১৩ ডিসেম্বর ২০১৯

ভারতের বিধিনিষেধে বিপর্যয়ের মুখে আমদানি-রফতানি

ভারতের বিধিনিষেধে বিপর্যয়ের মুখে আমদানি-রফতানি - সংগৃহীত

বেনাপোল স্থলবন্দরে ভারতীয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষের এক বিতর্কিত নির্দেশনায় বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে ধস নামার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে প্রতিদিন ৫০০-৬০০ ট্রাকে মালামাল আমদানি হয় ভারত থেকে। নতুন এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন হলে বাণিজ্য এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসবে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন।

কলকাতার চিফ কাস্টমস কমিশনার স্বাক্ষরিত এই আদেশে বলা হয়, এখন থেকে একইভাবে বাংলাদেশ থেকে যেসব পণ্য রফতানি হবে সেসব পণ্যও ট্রাক থেকে খালাস করে শতভাগ পরীক্ষা করেই প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে। ভারত থেকে যত পণ্য বাংলাদেশে রফতানি হবে তার প্রতিটি চালানের মালামাল পেট্রাপোল বন্দর এলাকায় ট্রাক থেকে আনলোড করে শতভাগ কায়িক পরীক্ষা সম্পন্ন করেই রফতানির অনুমতি দেবেন কাস্টমস কর্মকর্তারা।

বেনাপোল বন্দর দিয়ে গার্মেন্ট পণ্যসহ বিভিন্ন শিল্প কলকারখানার শতকরা ৮০ ভাগ কাঁচামাল আমদানি হয়ে থাকে। ভারতীয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষের গত বৃহস্পতিবার বিকেলে হঠাৎ করে এ ধরনের নির্দেশনায় আমদানি বাণিজ্য অর্ধেকে নেমে আসবে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের। প্রতিদিন ৫০০-৬০০ ট্রাক পণ্য আনলোড করে কিভাবে পরীক্ষা সম্পন্ন করে রফতানি হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। কারণ বর্তমানে ভারতের পেট্রাপোল বন্দর ও কলকাতা পার্কিংয়ে পাঁচ হাজার পণ্য বোঝাই ট্রাক আটকে আছে যত্রতত্র। ফলে সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতের পেট্রাপোল বন্দর এলাকায় বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার কারণে এমনিতেই একটি পণ্য চালান ভারত থেকে আমদানি হয়ে বেনাপোল বন্দর পর্যন্ত আসতে ১৫ দিন লেগে যায়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া পেট্রাপোল বন্দরে এ সব পণ্য চালান শতভাগ কায়িক পরীক্ষা হলে এ ভোগান্তি আরো বাড়বে। এতে পণ্য খালাস একদিকে যেমন কঠিন হয়ে পড়বে, তেমনি আমদানি খরচও বেড়ে দ্বিগুণ হবে। এর প্রভাব পড়বে দেশীয় বাজারে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলেছে, অফিসিয়ালভাবে তারা এখন পর্যন্ত কোনো চিঠি পায়নি। তবে এ নিয়ম চালু হলে দ্রুত আমদানি-রফতানি বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। জানা যায়, পেট্রাপোল বন্দর থেকে বেনাপোল বন্দরে প্রবেশের আগে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়া এর আগে ট্রাক থেকে পণ্য নামিয়ে পরীক্ষা করা হতো না। নতুন এ সিদ্ধান্তে সব ব্যবসায়ী হতবাক হয়ে পড়েছেন। অবশ্য ব্যবসায়ীদের জানিয়ে দেয়া হয়, খুব দ্রুত এ সিদ্ধান্ত মেনে ব্যবসায়ীদের বাণিজ্য সম্পাদন করতে হবে।

পেট্রাপোল বন্দরের স্টাফ অ্যাসোসিয়েশেনের সাধারণ সম্পাদক কার্তিক চনুত জানান, কাস্টমসের এই আদেশে দুই দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য কঠিন হয়ে যাবে। বিশেষ করে পচনশীল পণ্য চালান রফতানি কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। ভারত-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের ল্যান্ডপোর্ট সাব-কমিটির চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান জানান, পেট্রাপোল কাস্টমস সহকমিশনার স্বাক্ষরিত একটি আদেশ পাওয়া মাত্রই বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার/সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দফতরে তা অবহিত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এখনই না বসলে এ বন্দর দিয়ে বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়বে বলেও জানান তিনি।

বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের সাথে প্রতি বছর ৩০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়ে থাকে। এ কাজে সরকারের প্রতি বছর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়। যোগাযোগব্যবস্থা সহজের কারণে প্রথম থেকেই বেনাপোল বন্দর দিয়ে বাণিজ্যে আগ্রহ বেশি ব্যবসায়ীদের। কিন্তু কয়েক বছর ধরে বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশাসনিক বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা আর ব্যবসায়ীদের হয়রানির কারণে সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।ফলে কাক্সিক্ষত রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ হচ্ছে এ বন্দর কর্তৃপক্ষ।

চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বেনাপোল স্থলবন্দরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা। গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৪৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। ঘাটতি ৬০৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা। বেনাপোল কাস্টমসের সহকারী কমিশনার আকরাম হোসেন জানান, নতুন কোনো নিয়মের বিষয়ে ভারতীয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো চিঠি দেয়নি। তবে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তিনি বিষয়টি শুনেছেন। এ নিয়ম চালু হলে দ্রুত বাণিজ্য সম্পাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে বলে জানান তিনি।

ভারতীয় রুপির মূল্য বৃদ্ধিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা : এদিকে, ভারতীয় রুপির মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি-রফতানিবাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভারতীয় রুপির বিপরীতে বাংলাদেশী টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানি-রফতানিবাণিজ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারতীয় রুপির মান বাড়ায় মার্কিন ডলারের বাজার মূল্যহ্রাস পেয়েছে। আর এ অবস্থার জন্য আমদানিবাণিজ্যে লোকসান থেকে যেতে পারে বলে ব্যবসায়ীরা মন্তব্য করেছেন। বাংলাদেশের আমদানিকারকদের ধারণা, ভারতে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে ভারতে আন্তর্জাতিক বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে পাসপোর্ট যাত্রীও বেশির ভাগ কমে গেছে।

বেনাপোলের ওপারে পেট্রাপোল বন্দরের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবসায়ী ফজের আলী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশী ১০০ টাকায় ভারতীয় ৮২.৫০ রুপি পাওয়া যায়। মার্কিন ১০০ ডলারেও মিলছে ভারতীয় ৬৮৫০ রুপি। কিন্তু এক মাস আগে বাংলাদেশী ১০০ টাকায় ভারতীয় ৮৫ থেকে ৮৬ রুপি ছিল। আর মার্কিন ১০০ ডলারেও ছিল ভারতীয় ৭২০০ রুপি।

বেনাপোল আমদানি-রফতানি সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক জানান, ভারতীয় রুপির বিপরীতে বাংলাদেশী টাকা ও ডলারের মান কমে যাওয়ায় আমদানিবাণিজ্যে কিছুটা বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এতে লোকসানের আশঙ্কায় তারা আপাতত আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। বেনাপোল চেকপোস্ট কাস্টমস কার্গো শাখার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আজিজুর রহমান জানান, গত বৃহস্পতিবার বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারতে রফতানি হয়েছে ৭৪ ট্রাক বিভিন্ন প্রকারের বাংলাদেশী পণ্য।

আর ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ১৮৪ ট্রাক বিভিন্ন ধরনের পণ্য। বেনাপোল ইমিগ্রেশনের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) লিয়াজ হোসেন জানান, এর আগে প্রতিদিন এ পথে প্রায় সাত থেকে আট হাজার পাসপোর্টধারী যাত্রী যাতায়াত করেছেন। এখন যাতায়াতের পরিমাণ কম।


আরো সংবাদ




hacklink Paykwik Paykasa
Paykwik