২১ নভেম্বর ২০১৮

নাসার চোখে পদ্মার ভাঙ্গন (ভিডিও)

নাসার চোখে পদ্মার ভাঙ্গন। ছবি - সংগৃহীত

পদ্মা বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম। গত ৩০ বছরে স্যাটেলাইটে প্রাপ্ত ছবি থেকে দেখা যায় এই নদীর আকৃতি, অবস্থান ও ধরণ অনেকটা পাল্টে গেছে। ভারত থেকে গঙ্গা নাম নিয়ে বাংলাদেশের যমুনা নদীর সাথে মিলিত হয়ে পদ্মা নদী মেঘনার সাথে মিলিত হয়েছে। আর সেখান থেকে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নেয়া বিভিন্ন সময়ের নেয়া ছবি থেকে দেখা যায় পদ্মা নদীর গতিপথ কিভাবে বদলে গেছে।

 

পদ্মার নদীর উপর নির্ভর করে হাজার হাজার মানুষ তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে। এই নদীর ১৩০ কিলোমিটার এলাকার তীরবর্তী জনপদের মানুষেরা এর সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। গত কয়েক দশক ধরে পদ্মার অব্যহত ভাঙ্গনের ফলে অগণিত ফসলি জমি, বাড়ি-ঘর, বিভিন্ন স্থাপনাসহ বহু জীবনহানি হয়েছে। এই ভাঙ্গনের ফলে প্রতি বছর কয়েক হাজার হেক্টর জমি পদ্মার ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

১৯৬৭ সাল থেকে ৬৬ হাজার হেক্টর বা ২৫৬ বর্গ মাইল এলাকা পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। যা আয়তনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের সমান হবে।

নাসার প্রতিবেদনে ভাঙনের জন্য দুটি প্রধান কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এক, পদ্মা প্রাকৃতিকভাবে নিজের মতো চলতে পারা একটি নদী, যার তীর বাঁধার তেমন চেষ্টা করা হয়নি। শুধু মাঝেমধ্যে বালুর বস্তা ফেলে ঘর-বাড়ি রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে। দুই, পদ্মার তীর এলাকায় বালুর পরিমাণ বেশি হওয়ায় তা সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পেরেছে।

স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে নাসার পর্যবেক্ষকরা পদ্মা সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করেছেন। নাসার ল্যান্ডস্যাট কর্মসূচির আওতায় থাকা বিভিন্ন স্যাটেলাইট থেকে বছরের পর বছরের পদ্মার ছবি তোলা হয়েছে। এরপর ইউটিউবে আপলোড করা এক ভিডিওতে ১৯৮৮ সালের পর থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পদ্মার বিভিন্ন ছবি দেখানো হয়েছে।

ছবি বিশ্লেষণ করে নাসার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, গত তিন দশকে পদ্মা একটি সরু ও সোজাসুজি চলা নদী থেকে সর্পিল আকৃতি ধারণ করে অতি সম্প্রতি আবার সোজা চলা নদীতে পরিণত হয়েছে।

প্রতিবেদনটি জানাচ্ছে, ১৯৯২ সালে পদ্মা প্রথম বাঁক নেয়া শুরু করেছিল। এরপর ২০০২ সাল থেকে সেটি কমতে শুরু করে। আর এখন সেটি থেমে গেছে।

চলার পথে বাঁক নেয়ার সময় পদ্মা তার আশেপাশের জমি, ঘরবাড়ি সব ভেঙে নিয়ে গেছে। ফলে ঐসময় নদী ভাঙনের ঘটনা বেশি ঘটেছে। আর এখন পদ্মা আবার সোজা চলা নদী হয়ে যাওয়ায় ভাঙনের হার একটু কমেছে বলে মনে করছেন নাসার পর্যবেক্ষকরা।

আরো দেখুন : পদ্মার ভাঙ্গনে ধনী-গরিব সবাই এখন একই কাতারে

অব্যাহত পদ্মার ভাঙ্গনে প্রতিদিনই গিলে খাচ্ছে নড়িয়া এলাকার সরকারী বে-সরকারি ভবন মূলফৎগঞ্জ বাজারের বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানসহ বহু লোকের সাজানো গোছানো ঘরবাড়ি। সোমবার রাতে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নতুন ভবনটির অধিকাংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। হাসপাতাল ক্যাম্পাসের একটি আবাসিক ভবনে জরুরি বিভাগ ও বহিঃ বিভাগ চালু রাখা হলেও হাসপাতালে প্রবেশের সড়কটি বিলীন হয়ে যাওয়ায় ভয়ে কোনো রোগী চিকিৎসা নিতে আসছে না। ফলে এ উপজেলার ৩ লক্ষাধিক লোকের স্বাস্থ্য সেবা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে এই উপজেলার চরাঞ্চলের ৫টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক পরিবারের নারী ও শিশু রোগীদের ক্ষেত্রে বেশি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে চিকিৎসা ক্ষেত্রে।

স্থানীয় লোকজন সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে দ্রুত সময়ের মধ্যে অন্যত্র হাসপাতালের কার্যক্রম চালু করার দাবি জানিয়েছে। এদিকে হুমকির মুখে পড়েছে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরো ১১টি ভবন। এ ছাড়াও গত ৩ দিনে মূলফৎগঞ্জ বাজার ও আশপাশের এলাকার অর্ধশতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অন্তত ৪০টি বাড়িঘর পদ্মাগর্ভে চলে গেছে। এর আগে মুলফৎগঞ্জ বাজারের ২ শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সীমানা প্রাচীর, মসজিদ, গ্যারেজ ও পাশ্ববর্তী রাম ঠাকুর সেবা মন্দির বিলীন হয়ে গেছে।


সরকারি হিসাব অনুযায়ী গত তিন মাসে নড়িয়া উপজেলার অন্তত সাড়ে ৪ হাজারের বেশি মানুষের ফসলি জমি, বাপ-দাদার কবর, বাড়িঘর ও বহুতল ভবনসহ অনেক স্থাপনা কেড়ে নিয়েছে পদ্মা। এসব ক্ষতিগ্রস্তের মধ্যে অনেকেই খোলা আকাশের নিচে, আবার কেউ রাস্তার পাশে বা অন্যের জমিতে খুপরি ঘর তোলে ধনি, গরিব ও মধ্যবিত্তরা একই কাতারে দাঁড়িয়েছেন। সীমাহীন কষ্টে আর চোখের পানিতে দিন কাটছে রাক্ষুসী পদ্মার ভাঙ্গনে সর্বহারা হাজার হাজার মানুষের।

নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্থানীয় সূত্রে জানাগেছে, ১৯৬৮ সালে নড়িয়া উপজেলা সদরের চার কিলোমিটার দুরত্বে মুলফৎগঞ্জ বাজার সংলগ্ন পূর্ব পার্শ্বে ৩০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। ২০১৪ সালে ওই হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। হাসাপাতাল ক্যাম্পাসে জরুরী বিভাগ, বহিঃ বিভাগ ও আবাসিক ভবনসহ ১২টি পাকা ভবন রয়েছে। গত রোববার সকাল থেকে উপজেলার প্রায় ৩ লক্ষ মানুষের স্বাস্থ্য সেবার একমাত্র ৫০ শয্যার হাসপাতালটি গ্রাস করে সর্বনাশা পদ্মা। সোমবার রাত সাড়ে সাতটার দিকে নতুন ভবনটির ৭৫ ভাগ বিলীন হয়ে যায়। এই হাসপাতালটিতে গত কয়েক দিন আগেও প্রতিদিন শত শত নারী পুরুষ ও শিশু চিকিৎসা নিতে আসত। আগস্ট মাসের শেষের দিকে নড়িয়া সুরেশ্বর সড়কটি পদ্মায় বিলীন হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে রোগী কমতে থাকে। এক সপ্তাহ যাবত হাসপাতালে প্রবেশপথটিও পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়। এর পর হাসপাতালের পিছন দিক দিয়ে একটি সরু পথে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হলেও ভাঙ্গন আতঙ্কে কোনো রোগী চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে না। 
স্থানীয়রা আরো জানায়, যেভাবে পদ্মা হাসপাতালের সীমান প্রাচীর, এর পর নতুন ভবন গ্রাস করে এখন ভিতরের দিকে ঢুকছে। এ ভাবে ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ধীরে ধীরে সবকটি ভবন পদ্মায় গিলে খাবে। হাসপাতালটি নদীগর্ভে চলে গেলে নড়িয়ার ৩ লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। 

সরে জমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের নতুন ভবনটি দ্বিখন্ডিত হয়ে অধিকাংশ পদ্মা পড়ে গেছে। পার্শ্বের ভবনগুলো নদীর তীরে রয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা থাকলেও কোনো রোগী দেখা যায়নি। হাসপাতালের সামনে দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে বালু ভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। ভাঙ্গন কবলিত ক্ষতিগ্রস্তরা বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছে। বাজারের পাকা দোকানগুলো নিজেদের উদ্যোগে ভেঙ্গে ইট ও রড সড়িয়ে নিচ্ছে।

কেদারপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়াম্যান ক্ষতিগ্রস্ত ঈমাম হোসেন দেওয়ান বলেন, আমরা খুবই অসহায়। আমাদের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। হাসপাতালটি ভাঙ্গনের মুখে পড়ায় এ উপজেলার লোকজনের চিকিৎসা সেবা অনিশ্চি হয়ে পড়েছে। আমরা সরকারের কাছে দ্রুত সময়ের মধ্যে নিরাপদ দূরত্বে হামপাতালের কার্যক্রম চালু রাখার দাবি জানাচ্ছি। 
নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মুনীর আহমেদ বলেন, সোমবার রাতে হাসপাতালের নতুন ভবনটির অধিকাংশ পদ্মা চলে গেছে। আমরা ভবনটি নিলামে বিক্রির জন্য মাইকিং করলেও কোনো লোক আসেনি ক্রয়ের জন্য। হাসপাতালের আরো ১১টি ভবন ঝুঁকিতে রয়েছে। সীমিত পরিসরে জরুরি ও বহিঃ বিভাগের কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। তবে এখনো হাসপাতারের কার্যক্রম অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি।

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা ইয়াছমিন বলেন, ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকায় হাসপাতালের কার্যক্রম সীমিত পরিসরে চালু রাখা হয়েছে। হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। নদীর পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

 


আরো সংবাদ