোটের এই অবৈধ কারবারিদের হাত থেকে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে প্রতিবারের মতো এবারো উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাদের সচেতনতার অংশ হিসেবে দেশের ৫৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে আসল নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য-সংবলিত ভিডিওচিত্র প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জাল টাকা তৈরিকারী চক্রের এক সদস্য জানিয়েছেন, প্রতি একশ পিস ১০০০ টাকার নোট অর্থাৎ ১ লাখ টাকা তৈরি করতে তাদের খরচ পড়ে ছয় থেকে সাত হাজার টাকা। সেই টাকা তারা আবার ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে।

গত সোমবার বিকেলে ঢাকা মেডিক্যাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২ লাখ ৩২ হাজার জাল নোটসহ চারজনকে গ্রেফতর করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (দক্ষিন বিভাগ) পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা হলেন- হাবিবুর রহমান ওরফে হাবিব মোল্লা, মিন্টু ব্যাপারী, রুবেল ব্যাপারী, দুলাল মিয়া। এ চক্রের দলনেতা হাবিব মোল্লা বলে জানিয়েছে গোয়েন্দারা। এ চক্রটি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় জাল নোটের লেনদেন করতো।

এর আগে গত শুক্রবার রাতে কামরাঙ্গীরচর থানার পূর্ব রসুলপুর এলাকার একটি বাড়িতে অভিযান চালায় গোয়েন্দারা। এ সময় ৪৬ লাখ টাকার জাল নোট ও জাল নোট তৈরির সরঞ্জামসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (দক্ষিণ) পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা হলেন- জীবন ওরফে সবুজ, জামাল উদ্দিন ও বাবুল ওরফে বাবু। পুলিশ বলছে, ঈদকে সামনে রেখে চক্রটি বিপুল পরিমাণ জাল টাকা বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা করেছিল।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (দক্ষিণ) বিভাগের এসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে জীবন ওরফে সবুজ ও জামালউদ্দিনকে গ্রেফতার করা হয়। সেখান থেকে ৭ লাখ জাল টাকার নোট উদ্ধার করা হয়। পরে তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাত সাড়ে ১১টার দিকে চকবাজারের ইসলামবাগে অপর একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৩৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকার জালনোট এবং জাল নোট তৈরির সরঞ্জামাদিসহ বাবুল ওরফে বাবুকে গ্রেফতার করা হয়।

তিনি বলেন, এ চক্রটি জাল নোট তৈরি করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের চক্রের সদস্যদের মাধ্যমে সরবরাহ করার কথা স্বীকার করে। মূলত ঈদকে সামনে রেখে জাল নোট তৈরির এই চক্রটি সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। তাদের বিরুদ্ধে কামরাঙ্গীরচর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়েছে। চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

জানা গেছে, ঈদ ও কোরবানীসহ বড় উৎসব আসলেই জাল নোট প্রকারকচক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। অধিক লাভের আশায় প্রতারণাকারীরা সাধারণত ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বেশি জাল করে থাকে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত এক হাজার টাকার মূল্যমানের ৬ লাখ ৮২ হাজার টাকার জাল নোট ধরা পড়েছে। একই সময়ে ৫০০ টাকা মূল্যমানের এবং ১০০ টাকা মূল্যমানের ৬২ হাজার ৭০০ টাকার জাল নোট ধরা পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, আইনের দুর্বলতা নিয়ে দেশে জাল নোটের বিস্তার ঘটছে। জাল নোট প্রতিরোধে অর্থদণ্ড ও সর্বোচ্চ ১২ বছরের জেল বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রেখে একটি আইন বাস্তবায়নাধীন।

জানা গেছে, উৎপাদকের এক লাখ টাকা তৈরি করতে খরচ হয় সাত থেকে ১০ হাজার টাকা। তারা পাইকারি বিক্রেতার কাছে ১ লাখ টাকা ১৪-১৫ হাজার টাকায় বিক্রয় করে। পাইকারি বিক্রেতা ১ম খুচরা বিক্রেতার নিকট বিক্রয় করে ২০-২৫ হাজার টাকা, ১ম খুচরা বিক্রেতা ২য় খুচরা বিক্রেতার নিকট বিক্রয় করে ৪০-৫০ হাজার টাকায় এবং ২য় খুচরা বিক্রেতা মাঠ পর্যায়ে সেই টাকা আসল এক লাখ টাকায় বিক্রয় করে।

গ্রেফতার জাল নোট কারবারী ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, জাল নোট তৈরির জন্য প্রথমে টিস্যু কাগজের এক পার্শ্বে বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি স্ক্রিনের নিচে রেখে গাম দিয়ে ছাপ দিতো। এরপর ১০০০ লেখা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোগ্রামের ছাপ দিতো। অতপর অপর একটি টিস্যু পেপার নিয়ে তার সাথে ফয়েল পেপার থেকে টাকার পরিমাপ অনুযায়ী নিরাপত্তা সূতা কেটে তাতে লাগিয়ে সেই টিস্যুটি ইতিপূর্বে বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি জলছাপ দেয়া টিস্যু পেপারের সাথে গাম দিয়ে সংযুক্ত করে দিতো।

এভাবে টিস্যু পেপার প্রস্তুত করে বিশেষ ডট কালার প্রিন্টারের মাধ্যমে ল্যাপটপে সেভ করে রাখা টাকার ছাপ অনুযায়ী প্রিন্ট করা হতো। ওই টিস্যু পেপারের উভয় সাইট প্রিন্ট করা হতো এবং প্রতিটি টিস্যু পেপারে মোট ৪টি জাল টাকার নোট প্রিন্ট করা হতো। এরপর প্রিন্টকৃত টিস্যু পেপারগুলো কাটিং গ্লাসের উপরে রেখে নিখুঁতভাবে কাটিং করা হতো। পরবর্তীতে কাটিংকৃত জাল টাকাগুলো বিশেষভাবে বান্ডিল করে এটি চক্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হতো।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিসি (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, ঈদ বা বড় বড় উৎসব গুলোতে জাল টাকা প্রস্তুতকারক ও কারবারীদের অপতৎপরতা বেড়ে যায়। ইতোমধ্যে বেশ কিছু কারবারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যারা বাইরে আছে তাদের গ্রেফতারে প্রতিদিনই অভিযান চলছে। পুলিশ রোজার আগ থেকেই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে, যাতে কেউ জাল নোট বাজারে ছাড়তে না পারে।

উদ্ধার হওয়া জাল টাকা আগের টাকার চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত উল্লেখ করে তিনি বলেন, উদ্ধার হওয়া জাল টাকায়ও নিরাপত্তা সুতা স্থাপন করা হয়েছে। এসব নিরাপত্তা সুতা তারা কিভাবে যোগাড় করেছে সেই ব্যাপারে গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সাধারণ চোখে বোঝা খুবই কঠিন যে এটা জাল টাকা। তবে অরজিনাল টাকা কিছুটা খসখসে এবং জাল টাকা বেশি মসৃণ বলে তিনি জানান। এক্ষেত্রে টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে সচেতন হওয়ার আহবান জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।


আরো সংবাদ

বিদ্যুতের খুটিতে ঝুলছে লাইনম্যানের লাশ (৫৭৭৯৫)সীমান্তে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে ৬ ভারতীয় সেনা নিহত (৪০৭২৫)জঙ্গলে আলিঙ্গনরত পরকীয়া জুটির বজ্রপাতে মৃত্যু (৩৯৮৭৫)ভারতীয় গোয়েন্দা রিপোর্ট : বারুদের স্তূপে কাশ্মির, যেকোনো সময় বিস্ফোরণ (২৬৬৫০)কাশ্মির নিয়ে যা বলছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স (১৯১২২)বক্তব্যকে ভুলভাবে নেয়া : যা বললেন জাকির নায়েক (১৬০৫৩)মিয়ানমারে ভয়াবহ সংঘর্ষে ৩০ সেনা নিহত (১৫৮৪১)যেকোনো সময় গ্রেফতার হতে পারেন ভারতের সাবেক অর্থমন্ত্রী চিদম্বরম (১৫৪৭৯)কাশ্মির নিয়ে আবার মধ্যস্ততার প্রস্তাব ট্রাম্পের (১৩৩৯১)১২৮ বছর বয়সের বৃদ্ধের আকুতি : ‘বাবা আমাকে বাঁচাও, ওরা আমারে খেতে দেয় না’ (১২৮২৬)



mp3 indir bedava internet