২৪ মে ২০১৯

প্রয়োজন নেই তবুও আসছে নতুন ব্যাংক

প্রয়োজন নেই তবুও আসছে নতুন ব্যাংক - ছবি : সংগ্রহ

দেশের আর্থিক বিবেচনায় নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক বিশ্লেষকেরা। তারা মনে করছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আকার ও ভৌগোলিক বিবেচনায় এত ব্যাংকের প্রয়োজন না হলেও লাইসেন্স নিয়ে নতুন ব্যাংকগুলো আগ্রাসী ব্যাংকিং করছে। ঋণ ভাগাভাগি করে নিয়ে যাচ্ছেন ব্যাংকের পরিচালকেরা। নিজের ব্যাংকের পাশাপাশি ঋণ নিচ্ছেন অন্য ব্যাংক থেকেও। আবার বেনামেও ঋণ নিচ্ছেন কেউ কেউ। বর্তমানে এ ধরনের বেশির ভাগ ঋণই খেলাপি হয়ে পড়েছে। অসুস্থ প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ছে ব্যাংকগুলো। এমনি পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় আরো চার নতুন ব্যাংক দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রয়োজন না হলেও নতুন ব্যাংক দেয়ার এ প্রক্রিয়ায় অর্থনীতিবিদদের মতো হতাশ হয়েছেন অর্থমন্ত্রীও।

জানা গেছে, গ্রাহকেরা আমানত রেখে তা ফেরত পাচ্ছেন না নতুন প্রজন্মের ব্যাংক ফারমার্স থেকে। নতুন প্রজন্মের অন্য ব্যাংকগুলোও চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। বর্তমানে আস্থার সঙ্কট দেখা দিয়েছে গ্রাহকের মধ্যে। বেশি মুনাফার প্রলোভন দিয়েও আমানত প্রত্যাহার ঠেকাতে পারছে না নতুন ব্যাংকগুলো। শুধু সাধারণ গ্রাহকই নন, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও নতুন এ ব্যাংকগুলোর ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও নতুন ব্যাংক থেকে তহবিল প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। আর নতুন আমানত বলা চলে আসছেই না। ফলে নতুন প্রজন্মের ৯টি ব্যাংকের সাথে বেকায়দায় পড়েছে অন্য ব্যাংকগুলো। এরই মধ্যে নগদ টাকার সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করেছে। সরকারি ব্যাংক বাদে বেশির ভাগ ব্যাংকই কলমানি মার্কেট থেকে ধার করে চলছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০১২ সালে নতুন ৯টি ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে মতামত চাওয়া হয়েছিল। দেশের অর্থনীতির বিবেচনায় নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স না দেয়ার পক্ষে মতামত দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার পক্ষে অর্থমন্ত্রীর মতামতের ভিত্তিতে তখন ৯ ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল। তখন অনেক উদ্যোক্তাই ব্যাংক পাওয়ার জন্য নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেনি। এর মধ্যে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সরকার দলীয় সংসদ সদস্য মহীউদ্দীন খান আলমগীর লাইসেন্স পাওয়ার আগেই ফারমার্স ব্যাংকের অফিস খুলে কার্যক্রম চালিয়েছিলেন। আরেকটি ব্যাংক লাইসেন্সে নিয়ে আমানত নিলেও প্রথম এক মাস বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বাধ্যতামূলক নগদ অর্থ সংরক্ষণ বা সিআরআর সংরক্ষণ করেনি। প্রভাব খাটিয়ে অনেকেই অধিক হারে ব্যাংকের শাখা খোলার লাইসেন্স নিয়েছিলেন। যেমন ১০ বছর বয়সী একটি ব্যাংকের যেখানে শাখা রয়েছে ৬০টি, সেখানে নতুন এ ৯ ব্যাংকের কোনো কোনোটির শাখা খুলেছে ৬০টির ওপরে। জালজালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ বিতরণ, নানা অনিয়ম জড়িয়ে পড়েছে কোনো কোনো ব্যাংক। এভাবেই আগ্রাসী ব্যাংকিং করে ব্যাংকগুলো। লাইসেন্স পাওয়ার মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় ডুবতে বসেছে ফারমার্স ব্যাংক। গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না ব্যাংকটি। আটকে গেছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু তহবিলের ৫০৩ কোটি টাকা। 

নতুন অন্য ব্যাংকগুলোর তিন-চারটির অবস্থাও নাজুক। ব্যাংকগুলো নগদ টাকার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর। সরকারি ব্যাংকগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত পাচ্ছে। ফলে তাদের তহবিল সঙ্কট নেই। তবে বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংকেরই তহবিল সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এ সঙ্কট মেটাতে বেশির ভাগই কলমানি মার্কেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এমনি পরিস্থিতিতে সরকার আরো নতুুন চারটি ব্যাংকের লাইসেন্স দিচ্ছে। গত ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় চারটি নতুন ব্যাংকের অনুমোদনের বিষয়ে সবুজ সঙ্কেত দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি ব্যাংকের অনুমোদন চূড়ান্ত করা হয়েছে। বাকি তিনটির অনুমোদনও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। 

রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন এ চার ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ায় অখুশি হয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গত ১ নভেম্বর অর্থনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ইকোনোমিক রিপোর্টার্স ফোরামের নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠকে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় বর্তমানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি। এর পরও চারটি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। তিনি বলেছেন, এভাবে ব্যাংকের অনুমোদন দেয়ায় আমি (ভেরি আনহ্যাপি) খুবই অখুশি। এর আগেও গত ২৪ অক্টোবর সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ব্যাংকিং খাত খুব বেশি বড় হয়ে গেছে। অনেক ব্যাংক অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এটা মনে হয় একটু সীমিতকরণ (কনসুলেশন) দরকার হতে পারে।

সূত্র জানায়, ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট ক্ষমতায় এসে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সমীক্ষা চালিয়ে বলেছিল, দেশের অর্থনীতিতে আর নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। যেসব ব্যাংক আছে সেগুলোকেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানের নীতিমালায় এনে পরিচালিত করা কঠিন চ্যালেঞ্জ। কেননা ওই সময়েও ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার বেশি ছিল। মূলধন ঘাটতিও ছিল ব্যাপক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই মতামতকে গুরুত্ব¡ দিয়ে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী (প্রয়াত) এম সাইফুর রহমান বেসরকারি খাতে আর কোনো নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছিলেন। ফলে বিএনপি সরকারের শেষ সময় পর্যন্ত কোনো নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হয়নি। যদিও ওই সময়ে নতুন ব্যাংকের অনুমোদন চেয়ে ১০৬টি আবেদন পড়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বারবার বলে আসছে বর্তমান অর্থনীতিতে নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক তার অবস্থান ধরে রাখতে পারে না। সরকারের সদিচ্ছার কারণে বিএনপির আমলে বাংলাদেশ ব্যাংক তার সিদ্ধান্ত ধরে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে যেখানে অর্থমন্ত্রীর মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হয় না, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক তার মতামত দিয়ে বেশি দূর যেতে পারে না। নতুন ব্যাংক দেয়ার সরকারের সিদ্ধান্তকেই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হয়। যেমনটি করা হয়েছিল ২০১২ সালে। এখনো তাই করা হচ্ছে।


আরো সংবাদ

Instagram Web Viewer
agario agario - agario
hd film izle pvc zemin kaplama hd film izle Instagram Web Viewer instagram takipçi satın al Bursa evden eve taşımacılık gebze evden eve nakliyat Canlı Radyo Dinle Yatırımlık arsa Tesettürspor Ankara evden eve nakliyat İstanbul ilaçlama İstanbul böcek ilaçlama paykasa