২৪ আগস্ট ২০১৯
নারীর লাশ নিয়ে গেছে পুরুষ লাশের স্বজনরা

চুড়িহাট্টায় লাশ অদল-বদল

নারীর লাশ নিয়ে গেছে পুরুষ লাশের স্বজনরা - সংগৃহীত

চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের প্রায় দুই মাস পর স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তরের ত্রুটি নিয়ে বেরিয়ে এসেছে পিলে চমকানো তথ্য। অনুসদ্ধানে দেখা গেছে, অগ্নিকাণ্ডের পর নিহত এক নারীর লাশ নিয়ে গেছে পুরুষ লাশের স্বজনরা। এক শিশুর লাশ নিয়ে গেছে অন্য লাশের আত্মীয়। 

স্বজনদের কাছে আগুনে পোড়া লাশ হস্তান্তরের এসব ত্রুটি ধরা পড়ার পর পুলিশ প্রশাসন, সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ আর প্রিয়জনহারা স্বজনদের মধ্যেও আরেক ধরনের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা যতটা না বেদনার ছিল, তার চেয়ে আরো বেশি আতঙ্কের আর লোমহর্ষক তথ্য বের হয়ে এসেছে নয়া দিগন্তের অনুসন্ধানে। 
‘কার লাশ কে নিয়েছে’? এই অভিযোগ নিয়ে স্বজনরা এখনো থানায় মর্গে আর মালিবাগের পুলিশের (সিআইডি) ফরেনসিক বিভাগে নিয়মিত দৌড়ঝাঁপ করছেন। নয়া দিগন্তের পক্ষ থেকে গত কয়েক দিনের অনুসন্ধানে এ বিষয়ে বের হয়ে এসেছে চমকে উঠার মতো আরো অনেক নতুন তথ্য।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আগুনে পুড়ে নিহত এক নারীর লাশ গ্রহণ করেছেন পুরুষ লাশের স্বজনরা। বাবার লাশ মনে করেই এই নারীকে নোয়াখালির সোনাইমুড়ির মির্জানগরে দাফন করেছেন নিহত জাফর আহাম্মদের সন্তানরা। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢামেক’র মর্গ থেকে এই লাশটি গ্রহণ করেন নিহত জাফর আহম্মদের ছেলে রাকিব হোসেন রাজু। একইভাবে ছোট্ট শিশু আত-তাহীর লাশও নিয়ে গেছেন অন্য এক নিহত ব্যক্তির আত্মীয়। 

এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের লাশ হস্তান্তরের তালিকায় দেখা গেছে, গত ২০ ফেব্রুয়ারি চুড়িহাট্টার আগুনের ঘটনার পরে ২১ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই বেশির ভাগ লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের পরে সেগুলো চলে গেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়, ধর্মীয় বিধানমতে দাফন প্রক্রিয়াও শেষ হয়েছে। কিন্তু ঘটনার প্রায় দুই মাস পর লাশ হস্তান্তরের সেই প্রক্রিয়া যে সঠিক ছিল না তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। 
অনুসদ্ধানে দেখা গেছে, চুড়িহাট্টায় ২০ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় আগুনে পুড়ে নিহত হয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী জহিরুল হক সুমনের স্ত্রী, দুই কন্যা সন্তানের মা বিবি হালিমা ওরফে শিল্পী। ঘটনার পর থেকে চকবাজার থানা, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গ আর মগবাজারের বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির অফিসে দিনের পর দিন লাশের সন্ধানে খুঁজে বেড়িয়েছেন স্বামী সুমন। কিন্তু কোথাও তিনি স্ত্রীর লাশ পাননি। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তাদের ফরেনসিক রিপোর্টে যে তথ্য দিয়েছে তাতে পুরো আকাশ যেন সুমনের মাথার ওপর ভেঙে পড়েছে। 

সিআইডির ফরেনসিক রিপোর্টে দেখা গেছে, ২৩ ফেব্রুয়ারি নিহত মো: জাফর আহম্মদ নামে যে লাশ (লাশ ব্যাগ নং- ৬১) স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল সেই লাশটি ছিল আসলে বিবি হালিমা ওরফে শিল্পীর লাশ। অর্থাৎ শিল্পীর (মহিলা) লাশ মো: জাফর আহম্মদ (পুরুষ) হিসেবে হস্তান্তর করা হয়ে গেছে। যদিও ঘটনার পরের দিন স্ত্রীর লাশের সন্ধান চেয়ে চকবাজার থানায় জিডিও করেছিলেন সুমন। জিডি নং ৯৯৪ তারিখ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯। ২৩ ফেব্রুয়ারি নিহত জাফর আহম্মদের লাশ গ্রহণকারী তার ছেলে রাকিব হোসেন রাজুর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে (চকবাজার থানায় পুলিশের তালিকায় যে মোবাইল নাম্বার উল্লেখ করা আছে) তার মোবাইল নম্বরটি অব্যবহৃত জানানো হয়।
চুড়িহাট্টার আগুনের ঘটনায় লাশ হস্তান্তরের এই ত্রুটির বিষয়ে জানতে এবং এভাবে আরো কয়েকটি লাশ অদল-বদলের তথ্য নিয়ে মালিবাগস্থ সিআইডি অফিসের ফরেনসিক ল্যাবলেটরিতে গিয়েও এর সত্যতা মিলেছে। চুড়িহাট্টার ঘটনার পর নিহত ব্যক্তি ও স্বজনদের ডিএনএ নমুনা নিয়ে শুরু থেকে কাজ করেছেন সিআইডির সাব ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার ডিএনএ ল্যাব সহকারী (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) নয়া দিগন্তকে জানান, আমরা শুরু থেকে যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম শেষ পর্যন্ত তা-ই সত্যি হলো। স্বজনদের বেশি তাড়াহুড়া আর জেলা প্রশাসকের নির্দেশ মতো লাশগুলো হন্তান্তর করা হয়েছে। এ কারণে কিছু লাশের ক্ষেত্রে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। শিশুসহ কয়েকটি লাশ অদল-বদল হয়েছে।

তিনি আরো জানান, এখন জেলা প্রশাসক ইচ্ছা করলে স্বজনদের পক্ষ থেকে অভিযোগ আসা লাশগুলোর আবার ডিএনএ টেস্ট করার ব্যবস্থা করতে পারেন। এই কর্মকর্তা আরো জানান, নিহত শিল্পীর লাশ পুরুষ লাশ হিসেবে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ির মির্জানগরে দাফন হয়েছে। শিল্পীর স্বামী আমাদের সাথে যোগাযোগও করেছেন। কিন্তু আমাদের তো এখন আর কিছুই করার নেই। বিষয়টি এখন মানবিক। কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে পুনরায় হস্তান্তর করার বিষয়টি আদালত কিংবা জেলা প্রশাসকের এখতিয়ারের মধ্যে। 

ওই দিন চুড়িহাট্টায় আগুনে পুড়ে মারা যান চকবাজারের স্থানীয় বাসিন্দা জাকির হোসেন সুমনের মামা সালেহ আহমেদ (লাশ ব্যাগ নং- ১০) এবং মামী নাসরিন জাহান (লাশ ব্যাগ নং- ৩০)। তাদের সাথে ছিল পাঁচ বছরের শিশুসন্তান আত-তাহী। তাহীর লাশও খুঁজে পাননি জাকির হোসেন সুমন। তিনি জানান, তাহীর লাশ আমরা পাইনি। ধারণা করছি তাহীর লাশও হয়তো অন্য কেউ নিয়ে গেছে। থানায় জিডি করতে চেয়েছিলাম। পুলিশ বলেছে, জিডি করার দরকার নেই। আমরা এখনো লাশের খোঁজ পাওয়ার চেষ্টা করছি। 

এদিকে চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের পর আত্মীয়দের কাছে লাশ হস্তান্তরের তিনটি আলাদা তালিকা তৈরি করে পৃথক তিনটি সংস্থা। ঢাকা জেলা প্রশাসন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের চকবাজার থানা এবং রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি এই তালিকা তিনটি প্রস্তুত করেছে। তিনটি তালিকাতেই দেখা গেছে বেশ কয়েকটি লাশের খোঁজ এখনো মিলছে না। যদিও চকবাজার থানায় গিয়ে তাদের তালিকা অনুযায়ী তিনটি লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে রয়েছে এমন তথ্য মিলেছে। তবে থানা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) মুহাম্মদ মোরাদুল ইসলাম জানিয়েছেন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) পরবর্তীতে দুটি লাশের ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে আত্মীয়দের কাছে হস্তান্তর করেছে। 

লাশ অদল-বদলের বিষয়ে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিতে গিয়েও মিলেছে একই তথ্য। তারাও বলছেন, আমাদের অদক্ষতার কারণেই কিছু লাশ অদল-বদল হয়েছে। অনেকে লাশ পাননি। তারা নিয়মিত লাশের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। কিছু লাশ হয়তো অন্যদের সাথে অদল-বদল হয়েছে। আর কিছু লাশ পুড়ে কয়লা হয়েছে। সে কারণেই কিছু লাশের খোঁজ এখনো মিলছে না। 

মগবাজারস্থ বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রোগ্রাম অফিসার সৈয়দা আবিদা ফারহীন নয়া দিগন্তকে জানান, আমরা যেসব উদ্ধারকর্মী দুর্ঘটনাস্থলে পাঠাই তাদের একটি প্রশিক্ষণ থাকে। বিশেষ করে বড় অগ্নিকাণ্ডের পর লাশ শনাক্তকরণের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। চুড়িহাট্টায় যে কাজটি হয়েছে সেখানে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ছাড়া আর কারো কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না। লাশ শনাক্তের বিষয়ে তো একেবারেই নয়। তাই এই বিপত্তিটি ঘটেছে। আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া কিছু লাশ চিহ্নিত করারই কোনো উপায় ছিল না। সে কারণেই হস্তান্তরের সময়ে কিছু লাশ অদল-বদল হওয়ার আশঙ্কা তো থাকেই। 

এদিকে চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের পর লাশ হস্তান্তরের বিষয়ে চকবাজার থানা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, প্রথম দিনে অর্থাৎ ঘটনার পরের দিন ২১ ফেব্রুয়ারি ৪৫টি লাশ, ২২ ফেব্রুয়ারি একটি লাশ, ২৩ ফেব্রুয়ারি দুটি লাশ হস্তান্তর করা হয়। এরপরে পর্যায়ক্রমে ২৬ ফেব্রুয়ারি ২টি, পয়লা মার্চ একটি, ২ মার্চ একটি, ৬ মার্চ ৮টি, ৭ মার্চ ৩টি, ১২ মার্চ ৪টি পোড়া লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। চকবাজার থানা পুলিশের তালিকায় দেখা গেছে, লাশ ব্যাগ নং- ২৪, ৫২ এবং ৫৪ এই তিনটি লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে রাখার কথা বলা হয়েছে। পরে অবশ্য চকবাজার থানা থেকে জানানো হয়েছে এই লাশ তিনটিও সিআইডি কর্র্তৃক ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অর্থাৎ পুলিশের রিপোর্টে ঘটনার পরে ১২ মার্চ পর্যন্ত ৯ দফায় মোট ৬৭টি লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।


আরো সংবাদ

ভারতের হামলার মুখে কতটুকু প্রস্তুত পাকিস্তান? (২৭৭২২)জামালপুরের ডিসির নারী কেলেঙ্কারির ভিডিও ভাইরাল, ডিসির অস্বীকার (২৭৪২৮)কিশোরীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে মুখ খুললেন নোবেল (১৯৩২৬)‘কাশ্মিরি গাজা’য় নজিরবিহীন প্রতিরোধ (১৯০১৯)ভারত কেন আগে পরমাণু হামলা চালাতে চায়? (১৮৭০০)সেনাবাহিনীর গাড়িতে গুলি, পাল্টা গুলিতে সন্ত্রাসী নিহত (১৮৩৫৪)কাশ্মির সীমান্তে পাক বাহিনীর গুলিতে ভারতীয় সেনা নিহত (১৩৭৫২)দাম্পত্য জীবনে কোনো কলহ না হওয়ায় স্বামীকে তালাক দিতে চান স্ত্রী (১২৫৫৯)প্রিয়াঙ্কাকে সরাতে পাকিস্তানের চিঠির জবাব দিয়েছে জাতিসংঘ (৮৩৮৪)রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে যে বার্তা দিল চীন (৭৭২৬)



mp3 indir bedava internet