২১ নভেম্বর ২০১৮

বড় শিল্প গ্রুপের হাতে বন্দী ব্যাংকিং খাত

বড় শিল্প গ্রুপের হাতে বন্দী ব্যাংকিং খাত - ছবি : সংগৃহীত

উদ্দেশ্য ছিল বিশেষ সুবিধা নিয়ে ঋণ পুনর্গঠনের মাধ্যমে শিল্প গ্রুপগুলো লোকসান কাঠিয়ে উঠবে। একই সাথে প্রতিষ্ঠানগুলো চালু রেখে আয়-উপার্জনের মাধ্যমে ঋণের অর্থ পরিশোধ করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ঋণ পুনর্গঠনের সুবিধা নেয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলো তা পরিশোধ করছে না। যে পরিমাণ ঋণ পুনর্গঠন করেছিল তার কিস্তি পরিশোধ না করায় সুদে-আসলে তা ক্রমন্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, উচ্চ আদালত থেকে খেলাপি ঋণের ওপর স্থাগিতাদেশ নিয়ে বড় বড় গ্রুপ অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নিচ্ছে। এতে ব্যাংকের পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে লোকসানের পাল্লা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, মাত্র ১ ও ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ও সুদের ওপর বিশেষ ছাড় নিয়ে ১১টি শিল্প গ্রুপ ১৪ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করেছিল। ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় ওই ঋণ আবার খেলাপি হয়ে পড়েছে। গত মার্চ মাস শেষে সুদে-আসলে তা বেড়ে হয়েছে ১৭ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। ২৪টি ব্যাংক থেকে এ সুবিধা নিয়েছিল শিল্প গ্রুপগুলো। ঋণ পরিশোধ না করায় ব্যাংকগুলো এখন চরম বেকায়দায় পড়ে গেছে। ব্যাংকগুলোর পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। এতে ব্যাংকের মুনাফা থেকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে ব্যাংকের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ২৪ ব্যাংকের একটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে প্রভাবশালী এ শিল্প গ্রুপগুলোর বিশেষ সুবিধায় ঋণ নবায়ন করা হয়েছিল। সাধারণত ঋণ নবায়ন করতে পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণের ১৫ শতাংশ নগদে ডাউন পেমেন্ট দিতে হয়। কিন্তু ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে ১ ও ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট নিয়ে ও ঋণ মঞ্জুরির সময় ধার্যকৃত সুদে বিশেষ ছাড় দিয়ে ঋণ নবায়ন করা হয়েছিল। ওই সময় ব্যাংকের প্রকৃতপক্ষে ক্ষতি হলেও আশা করা হয়েছিল বিশেষ সুবিধা নিয়ে শিল্প গ্রুপগুলো ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করবে। কিন্তু বাস্তবে উল্টোটি হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বিশেষ সুবিধা নিয়ে ঋণ পুনর্গঠন করে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছে না।

উল্টো তাদেরকে খেলাপিও বলা যাবে না। কেউ কেউ উচ্চ আদালত থেকে স্থাগিতাদেশ নিয়েছেন। উচ্চ আদালত থেকে রিট নিয়ে আবার অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। অথচ, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী ঋণখেলাপি গ্রাহক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবেন না। অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আবার তারা খেলাপি হয়ে যাচ্ছেন। এভাবেই ব্যাংকিং খাত তাদের হাতে বন্দী হয়ে পড়েছে।

ব্যাংকগুলো থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, সরকার সমর্থিত দেশের প্রভাবশালী একটি শিল্প গ্রুপ বিশেষ সুবিধায় পাঁচ হাজার ২১৬ কোটি টাকার ঋণ নবায়ন করেছিল। ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় ওই ঋণ এখন সুদে-আসলে ছয় হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা হয়েছে। 

দেশের প্রথম প্রজন্মে একটি ব্যাংকের প্রায় এককভাবে নিয়ন্ত্রণকারী সরকার সমর্থক এক প্রভাবশালী শিল্প গ্রুপ বিশেষ সুবিধায় এক হাজার ৭৭৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকার ঋণ নবায়ন করেছিল। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠানও ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় এখন সুদে-আসলে তা প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অপর এক গ্রুপ এক হাজার ১৫২ কোটি টাকার ঋণ বিশেষ সুবিধায় নবায়ন করেছিল। ওই প্রতিষ্ঠানও ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় সুদে-আসলে তা দেড় হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বহুল আলোচিত গ্রুপ এনন টেক্স এক হাজার ৪৯ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করেছিল। কিন্তু তাদের ঋণও এখন সুদে-আসলে এক হাজার ১৫০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এভাবে ১১টি শিল্প গ্রুপ ১৪ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকার খেলাপিঋণ বিশেষ সুবিধায় নবায়ন করার পর তা এখন ১৭ হাজার ১০৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবে, এ হিসাব গত মার্চ প্রান্তিকের।

জুনের হিসাব এখন চূড়ান্ত করা হয়নি। জুনের হিসাবে আরো প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অপর একটি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, দেশের একটি প্রভাবশালী গ্রুপের কাছে তার ব্যাংকের পাওনা আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি। ওই গ্রুপ ব্যবসায়িক মন্দার কথা বলে ঋণ পরিশোধ করছেন না। ঋণগুলো খেলাপি হওয়ার যোগ্য হলেও আদালতের নির্দেশে তা খেলাপি করা যাচ্ছে না। আরো একটি প্রভাবশালী গ্রুপের হাতে ঋণের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকা। একজন সাবেক এমপির মালিকানাধীন গ্রুপের কাছে ঋণের পরিমাণ তিন হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেনামী ঋণও রয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই এমডি। 

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এর আগে বলেন, বড় গ্রাহকদের সব ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে দেয়া উচিত নয়। ব্যাংকগুলো সবাই মিলে একই গ্রাহককে ঋণ দিচ্ছে, ফলে গ্রাহকের ঋণের পরিমাণ বেশি হয়ে যাচ্ছে। এতে ব্যাংকের ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি আরো বলেন, ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগ নেয়া উচিত। একই সাথে বড় শিল্প গ্রুপের ঋণগুলো কঠোরভাবে তদারকি করা উচিত। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রেও নজরদারি বাড়ানো উচিত।


আরো সংবাদ