২৬ এপ্রিল ২০১৯
রোহিঙ্গাদের এক বছর

মানবিক সঙ্কট এখন ভূরাজনৈতিক সঙ্ঘাত

মানবিক সঙ্কট এখন ভূরাজনৈতিক সঙ্ঘাত - ছবি : এএফপি

রোহিঙ্গা ইস্যু মানবিক সঙ্কট হিসেবে শুরু হয়েছিল। এক বছরের ব্যবধানে তা ভূ-রাজনৈতিক সঙ্ঘাতে রূপ নিয়েছে। মিয়ানমার এটিকে সামরিক সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে শক্তি দিয়ে সমাধান করতে চাইছে। 
বাংলাদেশের সাথে দ্বিপক্ষীয়ভাবে উদ্বাস্তু সঙ্কট নিরসনে কাজ করার কথা প্রকাশ্যে বলছে মিয়ানমার। অন্য দিকে আগের দুই ডিভিশনের অতিরিক্ত আরো ১০ কোম্পানি সৈন্য রাখাইনে জড়ো করেছে দেশটি। যুদ্ধে জড়াতে বাংলাদেশকে বিভিন্নভাবে প্ররোচিত করার চেষ্টা করছে।
মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের প্রধান শর্ত নাগরিকত্ব। কিন্তু এ দাবি মিয়ানমার সরকার কোনোভাবেই মানতে রাজি নয়। প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের অন্যতম শর্ত ন্যাশনাল ভ্যারিফিকেশন কার্ড (এনভিসি) রোহিঙ্গাদের নিজ হাতে পূরণ করতে হবে। কিন্তু এনভিসিতে পরিচয় ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ থাকায় তা পূরণে অনীহা প্রকাশ করছেন রোহিঙ্গারা। 

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে উৎসাহিত করতে অক্টোবরে মিয়ানমার পররাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে আসছে। তারা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাবে। রোহিঙ্গাদের সাথে সরাসরি কথা বলে এই প্রতিনিধিদল রাখাইনে নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বস্ত করার পাশাপাশি এনভিসি পূরণে উদ্বাস্তুদের তাগাদা দেবে।

রাখাইন সঙ্কট নিরসনে জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই গত বছর ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নজিরবিহীন নৃশংসতা চালানো হয়। হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূল করার চেষ্টা চালানো হয়। নৃশংসতার হাত থেকে বাঁচতে এরপর সাত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। বিভিন্ন সময়ে নিপীড়নের হাত থেকে রেহাই পেতে আগে থেকেই বাংলাদেশে চার লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছিলেন।
গত বুধবার লন্ডনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ অধিবেশনে ‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা : অব্যক্ত অভিজ্ঞতা’ বিষয়ক একটি গবেষণাগ্রন্থ উপস্থাপন করা হয়। এতে ২৫ আগস্টের পর রাখাইনে ২৪ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা ও ১৮ হাজার নারীকে ধর্ষণের তথ্যসহ ভয়াবহ সব নৃশংসতার তথ্য তুলে ধরা হয়।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সাথে গত বছর ২৩ নভেম্বর চুক্তি সই করেছিল বাংলাদেশ। নেইপিডোতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এ সময় চুক্তির শর্ত নিয়ে মিয়ানমারের সাথে দরকষাকষি করে সমঝোতায় পৌঁছে। চুক্তি সইয়ের দুই মাসের মধ্যেই প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দফায় দফায় মিয়ানমারের নানাবিধ শর্তের বেড়াজালে নির্ধারিত সময়ের সাত মাস পরও বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত একজন রোহিঙ্গাও রাখাইনে ফিরে যেতে পারেননি। 

রোহিঙ্গা সঙ্কটের এক বছর অতিক্রম সামনে রেখে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক গতকাল রোববার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে বিদেশী কূটনীতিকদের ব্রিফিং করেন। এ সময় সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিস্তৃতি ক্রমেই বাড়ছে। অক্সফোর্ডের মতো আরো দু-একটি শক্তিশালী প্রতিবেদন শিগগির বের হবে বলে আমরা আশা করছি। আগামী মাসে নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হবে। একই মাসে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের চেয়ার হবে যুক্তরাষ্ট্র। তারাও এ সঙ্কট সমাধানে কার্যকর কিছু করার চেষ্টা করবে বলে জানা গেছে। সঙ্কটের এক বছর পরও রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনা চলছে, চাপ অব্যাহত রয়েছে।

রোহিঙ্গা সঙ্কটের এক বছরে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে সরকার কতটা আশাবাদীÑ প্রশ্ন করা হলে সচিব বলেন, প্রত্যাবাসন একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলেও আমরা আশাবাদী। 
সাম্প্রতিক মিয়ানমার সফরের অভিজ্ঞতার বিষয়ে জানতে চাইলে শহীদুল হক বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা রাখাইনের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানেন। রোহিঙ্গাদের মতে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে রাখাইনে নিজেরাই বাড়িঘর বানিয়ে নেবেন। তিনি বলেন, রাখাইনে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট নির্মাণের পাশাপাশি উন্নয়নের একটি উদ্যোগ আমরা দেখেছি। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে একটি এলাকা কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এতে রফতানি প্রক্রিয়া অঞ্চল (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠা করা হবে।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট অবশ্যই একটি চ্যালেঞ্জ। দুই দেশ বা পক্ষের মধ্যে শক্তিশালী ইচ্ছা থাকলে কোনো চ্যালেঞ্জই সমাধানের অযোগ্য না। এটিই গুরুত্বপূর্ণ। বাকিটা প্রশাসনিক কার্যক্রম।

শহীদুল হক বলেন, সীমান্ত নিয়ে সরকার সতর্ক আছে। যখন যে ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হবে, তা যথাযথভাবে মোকাবেলা করা হবে। তিনি বলেন, সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী তাদের নিয়মিত কাজ করছে। দু-একজন রোহিঙ্গা যারা আসছেন, তাদের ঢুকতে দেয়া হচ্ছে।

রোহিঙ্গা নামে কোনো সম্প্রদায় নেই : পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল গত ৯ থেকে ১১ আগস্ট মিয়ানমার সফর করে। এ সময় প্রতিনিধিদলটি মিয়ানমারের একাধিক মন্ত্রীর সাথে বৈঠক এবং রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে দেশটির প্রস্তুতি সরেজমিন পরিদর্শন করে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে গঠিত যৌথ কার্যকরী কমিটির (জেডব্লিউজি) সদস্যরাও ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ মনে করে রোহিঙ্গা নামে কোনো সম্প্রদায় নেই। উত্তর রাখাইনে রয়েছে বাঙালি। তারা বাংলাদেশ থেকে এসে অবৈধভাবে বসতি স্থাপন করেছে। এসব বাঙালি ‘চরমপন্থী’। তাদের ওপর মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের কোনো সত্যতা নেই। কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মিডিয়াকে আসতে দিয়ে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের নিয়ে নানা রকম গল্প বানাতে সহায়তা দিচ্ছে। মুসলিম বলেই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ।

হেলিকপ্টারে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ঘুরে উত্তর রাখাইনে এক সময় রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলো দেখেছে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল। গ্রামের পর গ্রাম আগুনে পুড়ে গেছে। গাছগুলোর পাতাও জ্বলে গেছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের দাবি, রোহিঙ্গারা আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।
রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জীবিকার ব্যবস্থা করা, অত্যাচার না করা ও আইনের শাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। বাংলাদেশের মতে, রাখাইনের সমস্যা রাজনৈতিক। এটিকে রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হবে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার সামরিক সমাধানের ওপরেই জোর দিচ্ছে।

সিরিয়ায় গণহত্যার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে ‘ত্রিপেল আই - এম’ নামে একটি প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। রোহিঙ্গাদেরও এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনতে ব্রিটেন ও কানাডার সাথে কাজ করছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) মাধ্যমে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীকে বিচারের আওতায় আনার প্রক্রিয়াকে সমর্থন করছে বাংলাদেশ। এ জন্য বাংলাদেশ ৩১ পৃষ্ঠার একটি সাবমিশন দিয়েছে। বাংলাদেশের মতে, আইসিসি সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ না হলেও মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক আদালতের আওতায় বিচারের এখতিয়ার আইসিসির রয়েছে। রোহিঙ্গা সঙ্কটের এক বছরকে সামনে রেখে আগামী ২৮ আগস্ট জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি উন্মুক্ত আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে।

 


আরো সংবাদ

iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

Bursa evden eve nakliyat
arsa fiyatları tesettür giyim
Canlı Radyo Dinle hd film izle instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al
hd film izle
gebze evden eve nakliyat