২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ঢাকার প্রত্যাবাসন পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছে মিয়ানমার

ঢাকার প্রত্যাবাসন পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছে মিয়ানমার - এএফপি

রোহিঙ্গাদের শিগগির ফেরত পাঠানোর বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে মিয়ানমার। শনিবার মিয়ানমারের রাজধানী নেইপিডোতে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র জাও তাই রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর মন্তব্যকে স্বাগত জানান। মুখপাত্র বলেন, প্রত্যাবাসন শুরুর ব্যাপারে আমরা সব সময় আশাবাদী ছিলাম। প্রত্যাবাসন একবার শুরু হলে আশা করি বাকী প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে। বাংলাদেশের কাছ থেকে সহযোগিতা পেলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।

ঢাকায় জাতীয় প্রতিরক্ষা কলেজে (এনডিসি) রোহিঙ্গা সঙ্কটের ওপর গত বুধবার আয়োজিত এক সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী বলেন, প্রথম ব্যাচের প্রত্যাবাসন শুরুর চিন্তা-ভাবনা করছি। তবে এই মুহুর্তে প্রত্যাবাসন শুরুর সময় নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব না। মিয়ানমার যাচাই-বাছাই শেষে তিন হাজারের বেশী রোহিঙ্গার তালিকা বাংলাদেশকে দিয়েছে।

নেইপিডোতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাম্প্রতিক রুলিংয়ের ব্যাপারে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেবেন না বলে মুখপাত্র সাফ জানিয়ে দেন।

গত বৃহষ্পতিবার আইসিসির এক রুলিংয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত এবং বিচারের পথ খুলেছে। রুলিংয়ে আইসিসির প্রি-ট্রায়াল চেম্বার-১ বলেছেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বহিষ্কার করে বাংলাদেশে পাঠানোসহ অন্যান্য অভিযোগ আইসিসি তদন্ত করতে পারবে।

আইসিসি তার প্রসিকিউটরকে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে প্রাথমিক তদন্ত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর ফলে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ ছাড়াই রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো মানবতাবিরোধী অপরাধের ন্যায়বিচারের সুযোগ সৃষ্টি হলো। নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন ও রাশিয়া সরাসরি মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

মিয়ানমার আইসিসি সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়। এ কারণে দেশটির ওপর আইসিসির কোনো এখতিয়ার নেই বলে মিয়ানমার জানিয়েছে। এ ব্যাপারে আইসিসির চিঠি কোনো জবাবও মিয়ানমার দেয়নি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্রের মন্তব্য কতটা আস্থায় নেয়া যায় - প্রশ্ন করা হলে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যাশা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দ্রুততার সাথে শুরু করে তা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শেষ করা। বাংলাদেশ বারবার এ কথা বলছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে কিনা - তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মত বাংলাদেশও চায় টেকসই, নিরাপদ ও মর্যাদার সাথে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দ্রুত শুরুর ব্যাপারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে মিয়ানমার স্বাগত জানিয়েছে - এটা অবশ্যই ইতিবাচক। এখন রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের স্বাগত জানানোর মনোভাবের বাস্তব স্বাক্ষর রাখতে হবে। প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের আস্থায় নিতে এ ব্যাপারে দৃশ্যমান অগ্রগতি হতে হবে।

সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, মিয়ানমার কথাবার্তা ভালভাবেই বলে। আমরা যা বলি তা তারা ঠিকভাবে কাজে লাগায়। এখন রোহিঙ্গাদের যাওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করাটা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশও চায় মিয়ানমারের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে রোহিঙ্গা সঙ্কটের একটি টেকসই সমাধান।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে আইসিসির রুলিং মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে মন্তব্য করে হুমায়ুন কবির বলেন, এটা একটা বিচারিক প্রক্রিয়া। তবে এ প্রক্রিয়াটা দীর্ঘ। অন্যদিকে মিয়ানমার আইসিসির এখতিয়ারকে স্বীকার করছে না। এখন অস্বীকার করেও যদি মিয়ানমার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়, তা আমাদের জন্য ইতিবাচক হবে।

আন্তর্জাতিক চাপে গত ২৩ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের সাথে একটি চুক্তি সই করে মিয়ানমার। কিন্তু এর পর থেকেই বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এই চুক্তি বাস্তবায়নের পথ বন্ধ করে রেখেছে দেশটি। পাশাপাশি প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ার দায় বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে আসছে।

চুক্তি অনুযায়ী মিয়ানমার ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরের পরে আসা ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা এবং গত ২৫ আগস্টের পরে আসা সাত লাখ রোহিঙ্গাকে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য যোগ্য বিবেচনা করবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রেই মিয়ানমার মূল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে। প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং এ জন্য কোনো সময়সীমা নির্ধারিত নেই। মিয়ানমার শুধু একটি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল গত ৯ থেকে ১১ আগস্ট মিয়ানমার সফর করেছে। এ সময় প্রতিনিধি দলটি মিয়ানমারের একাধিক মন্ত্রীর সাথে বৈঠক এবং রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে দেশটির প্রস্তুতি পরিদর্শন করে। প্রতিনিধি দলে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক, শরণার্থী বিষয়ক কমিশনার আবুল কালামসহ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে গঠিত যৌথ কার্যকরী কমিটির (জেডাব্লিউজি) সদস্যরাও ছিলেন।

সম্প্রতি মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি গত মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরে এক অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া জনগণের পুনর্বাসনের জন্য রাখাইনে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে তাদের ফেরার ব্যাপারে সময় কাঠামো নির্ধারন করা কঠিন। ঢাকাকেই প্রক্রিয়াটি শুরু করার জন্য প্রথম উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা কেবল সীমান্তে তাদের স্বাগত জানাতে পারি।

রাখাইন সঙ্কট নিরসনে জাতিসঙ্ঘের সদ্য প্রয়াত মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই গত বছর ২৫ আগষ্ট মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নজীরবিহীন নৃশংসতা চালানো হয়। হত্যা, ধর্ষন, অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূল করার চেষ্টা চালানো হয়। নৃশংসতার হাত থেকে বাঁচতে এর পর সাত লাখের বেশী রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বিভিন্ন সময়ে নিপীড়নের হাত থেকে রেহাই পেতে আগে থেকেই বাংলাদেশে চার লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছিল।

লন্ডনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক বিশেষ অধিবেশনে ‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা : অব্যক্ত অভিজ্ঞতা’ বিষয়ক একটি গবেষণাগ্রস্থ উপস্থাপন করা হয়। এতে ২৫ আগস্টের পর রাখাইনে ২৪ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা ও ১৮ হাজার নারীকে ধর্ষনের তথ্যসহ ভয়াবহ সব নৃশংসতার তথ্য তুলে ধরা হয়।


আরো সংবাদ