২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮
ভোগের পাশে বঞ্চনা-শেষ

ঠিকমতো খেতে পাই না ট্যাক্স দেবো কী

ঠিকমতো খেতে পাই না ট্যাক্স দেবো কী - ছবি : সংগৃহীত

রাজধানীতে উচ্চশিক্ষিত একটি শ্রেণী রয়েছে যারা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। এদের কারো মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা আবার কারোর বেতন ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু তারপরও বাস্তবে তারা গরিব। দিন আনে দিন খায় গরিবের চেয়েও এদের অনেকের অবস্থা শোচনীয়। এ শোচনীয় অবস্থার কথা কারো কাছে সহজে প্রকাশও করতে পারে না তারা। মাসের শেষের দিকে তাদের ঠিকমত বাজার খরচের টাকা থাকে না। পরিবার পরিজন এবং আত্মীয়স্বজনের কাছে তারা প্রায়ই বিড়ম্বনার শিকার হয়। মাসে ৬০ হাজার টাকা আয় করেও কেন অনেকের গরিবি জীবন যাপন এ রাজধানীতে, তার একটি কারণ খুঁজে পাওয়া যায় উচ্চশিক্ষিত একজন চাকরিজীবীর বিবরণীতে। 

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে শামসুল ইসলাম (আসল নাম নয়) বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। 
তিনি জানান, আমার মাসিক বেতন সর্বসাকুল্যে ৬২ হাজার টাকা। আমাকে আমার এক বন্ধু বলল, তুমি তো ট্যাক্সের আওতায় পড়ে গেছ। শুনে আমি হাসলাম। কারণ প্রায়ই মাসের ২৫ তারিখ পার হওয়ার আগেই আমার বেতনের টাকা শেষ হয়ে যায়। পরিবার আর আত্মীয় স্বজনের মধ্যে খুবই বিড়ম্বনায় পড়তে হয় তখন। অনেক সময় মাস শেষে বাজার করতে পারি না ঠিকমতো। ধারদেনা করতে হয়। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন ৬২ হাজার টাকা বেতন পেয়েও কেন এ অবস্থা আমার। আমি কি হিসাব করে টাকা খরচ করতে পারি না? তবে হিসাব দিলেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে। 

৫ বছর বয়সী শামসুল ইসলাম জানান, তার তিন সন্তান। এক মেয়ে ও দুই ছেলে। মেয়ে বড়, এ বছর ভর্তি হয়েছে এইচএসসিতে। দুই ছেলে স্কুলে পড়ে। একজন ষষ্ঠ আরেকজন তৃতীয় শ্রেণীতে। 

শামসুল ইসলাম বলেন, আমার বাসাভাড়া মাসে ২০ হাজার টাকা। লেখাপড়ার পেছনে মাসে খরচ গড়ে ১০ হাজার টাকা। সন্তানদের জন্য কোনো গৃহশিক্ষক নেই, কোচিং প্রাইভেটও আমার স্ত্রী তাদের পড়ালেখা দেখে। তারপরও মাসিক বেতনসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মাসে কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায় তাদের পেছনে। আবার বছরের শুরুতে সেশন ফি নামে একেকজনের জন্য ১০ হাজার টাকার ওপরে লাগে। প্রতি মাসে বাড়িতে আম্মা আব্বাকে পাঠাতে হয় ৬ হাজার টাকা। গৃহকর্মীর খরচ ২ হাজার টাকা। আমার যাতায়াত, ইন্টারনেট বিল, ডিশ বিল, মোবাইল রিচার্জসহ বিভিন্ন ধরনের বিল বাবদ মাসে কমপক্ষে ৭ হাজার টাকা লাগে। এসব মিলিয়ে মোট ৪৫ হাজার টাকা চলে যায়। এরপর হাতে থাকে মাত্র ১৭ হাজার টাকা। এ দিয়ে করতে হয় সারা মাসের বাজার খরচ। মাসে যদি একজনও মেহমান আসে ১ থেকে ২ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়।

আমাদেরও বিভিন্ন আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের বাসায় যেতে হয় ন্যূনতম সামাজিকতা রক্ষার জন্য। আত্মীয় স্বজনের কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে বা বিপদে পড়লে কিছু না দিয়ে পারা যায় না। ভাগিনা, ভাগনে, ভাতিজা ভাতিজির কারো বিয়ে-শাদি হলে উপহার দিতে হয়। এভাবে দেখা যায় বাস্তবে আমাদের পরিবারের জন্য মাসিক বাজার খরচের জন্য ১০ হাজার টাকার বেশি থাকে না অনেক সময়। কোনো কোনো মাসে এমনও হয় যে, বেতন পেয়ে বিভিন্ন খাতের সব খরচ বণ্টনের পর বাজার খরচের জন্য হাতে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা থাকে। তখন মনটা একরাশ হতাশায় ছেয়ে যায়। এর ওপর যদি পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন আর কোনো কূলকিনারা পাওয়া যায় না। গত বছর ছোট ছেলেটি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়।

১৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেল তার পেছনে। তখন বাজার খরচ চালানোর জন্য আমার হাতে কোনো টাকা ছিল না। পুরো মাসের বাজার খরচ আমাকে আত্মীয়স্বজনের কাছে ধার করে চালাতে হয়েছে। এভাবে দিন যতই যাচ্ছে আমাদের অবস্থা উন্নতির পরিবের্ত খারাপ হচ্ছে দেখা যায়। এখন আপনিই বলেন, আমার মতো লোক এই ট্যাক্স দেবে কেমন করে। আমি তো পরিবার পরিজন নিয়ে ঠিক মতো খেতেই পাই না। সন্তানদের অনেক চাহিদা, আবদার মেটাতে পারি না। যখনই কোনো সন্তান কিছু দাবি করে বলতে হয় বাবা পকেটে টাকা নেই। সন্তানদের নিয়ে অনেক সময় ঈদে গ্রামের বাড়িও যেতে পারি না খরচের ভয়ে। একবার বাড়ি যেতে আসতে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। যেখানে নিজের গ্রামের বাড়িতেই যেতে পারি না সেখানে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার কথা ভাববো কেমন করে? এভাবে আরো অনেক স্বপ্নসাধ জীবন থেকে বাদ দিয়েছি আমরা। 

রাজধানীর মুগদার বাসিন্দা রাশেদ মাাস্টার্স পাস করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন ২৬ হাজার টাকা বেতনে। রাশেদ এক সন্তানের বাবা। তিনি জানান, তার ছেলের বয়স চার বছর। এখনো স্কুলে ভর্তি হয়নি। বাসাভাড়া ৯ হাজার টাকা। বাসাটি ঠিক দুই রুমের বলা যায় না। একটি বেডরুম। আরেকটা রুমের সমপরিমাণ খোলা জায়গা আছে যেটিকে ড্রয়িং ডাইনিং হিসেবে ব্যবহার করা যায়। প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা পাঠাতে হয় গ্রামে বৃদ্ধ মা-বাবার জন্য। যাতায়াতসহ আরো কিছু ছোটখাটো খাত মিলিয়ে মাসে ৪ হাজার টাকা খরচ হয়। এরপর মাসিক বাজার খরচের জন্য থাকে ৮ হাজার টাকা। কোনো কোনো মাসে সন্তানের অসুখ হলে, আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কারো বিয়ে হলে খরচ করতে হয়। এভাবে দেখো যায় কোনো কোনো মাসে মাসিক খরচ চালানোর জন্য মাত্র ৩ হাজার টাকা হাতে থাকে। 

রাশেদ আফসোস করে বলেন, ভাই আপনি রাজধানীর গরিব মানুষের কথা লিখছেন, খুব ভালো। কিন্তু আসলে এ শহরে প্রকৃত গরিব আমরা। তবে আমরা আমাদের দারিদ্র্যের কথা কাউকে বলতে পারি না। কারো কাছে হাতও পাততে পারি না। বস্তিতেও থাকতে পারি না। আমরা আছি বড় কষ্টে। আমাদের কষ্ট বোঝার কেউ নেই। অনেকে মনে করে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বড় চাকরি করি, রাজধানীতে থাকি। আমাদের অনেক টাকা পয়সা আছে। গ্রামে গেলে কেউ কেউ জানতে চায় জমি, প্লট, ফ্যাটের বুকিং দিয়েছি কি না বা এসবের মালিক হয়েছি কি না। অনেকের উদাহরণ দিয়ে বলে অমুকের ছেলে তো ফ্যাট কিনেছে, জমি কিনেছে। অমুকে তো ঢাকায় বাড়ি করেছে, গাড়িও কিনেছে। অমুকে তো অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ি কিনে ফেলেছে। অমুকে তো গ্রামে এলে দুই হাতে টাকা বিলায়। তখন খুব বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। 

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা অনেক যুবক রয়েছেন যারা বছরের পর বছর ধরে অল্প বেতনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন রাজধানীতে। মা-বাবাসহ ছোট ভাইবোনদের যাবতীয় খরচ বহন করতে হয় তাদের অনেককে। নিজেরা থাকেন রাজধানীর বিভিন্ন মেসে। পরিবারের খরচ মেটানোর পর হাতে যা থাকে তা দিয়ে রাজধানীতে পরিবার নিয়ে বসবাস করার কথা ভাবতে পারেন না তারা। সে কারণে সময় হলেও বিয়ে করে সংসার করার চিন্তা করতে পারছেন না অনেকে।


আরো সংবাদ