১৫ নভেম্বর ২০১৮

জ্বালানি তেল পরিবহন : পরামর্শক খাতেই ব্যয় ১৪০ কোটি টাকা

প্রতিকী ছবি -

সড়ক বা নৌ পথে ট্যাংকারের মাধ্যমে জ্বালানি তেল পরিবহন পদ্ধতির বদলে সরকার এখন তিন শতাধিক কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনের মাধ্যমে মাটির নিচ দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় তেল পরিবহনের পরিকল্পনা নিয়েছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা এবং কুমিল্লা থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাসের মোট ৩০৫ দশমিক ২৩৪ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। বিপুল জ্বালানি তেল স্থানান্তর ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ বলে বাংলাদেশ পেট্রলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে। এ প্রকল্পে দুই ধরনের পরামর্শক খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪০ কোটি ২৬ লাখ টাকা। প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকার চট্টগ্রাম থেকে জ্বালানি তেল পরিবহনে ব্যয় কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ভূগর্ভস্থ পাইপলাইনে সরবরাহের প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে। সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এ পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৮৬১ কোটি ৭২ লাখ টাকা। চলতি বছর প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় অনুমোদন পেলে ২০২০ সালের জুনে সমাপ্ত করা সম্ভব হবে বলে প্রকল্প প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে পেট্রলিয়াম পণ্যের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫৫ লাখ মেট্রিকটন। দেশে বিদ্যমান গ্যাস সঙ্কটের কারণে পেট্রলিয়াম পণ্যের চাহিদা ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২১ সালের পর দেশের পুরনো বিভিন্ন ফিল্ড থেকে গ্যাস উত্তোলন কমতে থাকবে। দেশে আর কোনো নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে পেট্রলিয়াম পণ্যের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। ঢাকা এবং তার আশপাশের এলাকায় জ্বালানি তেলের বর্তমান চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ টন, যা ঢাকার উপকণ্ঠে গোদনাইল ও ফতুল্লা ডিপোর মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। চাঁদপুরে অবস্থিত তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর তিনটি ডিপোতে জ্বালানি তেলের বর্তমান চাহিদা প্রায় এক দশমিক ৫৫ লাখ টন। চট্টগ্রামের প্রধান স্থাপনা থেকে কোস্টাল ট্যাংকারে বর্তমানে গোদনাইল, ফতুল্লা ও চাঁদপুরে জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়।

এ ছাড়া ঢাকায় অবস্থিত বিপণন কোম্পানিগুলোর গোদনাইল বা ফতুল্লা ডিপো থেকে শ্যালো ড্রাফট ট্যাংকারে উত্তরবঙ্গে অবস্থিত বাঘাবাড়ি, চিলমারি ও সাচনা বাজার ডিপোতে তেল পাঠানো হয়। এ ডিপোগুলোতে বর্তমান বার্ষিক চাহিদা প্রায় চার লাখ ১৮ হাজার টন। বিদ্যমান পরিবহন ব্যবস্থায় ট্যাংকারে এ বিপুল জ্বালানি তেল যথাসময়ে চট্টগ্রাম থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহনে সরকারকে বিপুল অর্থ খরচ করতে হয়। এ ছাড়া নদীপথে জ্বালানি তেল পরিবহনে পরিবেশগত প্রভাবও রয়েছে।

জানা গেছে, বর্তমানে নদীপথে প্রায় ৯০ শতাংশ জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। এ বিপুল জ্বালানি তেল বহনের জন্য কোম্পানিগুলোর পরিবহন বহরে প্রায় ২০০টি কোস্টাল ট্যাংকার রয়েছে। ভবিষ্যতে জ্বালানি তেলের চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে কোস্টাল ট্যাংকারের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে। এতে করে ডিপোতে লোডিং বা আনলোডিং অবকাঠামো দ্বারা পরিচালন কার্যক্রম দুরূহ হয়ে পড়বে। পাশাপাশি নদীগুলোর নাব্যতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে কোস্টাল ট্যাংকার চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে চাহিদার সাথে দ্রুততর সময়ে মধ্যে সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

পাইপলাইন নির্মাণ প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম থেকে গোদনাইল পর্যন্ত ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের ২৩৭ দশমিক ৭১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন, গোদনাইল থেকে ফতুল্লা পর্যন্ত ৮ দশমিক ২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ১০ ইঞ্চি ব্যাসের লাইন এবং কুমিল্লা থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত ৫৯ দশমিক ২৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ ৬ ইঞ্চি ব্যাসের ভূগর্ভস্থ পেট্রলিয়াম পাইপ লাইন স্থাপন করা হবে। আর এইচডিডি পদ্ধতিতে ২২টি নদী এবং কেইজড ক্রসিং পদ্ধতিতে ৪৬টি রাস্তা ও ১২টি রেল ক্রসিং অতিক্রম করতে হবে পাইপলাইনকে। নির্মাণ করতে হবে পাঁচটি সেকশনাল লাইজিং ভালভ স্টেশন।

প্রকল্প ব্যয়সংক্রান্ত তথ্য থেকে জানা গেছে, ডিজাইন ও ড্রইংয়ের পরামর্শক সেবা খাতে যাবে ৪৬ কোটি ৯ লাখ টাকা। আর প্রকল্প ব্যবস্থাপনার পরামর্শক খাতে ৯৪ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। প্রকৌশলীদের জন্য যানবাহন ভাড়া খাতে ব্যয় ১০ কোটি ৮১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। জমি অধিগ্রহণে যাবে এক হাজার ২৪৬ কোটি আট লাখ টাকা। হুকুম দখলে যাবে প্রায় ৬৬ কোটি টাকা। ভূমি উন্নয়নে যাবে ৪০ কোটি ৫৫ লাখ ৪২ হাজার টাকা।

পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি উইং থেকে বলা হচ্ছে, এ প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখলে এক হাজার ২৭৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে, যা মোট ব্যয়ের ৪৪.৫০ শতাংশ। জমি অধিগ্রহণ একটি জটিল প্রক্রিয়া ও দীর্ঘ সময়ের বিষয়।

প্রকল্পের মেয়াদে জমি অধিগ্রহণ শেষে পুরো কাজটি সম্পন্ন হবে কিনা তা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই জমি অধিগ্রহণ ও লাইন নির্মাণ দুইটি আলাদা প্রকল্প করার জন্য কমিশন থেকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ ও ডিজাইন সম্পন্ন করার পর নতুন প্রকল্পটি প্রস্তাব করা যেতে পারে। প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে বিশেষ করে আসবাবপত্র, দায়িত্ব ভাতা, যাতায়াত ভাড়া, পরিবহন ব্যয় যুক্তিযুক্ত করা উচিত।


আরো সংবাদ