২১ নভেম্বর ২০১৮

সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ব্যাংক

সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ব্যাংক - ছবি : সংগৃহীত

ব্যাংকিং খাত আবার সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে গেছে। এ ঝুঁকির বিষয়টি আরো জোরালো হয়েছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো এক সতর্কবার্তায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বলেছেন, চীন, জাপান, কাজাখস্তান ও রুমানিয়া এই চার দেশের হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটারগুলোতে ম্যালওয়্যার স্থাপন করে অনবরত তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। এমনি পরিস্থিতিতে রিজার্ভ চুরির মতো বড় ধরনের দুর্ঘটনা রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক তাই ব্যাংকগুলোকে কঠোর সতর্ক বার্তা দিয়েছে। গতকাল সব ব্যাংক ও ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর কাছে পাঠানো বার্তায় বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংকগুলোকে সম্ভাব্য সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার নিরাপত্তা বৃদ্ধি করতে নির্দেশ দিয়েছে। একই সাথে সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে নিবিড় তদারকি নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার নির্র্দেশ দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ দিন ধরে সুইফট সিস্টেম চালু ছিল। অত্যন্ত নিরাপত্তার এ সিস্টেম ভালোই চলছিল। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে এ সূক্ষ্ম সুইফট সিস্টেমের সাথে আরটিজিএস (রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট) নামক আরেকটি সফটওয়্যার স্থাপনের পর। জানা গেছে, ২০১৫ সালে নতুন এ সফটওয়্যার স্থাপন করতে কয়েকজন অতি উৎসাহী কর্মকর্তার আগ্রহেই স্থাপন করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট বিভাগের ডেপুটি গভর্নরের আপত্তি সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্বাহী পরিচালক সুভঙ্কর সাহাসহ আরো কয়েক কর্মকর্তা তৎকালীন গভর্নরকে দিয়ে এ ফাইল স্বাক্ষর করা হয়। সুইফট সিস্টেমের সাথে আরটিজিএস নামক নতুন সফটওয়্যার স্থাপনের পর থেকেই ব্যাংকিং খাতে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে। সর্বশেষ সারা বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা চুরি হয়ে যায়, যার বেশির ভাগই গত তিন বছরেও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ দুই ডেপুটি গভর্নরকে সরিয়ে দেয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি রোধে এর পর থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক হতে থাকে। কিন্তু নতুন করে এ ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সতর্ক বার্তার পর।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটারে ম্যালওয়্যার বসিয়ে তথ্য চুরির বিষয়টি ধরা পড়েছে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের স্থাপন করা সাইবার সেন্সরে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে সতর্ক করা হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রয়োজনীয় সাইবার সিকিউরিটি টিম না থাকার কারণে তথ্য চুরির ঘটনা বন্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো: ইউনুসুর রহমানের কাছে গত ৯ আগস্ট পাঠানো চিঠিতে মোস্তাফা জব্বার বলেছেন, ‘... সরকারি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) কর্তৃক সাইবার নিরাপত্তা টিম গঠন করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা বৃদ্ধির ল্েয সাইবার সেন্সর স্থাপন করা হয়েছে। ওই সেন্সর হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী পরিলতি হয় যে ব্যাংকের গুরুত্ব¡পূর্ণ কম্পিউটারগুলোতে সাইবার অপরাধীরা ম্যালওয়্যার স্থাপন করেছে, যা ব্যবহারকারীর অগোচরে ব্যবহারকারীর পরিচয় ও পাসওয়ার্ড কাজাখাস্তান, রুমানিয়া, জাপান ও চীনে চিহ্নিত সাইবার অপরাধীদের কাছে সংবেদনশীল তথ্য অনবরত প্রদান করছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপকে সতর্ক করা হয়েছে।

চিঠিতে আরো বলা হয়, ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ থেকে এ বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়োজনীয় সাইবার সিকিউরিটি টিম না থাকায় এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্বিত হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। এরূপ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য নিরাপত্তার েেত্র বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’ 

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের দৃষ্টি গোচরে আসার পরপরই সতর্ক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গতকাল সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীর কাছে পাঠানো বার্তায় বলা হয়েছে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সাইবার অপরাধীরা পেমেন্ট সিস্টেমস হ্যাক করে দেশের ভেতরে এবং দেশের বাইরে থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়। উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এ ধরনের সাইবার সিকিউরিটি এবং হ্যাকিংসংক্রান্ত নিরাপত্তা হুমকিতে রয়েছে।

এমতাবস্থায় সম্ভাব্য সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার নিরাপত্তা বৃদ্ধি করার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। একই সাথে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে নিবিড় তদারকি নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যাংকগুলোকে কঠোরভাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।


আরো সংবাদ