১৭ নভেম্বর ২০১৮

প্রতিশ্রুতির দেড় মাসেও সুদহার কমেনি

প্রতিশ্রুতির দেড় মাসেও সুদহার কমেনি - সংগৃহীত

ঋণের সুদহার কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে নজিরবিহীনভাবে চারটি বড় সুবিধা আদায় করে নিয়েছিলেন ব্যাংকের পরিচালকেরা। আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের বাধ্যতামূলক নগদ জমার হার (সিআরআর) ১ শতাংশ কমিয়ে নেয়া হয়। এতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বের করে নেন উদ্যোক্তারা। একই সাথে রেপোর হার (সঙ্কট মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ধারের হার) পৌনে ১ শতাংশ কমিয়ে পৌনে ৭ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। পাশাপাশি বিনিয়োগসীমা কমিয়ে আনার সময়সীমা প্রায় এক বছর বাড়িয়ে নেয়া হয়। বিপরীতে ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে অর্থাৎ এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন পরিচালকেরা। একই সাথে বেসরকারি ব্যাংকগুলো সরকারি আমানতের ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে নেয়। কিন্তু প্রতিশ্রুতির প্রায় দেড় মাস অতিবাহিত হতে চললেও ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা হয়নি; বরং ক্ষেত্র বিশেষ ঋণের সুদহার বেড়ে ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত করা হয়েছে। এমনি পরিস্থিতিতে ব্যাংকারররা আজ প্রধানমন্ত্রীর ইফতার মাহফিলে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আজ প্রধানমন্ত্রীর কাছে ব্যাংকাররা কী জবাব দেবেন তাই দেখার বিষয়।

নানা কৌশলে বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকেরা একে একে তাদের দাবি আদায় করে নিচ্ছেন। কিন্তু এর বিপরীতে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা বাস্তবায়ন করছে না। উপরন্তু ঋণের সুদহার গত দুই মাসে প্রতিটি ব্যাংকই ২ থেকে ৩২ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। মাসুম শেখ নামক এক গ্রাহক জানান, তিনি ২৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন একটি ইসলামী ব্যাংক থেকে। মাসে ২৯ হাজার ৪০০ টাকা কিস্তি দিতেন। হঠাৎ করে কিস্তি বেড়ে ৩২ হাজার টাকা হয়েছে। শাখা ব্যবস্থাপকের কাছে কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, দেড় শতাংশ হারে সুদ (ইসলামী ব্যাংকিং ভাষায় রেন্ট) বেড়ে হয়েছে সাড়ে ১৩ শতাংশ, যা ঋণ মঞ্জুরের সময় ছিল সাড়ে ১১ শতাংশ। এ কারণে কিস্তির পরিমাণও বেড়ে গেছে। ওই গ্রাহক ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ছোট ছোট গ্রাহকেরা ব্যাংক থেকে অল্প টাকা ঋণ নিয়ে তা যথাযথভাবে পরিশোধ করেন। অথচ তাদের ঘাড়েই অতিরিক্ত বোঝা চাপানো হয়। কিন্তু যারা শত শত কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত দেন না তাদের হয় সুদ মওকুফ করে দেয়া হয়, না হয় ঋণ পুনর্গঠনের নামে বিশেষ ছাড় দেয়া হয়। খেলাপি ঋণ আদায় করা হলে ব্যাংকের ঋণের সুদ অনেক কম হতো।
হঠাৎ করে ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ফয়সাল আহমেদ নামক একজন নাগরিক জানিয়েছেন, বাজারে সব ধরনের জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী তাদের বেতনভাতা বাড়েনি। মূল্যস্ফীতির হিসেবে আনলে তাদের প্রকৃত আয় নেগেটিভ হয়ে গেছে। অর্থাৎ তারা এখন ঋণে আছেন। ফলে তাদের ব্যয় কমিয়ে নির্ধারিত আয় দিয়ে সমন্বয়ের চেষ্টা করছেন। এ পরিস্থিতিতে ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় সব ধরণের পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে আবার বাড়বে পণ্যের দাম। এতে তাদের ভোগান্তি আরো বেড়ে যাবে।

দেশের প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, আগে ঋণের সুদহার কম থাকার অন্যতম কারণ ছিল আমানতের সুদহার কম ছিল। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে ব্যাংকিং খাতে তীব্র তারল্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি যেসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছে বিশেষ করে বড় ঋণগ্রহীতারা টাকা ফেরত দিচ্ছেন না। ফলে ব্যাংকের তহবিল ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, পাশাপাশি বেড়ে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়; ঋণের কিস্তি আদায় না হওয়ায় ব্যাংকের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। এ দিকে নগদ টাকার প্রবাহ কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো তীব্র তারল্য সঙ্কটে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ ব্যাংক আমানত প্রবাহ বাড়াতে মনোযোগ দিয়েছে এবং আমানত বাড়াতে সুদের হার বাড়ানো হচ্ছে। সেই সাথে ঋণের সুদহারও বাড়ানো হচ্ছে। ব্যাংকের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই বলে ওই এমডি জানিয়েছেন।

অপর একটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতকে তলানিতে নামিয়ে দিচ্ছে। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে অবলোপনসহ খেলাপি ঋণ রয়েছে সোয়া লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেশির ভাগ ঋণই কুঋণ বা আদায় অযোগ্য ঋণ। ফলে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। বলা চলে ব্যাংকগুলো টিকেই আছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি গ্রাহকের ওপর ভর করে। কেবল এ মানের গ্রাহকেরাই ঋণ পরিশোধ করছেন। বড় গ্রাহকেরা রাজনৈতিক আশীর্বাদ নিয়ে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছেন না বছরের পর বছর। এটা এখন ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় কাল হয়ে দেখা দিয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১ এপ্রিল ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি নেতৃবৃন্দ হোটেল সোনারগাঁওয়ে অর্থমন্ত্রী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে নজিরবিহীনভাবে সিআরআর হার এক শতাংশ কমিয়ে নেন পরিচালকেরা। এর আগে সরকারি তহবিলের ২৫ ভাগ পেত বেসরকারি ব্যাংক। বাকি ৭৫ ভাগ তহবিল পেত সরকারি ব্যাংক; কিন্তু অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে সরকারি তহবিলের ৫০ ভাগ বেসরকারি ব্যাংকগুলো বাগিয়ে নেয়। এর পর থেকে সরকারি তহবিলের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ৫০ ভাগ এবং বাকি ৫০ ভাগ পাচ্ছে বেসরকারি ব্যাংক। একই সাথে ব্যাংকগুলো সঙ্কটে পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ ধার নেয়, যা ব্যাংকিং ভাষায় রেপো বলে। রেপোর সুদহার ছিল পৌনে সাত শত্ংাশ। ব্যাংক পরিচালকেরা এ রেপোর হারও পৌনে এক শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনে। এসব সুবিধা নেয়ার সময় বলা হয়েছিল ঋণের সুদহার ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা হবে; কিন্তু বাস্তবে ঋণের সুদহার না কমিয়ে বরং বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অনেক ব্যাংক গ্রাহকের বড় অঙ্কের টাকা দিতে পারছে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে ব্যাংকের টাকা যাচ্ছে কোথায়?


আরো সংবাদ