২০ আগস্ট ২০১৯

ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে সরকার

ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে সরকার - সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে নির্বাচন পরবর্তী ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করতে আগামীকাল ওয়াশিংটন যাচ্ছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেন ভারতের সাথে সার্বিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে যাচ্ছেন দিল্লি। এছাড়া মিউনিখে অনুষ্ঠেয় নিরাপত্তা শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সাথে মতবিনিময় করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মধ্য ফেব্রুয়ারিতে জার্মানি যাচ্ছেন।

ওয়াশিংটন সফরকালে পররাষ্ট্র সচিব হোয়াইট হাউস, স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও পেন্টাগন কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করবেন। এ সব বৈঠকে বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, জ্বালানি, সন্ত্রাসবাদ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, শ্রম অধিকার, রোহিঙ্গা সমস্যা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল নিয়ে আলোচনা হবে। এতে বাংলাদেশের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের প্রসঙ্গ আসতে হতে পারে। ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপসহকারী লিসা কার্টিস ও মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের রাজনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ডেভিল হিলের সাথে পররাষ্ট্র সচিবের বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগ জানানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে কাজ করার আগ্রহের কথা জানিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার সুযোগটি কাজে লাগানোর ওপর জোর দেবেন পররাষ্ট্র সচিব। নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতার নিয়মিত বৈঠকগুলো আবারো শুরু করার উপায় নিয়ে আলোচনা হবে।

আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে দিল্লিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ পরামর্শক কমিশনের (জেসিসি) পঞ্চম বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে নতুন দায়িত্ব পাওয়া ড. আব্দুল মোমেন। ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকবেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ।

ভারতের সাথে জেসিসির আসন্ন বৈঠকে তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি সইয়ের ওপর সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দেবে বাংলাদেশ। এছাড়া বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, কানেক্টিভিটি, নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী এবং দুই দেশের জনগনের মধ্যে সম্পৃক্ততা আরো বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা হবে।

নির্বাচনের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথম সরকার প্রধান হিসাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করে শুভেচ্ছা জানান। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এক টুইটার বার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানান। ভারতের ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক রাম মাধব টেলিফোন করে আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

ভারত তার ভূমিবেষ্ঠিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর জন্য বাংলাদেশের কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে ট্রানজিট চেয়ে আসছে। তিস্তার পানি বন্টনে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য ট্রানজিটকে ট্রাম্প কার্ড হিসাবে হাতে রেখেছিল বাংলাদেশ। ভারত বারবার বাংলাদেশকে বোঝাতে চেষ্টা করছে দুই দেশের সম্পর্ক কেবলমাত্র একটি ইস্যুতে জিম্মি হয়ে থাকতে পারে না। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক এখন অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে বলে দাবি করে ভারত ও বাংলাদেশ। এর এ জন্য তিস্তা ইস্যুতে নমনীয় হয়ে বাংলাদেশকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যান্য দিক নিয়ে অগ্রসর হতে হচ্ছে। গত অক্টোবরে দিল্লিতে নৌ পরিবহন সচিব পর্যায়ে বৈঠকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারে ভারতের সাথে চূড়ান্ত চুক্তি সইয়ের পর এর বিধি-বিধান (এসওপি) প্রণয়নের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।

২০১৫ সালের জুনে নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকালে ভারতকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকসহ (এমওইউ) রেকর্ড সংখ্যক চুক্তি সই হয়। ২০১৭ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি সফরে যান। এ সময় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, ডিফেন্স লাইন অব ক্রেডিট এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মধ্যে এমওইউসহ ২২টি চুক্তি সই হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর মমতার উপস্থিতিতে মোদি ঘোষণা দেন, দুই দেশের বর্তমান সরকারের ক্ষমতার মেয়াদেই তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি হবে।

কিন্তু একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। ভারতের জাতীয় নির্বাচনও সামনে। কিন্তু তিস্তা চুক্তি হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তাই জেসিসি বৈঠকে ইস্যুটিকে সামনে নিয়ে আসবে বাংলাদেশ।

আগামী ১৫ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি মিউনিখে অনুষ্ঠেয় নিরাপত্তা শীর্ষ সম্মেলনে অন্তত: ২৫টি দেশের সরকারপ্রধান বা তাদের প্রতিনিধিরা যোগ দেবেন। এ সম্মেলনের সাইডলাইনে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাতাহ আল-সিসি, অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর সেবাস্টিয়ান ক্রুজ, নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী এমা সোলবার্গ, ইইউর জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি ফেদরিকা মোঘেরিনি, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৌজন্য সাক্ষাতের প্রস্তুতি চলছে। নির্বাচনের পর ক্ষমতায় ফিরে এসে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে এ সম্মেলনকে কাজে লাগানো হবে। শীর্ষ সম্মেলনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিষয়ক এক কর্মঅধিবেশনে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষণ দিতে পারেন।

গত বৃহষ্পতিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশী কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের ব্রিফ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। নতুন সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কূটনীতিকদের সহযোগিতা চেয়েছেন ড. মোমেন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন কূটনীতিকরা।


আরো সংবাদ

bedava internet