১৫ নভেম্বর ২০১৮

কী আছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২৬ দফা নির্দেশনায়?

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২৬ দফা নির্দেশনা : পাত্তা দিচ্ছে না সরকারি ব্যাংকগুলো - ছবি : সংগৃহীত

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সম্পর্কিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২৬ দফা নির্দেশনার প্রতি পাত্তা দিচ্ছে না সরকারি ব্যাংকগুলো। এই নির্দেশনার অন্যতম ছিল বড় ঋণ খেলাপিদের হালনাগাদ তালিকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংকের ওয়েবসাইটে, নোটিশ বোর্ড বা অন্যরূপ দৃশমান স্থানে প্রকাশ এবং ১০০ কোটি টাকা বা তদূর্ধ্ব খেলাপি ঋণের কেসগুলো তদারকির জন্য প্রতিটি ব্যাংকে একটি করে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি তদারকি সেল গঠন করে ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা নেয়া। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে গত বছরের ২৬ আগস্ট এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় ছয় ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে বলা হয়। কিন্তু ১০ মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি এ সম্পর্কে কোনো প্রতিবেদনও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে প্রেরণ করেনি। এই পরিস্থিতিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে গত সপ্তাহে আবারো তাগাদা দিয়ে এ সম্পর্কিত অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। 

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ২৬ আগস্ট এই বিভাগে একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এই কর্মশালায় ২৬টি সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য চূড়ান্ত করা হয়। এই সুপারিশগুলো স্বল্প মেয়াদে (সর্বোচ্চ এক বছর), মধ্য মেয়াদে (এক থেকে দুই বছর) এবং দীর্ঘ মেয়াদে (দুই বছরের ঊর্ধ্বে) বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এসব সুপারিশের মধ্যে ছিলÑ খেলাপি ঋণ আদায়ে সফলতার জন্য ব্যাংকারদের প্রণোদনা প্রদান ও ব্যর্থতার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা প্রবর্তন করে নীতিমালা/গাইডলাইন প্রণয়ন বা সংশোধন। 

ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের বিষয়ে সুপারিশে বলা হয়Ñ ঋণ প্রস্তাব প্রক্রিয়াকরণ ও ঋণ অনুমোদনে বিদ্যমান পলিসি/পদ্ধতি নিয়মিত রিভিউ করা, ব্যাংকগুলোকে ঋণ প্রক্রিয়াকরণে বিদ্যমান নীতিমালা/গাইডলাইন সংশোধনপূর্বক পুনরায় জারি করা এবং সর্বোচ্চ তিন ধাপে ঋণ প্রস্তাব প্রক্রিয়াকরণসহ অনুমোদন করা এবং জমি বা ভূ-সম্পত্তিকে জামানত হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য জালিয়াতি প্রতিরোধে জামানত গ্রহণের বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়নসহ একটি কেন্দ্রীয় তথ্য কোষ গঠন। এতে আরো বলা হয়, এটিআর/বিল পারচেজকরণে নন-ফান্ডেজ ঋণসুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনাসহ এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নীতিমালা জারি করবে। মধ্য মেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য যেসব সুপারিশ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ ঋণ প্রস্তাব মূল্যমানের ক্ষেত্রে জামানতের পাশাপাশি প্রকল্পের ক্যাশ ফ্লো, ক্রেডিট রিস্ক গ্রেডিং ভালোভাবে বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এটি মনিটরিং করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। 

ঋণ অনুমোদনের আগে অবশ্যই গ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট রেটিং করার ব্যবস্থা প্রচলনের সুপারিশ করছে মন্ত্রণালয়। নো ইউর কাস্টমার (কেওয়াইসি) ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য বিবেচনা করা হয়। ঋণ গ্রহীতাদের ক্ষেত্রেও এবার এ ব্যবস্থা চালু করতে চায় মন্ত্রণালয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে সি কেওয়াইসি (সেন্ট্রল কেওয়াইসি) এবং ই-বিএএম (ইলেক্ট্রনিক ব্যাংক এ/সি ম্যানেজমেন্ট) বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা হতে পারে। ১০০ কোটি টাকার ওপরে বৃহৎ খেলাপি ঋণ গ্রহীতাদের আলাদা ডেট-মনিটরিংয়ের আওতায় এনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ডেট রিকভারি ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থা করার জন্য বলেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। 

মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ওই ব্যাংকের জন্য বিভিন্ন সূচকের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিবে এবং প্রতি তিন মাস পরপর সূচকগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি মূল্যায়ন করার ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সিইওদের টার্গেট দেয়া, মূল্যায়ন করা এবং সে অনুযায়ী বোনাস, ইনসেনটিভ ইত্যাদি প্রদানসহ তাদের নিয়োগ বহাল রাখা বা নিয়োগের মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয় বিবেচনা করার ব্যবস্থা প্রবর্তন করার কথা বলা হয়েছে এতে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও এবং পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচ্য সিআইবির তথ্য যথেষ্ঠ নয়, তাই বিস্তারিত তথ্যভাণ্ডার তৈরির চলমান কাজ দ্রুত শেষ করার কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়া পর্ষদ সদস্যদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন ও মনিটর করার ব্যবস্থা করতে চায় মন্ত্রণালয়। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর নিয়োগ পরীক্ষা (এমসিকিউ বা লিখিত পরীক্ষা) বিকেন্দ্রীকরণ করা হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভাগীয় অফিসের তত্ত্বাবধানে বিভাগীয় পর্যায়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

দীর্ঘ মেয়াদি সুপারিশে বলা হয়েছে, লোন এগেইনস্ট ট্রাস্ট রিসিপ্ট ঋণ খেলাপির মূল কারণ। বিষয়টি খতিয়ে দেখে এলটিআর দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করার ব্যবস্থা করতে সুপারিশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী ঋণ গ্রহীতাকে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল নেয়ার জন্য ১৫০ শতাংশ জামানত দিতে হয়। এটি পরিবর্তন/সংশোধন করার বিষয়টি পরীক্ষা করে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি মামলার সংখ্যা কমানোর জন্য ঋণ গ্রহীতা বা তার পক্ষে মামলা করার ক্ষেত্রে ব্যাংকের পাওনা অর্থের ৫০ শতাংশ অর্থ বাধ্যতামূলকভাবে জমা প্রদানের ব্যবস্থা প্রবর্তন করার কথাও বলা হয়েছে সুপারিশে। 

সুপারিশের বিষয়ে জানতে চাইলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, এই সুপারিশ বা নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য সরকারি ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ করা সত্ত্বেও তাদের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে আমরা আবারো তাদের কাছে গত সপ্তাহে চিঠি পাঠিয়েছি, তাদের উত্তর পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।


আরো সংবাদ