১৯ জুন ২০১৮

বাজেটে নির্বাচনে অর্থায়নকারীদের সুবিধা দেয়া হয়েছে : সিপিডি

-

রাজনৈতিক নির্বাচনে যারা অর্থায়নের মাধ্যমে সহায়তা করে থাকে এই বাজেটে তাদেরকে সুবিধা দেয়া হয়েছে। করপোরেট ট্যাক্স ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়ে সেই সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। এটা ব্যাংকিং খাতে নৈরাজ্য আরো বাড়াবে। তাই নির্বাচনী বছরে এটা সরকারের রাজনৈতিক অর্থনীতির বাজেট বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারী গবেষনা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় চির ধরেছে। এটা আরো বাড়বে। ভ্যাটের চাপে থাকবে মধ্য ও নিম্নমধ্য আয়ের মানুষ। ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে তা অর্জন করা কঠিন। এটা করতে হলে প্রয়োজন ব্যক্তি খাতের ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ।
রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে প্রস্তাবিত বাজেট ২০১৮-১৯ এর উপর পর্যালোচনায় শুক্রবার এই অভিমত ব্যক্ত করেন সিপিডির এই সম্মানীয় ফেলো। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষনা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান।
সিপিডির পক্ষে পর্যালোচনা তুলে ধরে ড. দেবপ্রিয় বলেন, নবীন বাংলাদেশের জন্য প্রবীন বাজেট দিলেন অর্থমন্ত্রী। প্রবৃদ্ধি বাড়ছে এটা ঠিক। প্রবৃদ্ধির সুবিধা গরীব মানুষ পাচ্ছে না। প্রবৃদ্ধি হলেও আয় বৈষম্যটা বাড়ছে। কিন্তু সে লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে তা অর্জন করতে হলে মোট বিনিয়োগ প্রয়োজন ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার। আর তাতে করে ‘পুঁজির উৎপাদনশীলতা কমে যাবে’।
সেই প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবন মানে কতটা পরিবর্তন আনতে পারছে-সে দিকে নজর বৃদ্ধির তাগিদ দেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, আমরা বার বার বলেছি যে, বিড়াল বড় হতে পারে বা ছোট হতে পারে, কিন্তু তাকে ইঁদুর ধরতে হবে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির হার উঁচু হতে পারে, নিচু হতে পারে।
কিন্তু প্রবৃদ্ধিতে গরীব মানুষের দারিদ্র্য বিমোচন হতে হবে, তাদের বেশি পেতে হবে। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশে পূর্ব-পশ্চিম ভাগ তৈরি হয়েছে। এক দিকে সিলেট, চট্টগ্রাম, ঢাকা, অপর দিকে বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী। একদিকে উন্নততর বাংলাদেশ, আরেকদিকে দরিদ্রতর বাংলাদেশ। আমরা দেখছি, সম্পদ, ভোগ এসব ক্ষেত্রে বৈষম্য বেড়েছে। বিশেষ করে আয় বৈষম্য বাড়ছে।
তিনি জানান, যারা সবচেয়ে গরীব, গত পাঁচ বছরে তাদের ৬০ শতাংশ আয় কমেছে। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী পাঁচ শতাংশ মানুষের ৫৭ দশমিক ৪ শতাংশ আয় বৃদ্ধি ঘটেছে। এখানে যার শ্রম ও উদ্যোগ আছে, তার তুলনায় যার পুঁজি আছে, তারা আয় করার বেশি সুযোগ পাচ্ছে। শ্রম ও উদ্যোগের তুলনায় পুঁজি এবং সম্পদকে বেশি পুরস্কৃত করছেন। এটা মেধাভিত্তিক অর্থনীতির জন্য ভালো খবর বলে মনে হচ্ছে না
সিপিডির এই ফেলো বলছেন, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে ধরা হয়েছে। কিন্তু আমরা মনে করি এটি প্রকৃতপক্ষে ৪০ শতাংশ। রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে এটি একটি অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা। আয়করের চেয়ে ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ার কারণে যাদের আয় কম তাদের উপর বেশি চাপ পড়বে। মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তদের উপর চাপ পড়বে বেশি, কিন্তু উচ্চবিত্তদের উপর ততোটা চাপ পড়বে না। বৃহৎ করদাতা ইউনিটির (এলটিইউ) লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে। আমাদের মনে হয়, ব্যাংকের করপোরেট কর কমানোর ফলে এলটিইউ’র লক্ষ্যমাত্রা কমেছে।
বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে উল্লেখ করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) দুই-তৃতীয়াংশ দেশের টাকা থেকেই অর্থায়ন করা হচ্ছে। বাকীটা হচ্ছে প্রকল্প সাহায্য থেকে। নতুন এডিপিতে অর্ধেকের বেশি চলমান প্রকল্প। পিপিপি’র ভিতরে যে ৭৮টি প্রকল্প রয়েছে তার কোন অগ্রগতি লক্ষ্য করছি না। ফলে অননুমোদিত ও সংশোধিত প্রকল্প বাড়ছে। মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়নের হারও অত্যন্ত দুর্বল। পদ্মাসেতুর ক্ষেত্রে সময় বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। ব্যয় বেড়েছে ১.৪৩ শতাংশ। আবার নিজস্ব অর্থায়নে থাকা প্রকল্পগুলো যে অন্য প্রকল্পগুলোর চেয়ে ভালো করছে তাও নয়। সব মিলিয়ে বাজেট বাস্তবায়নে তেমন স্বচ্ছতা নেই।
দেবপ্রিয় বলেন, প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, রেমিটেন্স, রফতানি আয়, মুদ্রাস্ফীতি ও সামাজিক সুরক্ষার জায়গাগুলোকে দেশের অর্থনীতির শক্তিশালী দিক। পাশাপাশি রাজস্ব আদায় ও এডিপি বাস্তবায়নে দুর্বলতা, কৃষকের প্রণোদনামূলক দাম না পাওয়া, বৈদেশিক আয়-ব্যয়ে চাপ ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিকে তিনি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ এখনও স্থবির হয়ে রয়েছে। কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধির হার এবং গরিবের আয় বৃদ্ধির হার দুর্বল। উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদের গুণগত মান দুর্বল। এ কারণ বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাজেটে ব্যক্তিখাতে করমুক্ত আয়ের সীমা অপরিবর্তিত রাখায় হতাশা প্রকাশ করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, আনুতোষিক ব্যয়ে ৭৫ লাখ টাকা সুবিধা দেয়া হয়েছে। সেটা উচ্চবিত্তের মানুষরা পাবেন। এটা আমাদের কাছে বৈষম্যপূর্ণ মনে হয়েছে। যখন নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তকে সুবিধা দিলাম না, কিন্তু উচ্চবিত্তকে আনুতোষিক ব্যয়ে সুবিধা দিচ্ছি, এটা অর্থনীতির সাম্যনীতিতে ঠিক হল না।
উল্লেখ্য, অর্থমন্ত্রী এবারের বাজেটে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করপোরেট ট্যাক্স বিদ্যমান ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রস্তাব করেছেন। আর অনিবন্ধিত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করপোরেট ট্যাক্স বিদ্যমান ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন।
এই করপোরেট ট্যাক্সের বিরোধিতা করে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো বলেন, ব্যাংক খাতে যে ধরনের নৈরাজ্য চলছে, সেটা সমাধান না করে এ ধরনের সুবিধা দেয়া আগে যেভাবে পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়েছে, সেটাকে ধরে রাখা হয়েছে। এর ফলে তারল্য বাড়বে না বলেই আমাদের সন্দেহ। কারণ এই সুবিধাগুলো সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে না। তিনি বলেন, নীতিগতভাবে কালো টাকা সাদা করার সুবিধা দেয়ার বিরোধিতা করি। কারণ এর ফলে কালো টাকা মূলধারায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। আবার ছোট ছোট ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে চাপ কমছে বলে মনে হচ্ছে না। ই-কর্মাস ও আইটি সেবার উপর ৫ শতাংশ ভ্যাট, বিকাশমান খাতটির উপর চাপ সৃষ্টি করবে। উবার ও পাঠাওয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর ভ্যাট শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের উপরে চলে যায় কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
শিক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার জন্য কতো বরাদ্দ পাওয়া গেছে তা নির্ধারণ করা কষ্টসাধ্য। শিক্ষা ক্ষেত্রে বরাদ্দের পতন ঘটছে। দীর্ঘদিন ধরে এটি জিডিপির ২ শতাংশে আটকে আছে। স্বাস্থ্যখাতের অবস্থাও আরো করুন। এ খাতে জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ বরাদ্দ। বাজেটে বরাদ্দ বাড়ছে, প্রকৃত ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোন স্বচ্ছতা দেখছি না। জবাবদিহিতার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা আসেনি। জাতীয় সংসদেও জবাবদিহিতা আসেনি।
বিশ্লেষনে তিনি বলেন, উন্নয়ন কর্মসূচিতে পাঁচটি খাতে ৭০ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বাড়তি ব্যয় হচ্ছে জনপ্রশাসন ও সুদ পরিশোধ খাতে। এবার প্রত্যক্ষ কর ২৯ শতাংশ আর পরোক্ষ কর বা মূসক ৩৫ শতাংশ। মূল্যায়ন ছাড়া হঠাৎ করে করপোরেট কর কমানো ঠিক হয়নি। করপোরেট ট্যাক্স কমানোর ফরে বিনিয়োগ বাড়বে এটা মনে করি না। এডিপিতে ৬৪টি প্রকল্পের পেছনে এক লাখ টাকা করে বরাদ্দ দিয়ে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। আর এক কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এমন প্রকল্পের সংখ্যা ৯০টি। ২০ শতাংশ প্রকল্প সর্বোচ্চ ৪ বার সংশোধন করা হয়েছে। পদ্মাসেতুতে ব্যয় আরো বাড়বে।
এক প্রশ্নের জবাবে ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাজেটকে নির্বাচনী বলে আপনরা নেতিবাচক অনুরণন দেন। আমি এটাকে নেতিবাচক হিসেবে দেখি না। আর নির্বাচনী প্রতিশ্রতি কখনও একবছরে বাস্তবায়ন করা যায় না। তবে নির্বাচনের প্রাক্কালে দ্রুত অর্থ ছাড় করার প্রবণতা থাকে।


আরো সংবাদ