১৯ নভেম্বর ২০১৮
লক্ষ্য ছিল জাতিগত নির্মূল

নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের বিভীষিকার দিন আজ

-

মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের জন্য বিভীষিকার দিন আজ। গত বছর এই দিনে উত্তর-পশ্চিম রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূলের লক্ষ্য সামনে রেখে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী ও বৌদ্ধ চরমপন্থীরা পরিকল্পিতভাবে নৃশংস বর্বরতা চালায়। হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে মিয়ানমার ছাড়তে বাধ্য করা হয় বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত রোহিঙ্গাদের। আদি নিবাস রাখাইন ছেড়ে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা।
বর্তমানে কক্সবাজারের কুতুপালং বিশ্বের সবচেয়ে বড় উদ্বাস্তু শিবিরে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আগে থেকেই চার লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছিলেন। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে চালানো নৃশংসতায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ লাখে। এই বিপুল উদ্বাস্তু আর কোনোদিন নিজ দেশে ফিরতে পারবেন কি নাÑ তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অন্য দিকে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণও দিন দিন কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সফর করে বিষয়টির প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানেরা।
এদিকে রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইনে বসবাসের অনুকূল পরিবেশ তৈরি জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপকে অব্যাহতভাবে উপেক্ষা করে যাচ্ছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। আন্তর্জাতিক চাপে গত ২৩ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের সাথে একটি চুক্তি সই করে মিয়ানমার। কিন্তু এর পর থেকেই বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এ চুক্তি বাস্তবায়নের পথ বন্ধ করে রেখেছে দেশটি। পাশাপাশি প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ার দায় বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে আসছে। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি গত মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরে এক অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া জনগণের পুনর্বাসনের জন্য রাখাইনে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে তাদের ফেরার ব্যাপারে সময় কাঠামো নির্ধারণ করা কঠিন। ঢাকাকেই প্রক্রিয়াটি শুরু করার জন্য প্রথম উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা কেবল সীমান্তে তাদের স্বাগত জানাতে পারি।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থীবিষয়ক কমিশনার আবুল কালাম বলেছেন, মিয়ানমারের নেত্রীর বক্তব্যের সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। প্রত্যাবাসন চুক্তি সইয়ের পর দশ মাসেও এর প্রধান কোনো শর্ত মিয়ানমার বাস্তবায়ন করেনি। চুক্তিতে পরিষ্কারভাবে বলা আছে, রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসিত হবেন; তাদের নিজেদের গ্রামে। সম্ভব হলে নিজ বাড়িতে। কোনো কারণে এটি সম্ভব না হলে নিজ গ্রামের কাছাকাছি কোনো জায়গায় তাদের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু মিয়ানমার মোটাদাগে শুধু দুটি অভ্যর্থনা ক্যাম্প এবং একটি ট্রানজিট ক্যাম্প তৈরি করেছে। 
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল গত ৯ থেকে ১১ আগস্ট মিয়ানমার সফর করেছে। এ সময় প্রতিনিধিদলটি মিয়ানমারের একাধিক মন্ত্রীর সাথে বৈঠক এবং রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে দেশটির প্রস্তুতি পরিদর্শন করে। প্রতিনিধিদলে পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক, শরণার্থীবিষয়ক কমিশনার আবুল কালামসহ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে গঠিত যৌথ কার্যকরী কমিটির (জেডব্লিউজি) সদস্যরাও ছিলেন।
জেডব্লিউজির সদস্যদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ মনে করে রোহিঙ্গা নামে কোনো সম্প্রদায় নেই। উত্তর রাখাইনে রয়েছে বাঙালি। তারা বাংলাদেশ থেকে এসে অবৈধভাবে বসতি স্থাপন করেছেন। এসব বাঙালি চরমপন্থী। তাদের ওপর মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের কোনো সত্যতা নেই। কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মিডিয়াকে আসতে দিয়ে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের নিয়ে নানা রকম গল্প বানাতে সহায়তা দিচ্ছে। মুসলিম বলেই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ।
হেলিকপ্টারে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ঘুরে উত্তর রাখাইনে একসময় রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলো দেখেছে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল। গ্রামের পর গ্রাম আগুনে পুড়ে গেছে। গাছগুলোর পাতাও জ্বলে গেছে। 
রাখাইন রাজ্যের সঙ্কট নিরসনে মিয়ানমার সরকার গঠিত আনান কমিশনের (জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে) প্রতিবেদনে অতিমাত্রায় শক্তি প্রয়োগ করলে রোহিঙ্গা চরমপন্থীদের উত্থান হওয়ার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। এতে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়া, তাদের চলাফেলার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন মানবিক সেবার অধিকার দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। গত বছর ২৪ আগস্ট এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এর পরদিনই রাখাইনের পুলিশ স্টেশন ও সেনা ছাউনিতে আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা) একযোগে আক্রমণ চালায় বলে মিয়ানমার সরকার অভিযোগ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমার নিরাপত্তাবাহিনী রাখাইন অধ্যুষিত গ্রামগুলোয় সাঁড়াশি আক্রমণ চালায়। সাথে যোগ দেয় বৌদ্ধ চরমপন্থীরা। তারা গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিয়ে হত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাট চালায়। সম্প্রতি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ অধিবেশনে ‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা : অব্যক্ত অভিজ্ঞতা’ বিষয়ক একটি গবেষণাগ্রস্থ উপস্থাপন করা হয়। এতে ২৫ আগস্টের পর রাখাইনে ২৪ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা ও ১৮ হাজার নারীকে ধর্ষণের তথ্যসহ নৃশংসতার তথ্য সব তুলে ধরা হয়।
রাখাইনে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর নৃশংসতা যে পূর্বপরিকল্পিত ছিল তা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। ২৫ আগস্টের আগেই রাখাইনে অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশ করা হয়। এ ব্যাপারে আগে থেকেই সাবধান করেছিলেন মিয়ানমারের মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসঙ্ঘের স্পেশাল রেপোর্টিয়ার ইয়াংহি লি। রোহিঙ্গাদের ওপর বিভিন্ন সময়ে চালানো নৃশংসতার চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার কারণে ইয়াংহি লির মিয়ানমার সফরের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। লি তার অভিজ্ঞতার কথা আগামী মাসে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ অধিবেশনে তুলে ধরবেন। এ ছাড়া ২৮ আগস্ট জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার পরিস্থিতির ওপর একটি উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সাথে গত নভেম্বরে চুক্তি সই করেছিল বাংলাদেশ। নেইপিডোতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এ সময় চুক্তির শর্ত নিয়ে মিয়ানমারের সাথে দরকষাকষি করে সমঝোতায় পৌঁছেছিল। এই চুক্তি সইয়ের দুই মাসের মধ্যেই প্রত্যাবাসন শুরুর কথা ছিল। কিন্তু দফায় দফায় মিয়ানমারের নানাবিধ শর্তের বেড়াজালে নির্ধারিত সময়ের সাত মাস পরও বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত একজন রোহিঙ্গাও রাখাইনে ফিরে যেতে পারেনি। চুক্তি অনুযায়ী দুই বছরের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে প্রত্যাবাসন শেষ হওয়া তো দূরের কথা, দফায় দফায় বৈঠক করে শুরুর সময়সীমাও নির্ধারণ করতে পারছে না বাংলাদেশ বা মিয়ানমার।
চুক্তি অনুযায়ী মিয়ানমার ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরের পরে আসা ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা এবং গত ২৫ আগস্টের পরে আসা সাত লাখ রোহিঙ্গাকে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য যোগ্য বিবেচনা করবে। মিয়ানমারের রাজধানী নেইপিডোতে গত ১৫ ও ১৬ জানুয়ারি জেডব্লিউজির বৈঠকে প্রতি সপ্তাহে ১৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল বাংলাদেশ। মিয়ানমার নিজেদের সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবার ও রোববার ছাড়া প্রতিদিন ৩০০ করে সপ্তাহে সর্বোচ্চ দেড় হাজার রোহিঙ্গা ফেরত নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। দুই পক্ষের সমঝোতা অনুযায়ী প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানো হতে পারে ধারণা করছে বাংলাদেশ। সেই হিসেবে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া সাত লাখ ৮৭ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠাতে সাত বছরের বেশি সময় লাগবে, যদি মিয়ানমার যথাসময়ে নিয়মিতভাবে তালিকা যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রেই মিয়ানমার মূল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে। প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং এ জন্য কোনো সময়সীমা নির্ধারিত নেই। মিয়ানমার শুধু একটি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।


আরো সংবাদ