২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ভারত থেকে রেমিট্যান্স নিয়ে উল্টা প্রচার!

ভারত থেকে রেমিট্যান্স নিয়ে উল্টা প্রচার! - ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশ থেকে ভারত বছরে ৩৩ হাজার কোটি টাকা রেমিট্যান্স আয় করছে। ভারত যেসব দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আয় করে তার তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। এ খবর গত কয়েক বছর ধরে ভারতেরই বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। উল্টো ওই তথ্য চেপে রেখে এখন প্রচার করা হচ্ছে ভারত থেকে বাংলাদেশ বছরে ৩৩ হাজার কোটি টাকা রেমিট্যান্স আয় করছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় ভারত থেকে। অন্য দিকে বাংলাদেশ থেকে ভারত বছরে রেমিট্যান্স আয় করছে ১২ কোটি ডলার। 

এসব খবরের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয় নিয়ে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার সরবরাহ করা বিস্ময়কর তথ্য, যা নির্ভরযোগ্য কোনো সংস্থার তথ্য দিয়ে মেলানো যাচ্ছে না। 
ভারতের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ায় ২৫ এপ্রিল এক খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আয় করে ভারত থেকে। ভারতে বসবাসরত বাংলাদেশী শ্রমিকেরা ২০১৭ সালে ৪ বিলিয়ন ডলার বা ৩৩ হাজার কোটি টাকা দেশে পাঠিয়েছেন। এ খবরে আরো বলা হয়, বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশী শ্রমিকসহ প্রবাসীরা প্রতি বছর বাংলাদেশে যে পরিমাণ অর্থ পাঠান তার ৩০ ভাগই আসে ভারত থেকে। 

টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে গ্রাফ চিত্রে দেখানো হয়েছে, ভারত থেকে ২০১৭ সালে ৫ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স বিদেশীরা নিয়ে গেছেন যার মধ্যে চার বিলিয়ন (৪০০ কোটি) ডলার নিয়ে গেছেন শুধু বাংলাদেশীরা। শতকরা হিসেবে ৭০ ভাগ। 
টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের এ তথ্যের উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদন। সারা বিশ্বের রেমিট্যান্স প্রবাহ, প্রবাসী শ্রমিক নিয়ে বিশ্বব্যাংকের এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় গত ২৩ এপ্রিল। 
বাংলাদেশের প্রবাসী আয় নিয়ে বিস্ময়কর এ খবর শুধু টাইমস অব ইন্ডিয়া নয়, ভারতের বিভিন্ন অনলাইন, ব্লগসহ নামকরা অনেক গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদন এবং ওয়েব সাইটেও তুলে ধরা হচ্ছে বিশ্বব্যাংকের কয়েক বছর ধরে প্রতিবেদনের ভিত্তিতে। এর মধ্যে অন্যতম যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টার। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদন সূত্র হিসেবে বিশ্বব্যাংকের যে লিঙ্ক দেয়া হয়েছে তাতে দেখা যায় ২০১২ সালে বাংলাদেশী শ্রমিকেরা ভারত থেকে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন (৬৬০ কোটি) ডলার বা বর্তমান হিসাবে ৫৫ হাজার কোটি টাকা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন দেশে। 

টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরের তথ্য নেই বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে!
বাংলাদেশের প্রবাসী আয় নিয়ে এ ধরনের খবরের সত্যতা কতটুকু তা অনুসন্ধানে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েব সাইট, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইট, পিউ রিসার্চ সেন্টার, উইকিপিডিয়াসহ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত নির্ভরযোগ্য খবর পর্যালোচনা করা হয়। একই সাথে পর্যালোচনা করা হয় ভারতের বিভিন্ন অনলাইনভিত্তিক গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত প্রকাশিত খবর। 
প্রথমেই খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় বিশ্বব্যাংকের যে প্রতিবেদনের নাম করে বিভিন্ন মাধ্যমে এ ধরনের খবর প্রচার করা হচ্ছে সেখানে এ ধরনের বিস্ময়কর তথ্য সত্যিই আছে কি না। সে জন্য বিশ্বব্যাংকের গত ২৩ এপ্রিল প্রকাশিত ‘মাইগ্রেশন অ্যান্ড রেমিট্যান্সেস : রিসেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড আউটলুক-২০১৮’ শীর্ষক ৫১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি পড়া হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে ভারত থেকে ২০১৭ সালে বাংলাদেশী শ্রমিকদের কর্তৃক চার বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আয়ের কোনো তথ্য নেই। উল্টো বিশ্বব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ের প্রধান উৎস সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, কুয়েত ও মালয়েশিয়া। 

বিশ্বব্যাংকের পরস্পরবিরোধী তথ্য
ভারত থেকে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের সূত্র হিসেবে বিশ্বব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে কোনো তথ্য না পাওয়ায় এ নিয়ে অনেক অনুসন্ধানের পর বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠিত দ্যা গ্লোবাল নলেজ পার্টনারশিপ অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট তথা নোম্যাডের ওয়েবসাইটে পাওয়া যায় বিস্ময়কর এ তথ্য। ‘মাইগ্রেশন অ্যান্ড রেমিট্যান্সেস : রিসেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড আউটলুক-২০১৮’ বিশ্বব্যাংকের এ প্রতিবেদনটি রয়েছে নোম্যাডের ওয়েব সাইটে। তবে বিশ্বব্যাংকের ওয়েব সাইটেও এর লিঙ্ক রয়েছে। নোম্যাডের এ প্রতিবেদনের সাথে মাইগ্রেশন ও রেমিট্যান্স সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি পরিসংখ্যান যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘বাইল্যাটারাল মাইগ্রেশন মেট্রিক্স ২০১৭’ এবং ‘বাইল্যাটারাল রেমিট্যান্স মেট্রিক্স ২০১৭’ তালিকায় ২০১৭ সালে ভারত থেকে বাংলাদেশ চার বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আয় করেছে মর্মে দেখানো হয়েছে। ‘মাইগ্রেশন অ্যান্ড রেমিট্যান্স : রিসেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড আউটলুক-২০১৮’ প্রতিবেদনটি ‘মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্রিফ ২৯’ নামে প্রকাশ করা হয়েছে নোম্যাডের ওয়েব সাইটে। এর লেখক বিশ্বব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট দিলিপ রাথা ও সুপ্রিয় দে, সোনিয়া প্লাজা ও গনেশ সিশানসহ সাতজন।
বিশ্বব্যাংকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড রেমিট্যান্সেস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আয় করে সৌদি আরব থেকে এবং সেখানে কোথাও ভারতের নামই নেই। আবার মাইগ্রেশন ও রেমিট্যান্স মেট্রিক্সে দেখানো হয়েছে ভারত থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স তথা চার বিলিয়ন ডলার আয় করেছে ২০১৭ সালে। দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী এ তথ্য। 

পিউ রিসার্চ সেন্টার ও বিশ্বব্যাংক 
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে ২০১৬ সালে ভারত থেকে বাংলাদেশ ৪ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার বা বর্তমান হিসেবে ৩৪ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা রেমিট্যান্স আয় করে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে তারা এ তথ্য পরিবেশন করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের ওয়েবসাইটের লিংক দেয়া হয়েছে। লিংকে ক্লিক করলে দেখা যায় রেমিট্যান্স মেট্রিক্স ২০১৬ তে এ তথ্য উল্লেখ করা আছে। এখানে শুধু ২০১৬ সাল নয় ২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশসহ কোন দেশ বিশ্বের কোন দেশ থেকে কত রেমিট্যান্স আয় করেছে তা উল্লেখ করা আছে। 
বিশ্বব্যাংকের এ তালিকায় দেখা যায় বাংলাদেশ ২০১২ সালে ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি ৬ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার বা বর্তমানে ৫৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকা আয় করেছে। এভাবে ২০১১ সালে ৫ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার বা ৪৭ হাজার ৯৯২ কোটি টাকা ভারত থেকে আয় করে বাংলাদেশ। ২০১০ সালে ৫ দশমিক শূন্য ৪১ বিলিয়ন ডলার বা ৪২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ২০১৩ সালে ৩ দশমিক ৮৫৪ বিলিয়ন ডলার বা ৩২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ২০১৪ সালে ৪ দশমিক ৩৫৫ বিলিয়ন ডলার বা ৩৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা এবং ২০১৫ সালে ৪ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার বা ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রেমিট্যান্স আয় করে বাংলাদেশ ভারত থেকে। ২০১৭ সালে ৪ দশমিক ০৩৩ বিলিয়ন ডলার বা ৩৪ হাজার ৬৬ কোটি টাকা আয় করে। 

বিশ্বব্যাংকের রেমিট্যান্স মেট্রিক্সে দেখা যায়, ২০১৫ সালে ভারত থেকে বাংলাদেশ ৪ দশমিক ৪৫ বিলিযন ডলার আয় করেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের লিংকে এ তথ্য দেখা যায়। পিউ রিসার্চ সেন্টারে প্রকাশিত ২০১৭ সালের মার্চের এক প্রবন্ধে বলা হয় ২০১৫ সালে বাংলাদেশী শ্রমিকেরা ভারত থেকে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। এ তথ্যও সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী। 
ভারত থেকে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয় সংক্রান্ত আরো কিছু গণমাধ্যমের খবরে বলা হয় বাংলাদেশের ৩২ লাখ শ্রমিক বাস করেন ভারতে। ভারত থেকে বাংলাদেশ যেমন সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আয় করে, তেমনি বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি শ্রমিক বাস করেন দেশটিতে। এসব তথ্যের সূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে জাতিসঙ্ঘের জনসংখ্যা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন। 

উইকিপিডিয়ার তথ্য 
২০১৬ সালে ভারত থেকে কোন দেশ কত টাকা রেমিট্যান্স হিসেবে নিয়ে গেছে তার তালিকা রয়েছে। এ তালিকায় সবার আগে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। অর্থাৎ উইকিপিডিয়ার তথ্যেও বলা হয়েছে ২০১৬ সালে ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আয় করছে বাংলাদেশ। তবে বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে যেমন বলা হয়েছে ভারত থেকে বাংলাদেশ বছরে ৪ বিলিয়ন ডলার বা ৩৩ হাজার কোটি টাকা আয় করছে এখানে তা বলা হয়নি। এখানে বলা হয়েছে ২০১৬ সালে ভারত থেকে বাংলাদেশ ৮৫৮ কোটি টাকা বা ১০২ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আয় করেছে। বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য অনেক সংস্থা ও গণমাধ্যমে পরিবেশিত খবরের তথ্যের সাথে উইকিপিডিয়ার তথ্যে দূর ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। 

বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো : ৩০ শীর্ষ দেশের তালিকায়ও নেই ভারতের নাম
চলতি অর্থবছরে জুন মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ কোন দেশ থেকে কত রেমিট্যান্স আয় করেছে- তার তালিকা রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে। গত জুন মাস পর্যন্ত রেমিট্যান্স অর্জনকারী শীর্ষ ৩০টি দেশের নাম রয়েছে তালিকায়। এ তালিকায় কোথাও ভারতের নাম নেই। তালিকায় বাংলাদেশের শীর্ষ রেমিট্যান্স আয়ের দেশ হিসেবে নাম রয়েছে সৌদি আরবের। 
২০১৭-১৮ অর্থবছরে গত জুন মাস পর্যন্ত শীর্ষ যে ৩০টি দেশ থেকে বাংলাদেশ রেমিট্যান্স আয় করেছে সেগুলো হলো সৌদি আরব ২ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ২ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার, যুক্তরাষ্ট্র ১ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার, কুয়েত ১ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার, মালয়েশিয়া ১ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার, যুক্তরাজ্য ১ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার। ক্রমান্বয়ে পরের দেশগুলো হলো ওমান, কাতার, ইতালি, বাহরাইন, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্রান্স, লেবানন, জর্ডান, দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইরাক, মৌরিটিয়াস, জার্মানি, স্পেন, গ্রিস, জাপান, মালদ্বীপ, ব্রুনাই, হংকং, সুইডেন ও সাইপ্রাস। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ওয়েব সাইটে একটি তালিকা রয়েছে যাতে ১৯৭৬ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত কোন দেশে বাংলাদেশের কত শ্রমিক রয়েছে তার সংখ্যা উল্লেখ রয়েছে রেমিট্যান্স আয়সহ। এ তালিকায়ও কোথাও ভারতের নাম নেই বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ের দেশ হিসেবে। 

৭২ ভাগ প্রবাসী আয় ৫ দেশ থেকে
বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশী প্রবাসী ও শ্রমিকেরা প্রতি বছর কত টাকা দেশে পাঠান, বাংলাদেশী শ্রমিক কী পরিমাণ বিদেশে আছে, প্রতি বছর কী পরিমাণ শ্রমিক বিদেশে যায় তা বাংলাদেশ ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে বাংলাদেশের সব জাতীয় দৈনিক ও টিভি রেডিওতে। এসব খবরের কোথাও কখনো বাংলাদেশের শ্রমবাজার বা প্রবাসী আয়ের উৎস হিসেবে ভারতের নাম আসেনি। 
বাংলাদেশের সরকারি সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এসব খবর অনুসন্ধান করে যে তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে, তা হলো বাংলাদেশের প্রবাসী আয় মূলত পাঁচটি দেশনির্ভর। এগুলো হলোÑ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া ও কুয়েত। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এক হাজার ৫৩২ কোটি ডলার প্রবাসী আয় বাংলাদেশে আসে, যা ছিল একটি রেকর্ড। এর মধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া ও কুয়েত থেকে এসেছে এক হাজার ১০১ কোটি ডলার। শতকরা হিসেবে এটি ৭২ ভাগ। সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় হয়েছে সৌদি আরব থেকে ৩৩৫ কোটি ডলার। এরপর রয়েছে আরব আমিরাত ২৮২ কোটি ডলার, যুক্তরাষ্ট্র ২৩৮ কোটি ডলার, মালয়েশিয়া ১৩৮ কোটি ডলার ও কুয়েত ১০৮ কোটি ডলার। 

বাংলাদেশের শ্রমবাজার ৪ দেশে
চারটি দেশ বাংলাদেশের শ্রমবাজার হিসেবে পরিচিতি। দেশগুলো হলোÑ সৌদি আরব, আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও কুয়েত। শ্রমবাজার হিসেবে পরিচিত নয় কিন্তু বিপুল প্রবাসী আয় আসে বাংলাদেশে যে দেশ থেকে সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৫ শতাংশ প্রবাসী আয় আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের অর্ধেকের বেশি আসে ছয়টি আরব দেশ থেকে। এগুলো হলোÑ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েত ও বাহরাইন । অথচ ২০১৭ সালের মার্চে পিউ রিসার্চ সেন্টারে ফিলিপ কন্নর লিখিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত বিশ্বের প্রবাসীদের অন্যতম গন্তব্য এবং প্রতিবেশী বাংলাদেশের ৩২ লাখ, পাকিস্তানের ১১ লাখ, নেপালের পাঁচ লাখ প্রবাসী শ্রমিক বাস করেন সেখানে। কিন্তু ওপরে বর্ণিত বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয় ও শ্রমবাজারের বাস্তব তথ্যের নিরিখে ভারতে বাংলাদেশের ৩২ লাখ শ্রমিক থাকার তথ্যের কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না। 

উল্টো প্রচার 
বাংলাদেশ থেকে ভারত বছরে চার বিলিয়ন ডলার বা ৩৩ হাজার কোটি টাকা রেমিট্যান্স আয় করছে। ভারত বিশ্বের যেসব দেশ থেকে রেমিট্যান্স আয় করে তার তালিকায় বাংলাদেশের স্থান পঞ্চম। এ খবর ভারতেরই বিভিন্ন গণমাধ্যমে কয়েক বছর ধরে প্রকাশিত হচ্ছে। উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে ভারত ২০১৬ সালে চার বিলিয়ন ডলার বা ৩৩ হাজার কোটি টাকা রেমিট্যান্স হিসেবে নিয়ে গেছে। 

ভারত থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আয় করছে মর্মে যেসব তথ্য ও খবর প্রকাশিত হয়েছে, তাতে দেখা যায়Ñ পরিকল্পিতভাবে চেপে যাওয়া হয়েছে বাংলাদেশ থেকে ভারতের বছরে চার বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স নিয়ে যাওয়ার তথ্য। বরং তা অতিমাত্রায় কমিয়ে দেখানো হয়েছে। যেমন পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০১৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে ভারত ১১ কোটি ডলার রেমিট্যান্স আয় করেছে। বিশ্বব্যাংকের মেট্রিক্সে বলা হয়েছেÑ ২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে ভারত ১২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স আয় করেছে। বাংলাদেশের প্রবাসী আয় নিয়ে বিশ্বব্যাংকের পরিবেশিত তথ্য বিষয়ে জানার জন্য বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের লিড অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনকে বারবার মোবাইল ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এরপর সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে মেসেজ দেয়ার পরও তিনি ফোন ধরেননি।


আরো সংবাদ