২২ নভেম্বর ২০১৯
শ্রুতি ও স্মৃতির সোনালি শিখা

যেমন দেখেছি তাঁকে

-


চৌত্রিশ.

প্রতিটি মানুষের থাকে পছন্দ-অপছন্দের ঘোর। থাকে ভালো লাগা-না লাগার উচ্ছ্বাস। এভাবেই থাকে প্রিয়-অপ্রিয় যতসব। জীবনের বিভিন্ন অনুষঙ্গে এ প্রিয়-অপ্রিয় কাজ করে। জীবন চলার পথে জেগে থাকে এসব এবং শেষ পর্যন্ত এসবই একটি মানুষের বৈশিষ্ট্য হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। মানুষ তাকে চেনে, ব্যাখ্যা করে এবং বর্ণনা করে এসব বৈশিষ্ট্যের নিরিখে। একই সাথে প্রিয়-অপ্রিয় বিষয়গুলো অভ্যাস-অনভ্যাসেও প্রকাশ্য হয়। চলনে-বলনে, বিশ্বাসে ও কর্মের সীমানায় পছন্দ-অপছন্দের চোখ টাটিয়ে থাকে। টাটিয়ে থাকা দৃষ্টি দিয়েই মানুষ সব কিছু পরখ করে। দেখে। বিচার করে। গ্রহণ ও বর্জন করে। গ্রহণ-বর্জনের যোগ-বিয়োগের ফলাফলই মানুষের জীবন।
আল মাহমুদের এমন প্রিয় কিছু বিষয় ছিল, যেগুলো শেষ পর্যন্ত তার বৈশিষ্ট্যে দাঁড়িয়েছিল। তার দিকে ফিরে তাকালে সেই বৈশিষ্ট্যগুলো জ্বলজ্বল করে তার জীবনের ওপর। তার কর্মের পরিধিতে এবং তার সামগ্রিকতায়।
আল মাহমুদের প্রথম প্রিয় বিষয় ছিল বই পাঠ। তিনি বহুবার বলেছেন কথাটি। এই একটি বিষয় যেখানে তিনি কখনো ক্লান্তিবোধ করেননি। করতেন না। বলেছেনÑ বই পাঠ আমার নেশার মতো। দিন-রাত অনবরত পাঠেও আমার ক্লান্তি নেই। ঘুমও আসে না। বইয়ের মতো বই যদি হয়, তাতে রাত ও দিন এক সুতোয় গাঁথা যায়। অর্থাৎ সময়ের হিসাব থাকে না তখন। বেহিসাবি সময় খরচ করার মাধ্যম এই বই। সৌন্দর্যতত্ত্ব, কাব্য, ইতিহাস এবং প্রতœতত্ত্ব ছিল তার পছন্দের বিষয়। ছিল আধ্যাত্মিক পাঠের বাসনাÑ নবী-রাসূলদের জীবনী এবং ইতিহাসখ্যাত ব্যক্তিত্বদের জীবনীও ছিল তাঁর প্রিয় পাঠ্যের অন্তর্গত। তাঁর একটি বড় দাবি ছিল নিজের। তিনি বলতেনÑ আমি বড় লেখক কি না জানি না। কিন্তু আমি একজন বড় পাঠক, এ কথা দ্বিধাহীন বলতে পারি। আরো বলতেনÑ পড়তে পড়তে দৃষ্টি ক্ষয় করে ফেলেছি। বলেই অট্টহাসি হাসতেন। হাসতেন আনন্দের সাথে। তারপরই গম্ভীর হয়ে বলতেনÑ আমার জীবনের আক্ষেপÑ আমার কোনো সার্র্টিফিকেট ছিল না, যে কারণে আমার উচ্চশিক্ষিত বন্ধুরা আমাকে প্রায় অশিক্ষিত বলে গালাগাল দিত। টিটকারি দিত। আমার বুক এফোঁড়-ওফোঁড় হতো দুঃখের তীরে। মনে হতো আমার বুকের ভেতর অপমানের বুলেট ছেদাবেদা করে দিত আমার হৃদয়। আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, এ ঘৃণা ও অবহেলার নদী পার হতে হবে আমাকে। এ সিদ্ধান্তে আমার মন পাথর হয়ে উঠল। আমি সেই পাথরে ভাঙতে থাকি মূর্খতার দরজা। রাত নেই, দিন নেই। সকাল, দুপুর কিংবা সন্ধ্যা নেই। আমার জন্য পাঠই হয়ে উঠল সময়ের মুখ। পাঠের এ ঘোরে আমি ঘূর্ণির মতো ঘুরতে থাকলাম। যা পাই তা-ই পাঠ প্রথম এমনই ছিল। তারপর বিষয় ধরে পাঠ করার তৃষ্ণায় আমি পিপাসার্ত হলাম। বিষয়ের আগাগোড়া ভেতর-বাহির এবং সম্মুখ-পেছন আমি চিনতে শুরু করলাম। আমার সামনে জ্ঞানের দরজাগুলো খুলতে থাকে একের পর এক। শিল্প-সাহিত্যের বাইরেও আমি মন বাড়াই। আমার মনের কাছে আমি হয়ে উঠি জ্ঞান পিপাসায় কাতর এক তৃষ্ণার নাদান। গোগ্রাসে গিলি। তৃষ্ণা মেটে না; বরং ছোট মরুভূমি থেকে আরো বড় মরুভূমির পিপাসায় আমার বুক শুকিয়ে ওঠে। আমি আরো আশ্রয় করি বইয়ের পাতা। পুঁথিসাহিত্য থেকে লোকসাহিত্য এবং আধুনিক সাহিত্যের কলকব্জার ঘষটানি আমি টেনে তুলি আমার বুকের কাছে। দেখি এখানে স্বাদ যেমন আছে, বিস্বাদও কম নেই। এভাবে পাঠের তৃষ্ণা আমার কখনো মেটেনি।
পাঠের তৃষ্ণা আল মাহমুদের মেটেনি, এ সত্য আমরা দেখেছি। দেখেছি পাঠযোগ্য যেকোনো বই হাতে তুলে নিতেন তিনি। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় দৃষ্টির ধার বোলাতেন তিনি। যখন পড়তেন ডুবে যেতেন বইয়ের বুকে। ডুবুরির মতো সেঁচে তুলতেন জ্ঞানের আকর। কত দিন তাঁকে দেখেছি বিভিন্ন লাইব্রেরির বইরেখ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে অনুসন্ধান চালাতে। কখনো কখনো পছন্দের বইটি হাতে তুলে খুলে ধরতেন চোখের সামনে। মন ঢেলে খুঁজতেন নতুন কিছু। আশপাশে কে এলো কে গেলÑ এ নিয়ে ভাবান্তর নেই একটুও। বই তাঁর। তিনি বইয়েরÑ এমন হয়ে উঠত পরিবেশ। এমনি নিবিড়তায় তিনি জেগে থাকতেন বইয়ের সাথে। পাঠের এ তৃষ্ণা তাঁকে সাহিত্যের খানাখন্দ চিনিয়েছে। আঁকবাঁক ও চূড়া দেখিয়েছে। জানিয়ে দিয়েছে এর ভেতর-বাহির। তরুণতম লেখকের লেখাও ছিল তার পাঠের অন্তর্গত। এভাবে তিনি পড়েছেন সারাটি জীবন। আমৃত্যু! শেষ জীবনে নিজের চোখ তাকে আর পড়তে সাহায্য করেনি। অন্যের মুখে পাঠ শুনতেন। নিজে পড়তে না পারার কষ্ট ছিল তার প্রচণ্ড। কিন্তু কী-ই বা করার ছিল। যিনি দিয়েছেন তিনিই যদি নিয়ে যান দৃষ্টির জ্যোতি। কী করার থাকে মানুষের?
বই পড়া প্রিয় ছিলই। এই প্রিয়তার পরিধি বেড়ে বইপ্রিয় মানুষও ছিল তার প্রিয়।
খুব খেতে পছন্দ করতেন আল মাহমুদ। ভোজনরসিক যাকে বলে, তিনি তেমনটিই ছিলেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আয়োজনে খাবারের খবর নিতেন। মেনু জানতে চাইতেন। পছন্দের খাবার থাকলে আনন্দ প্রকাশ করতেন। খেয়ে তৃপ্তি প্রকাশ করতেন। তাঁর বাবাও ভোজনরসিক ছিলেন। বললেন একদিন, আমার বাবার মতোই আমি ভোজনরসিক। আমার বাবা খেয়েই সব শেষ করেছেন। তাঁর আত্মা ছিল বড়। মন ছিল উদার। ফলে খাবারের বিষয়ে আমার বাবা কখনো কার্পণ্য করেননি। আমিও না এবং এ বিষয় কোনো কৃপণ লোককে আমি পছন্দও করি না।
আল মাহমুদ এক সময় নিজে বাজার করতেন। খাবারের মতো বাজার করাও ছিল তার প্রিয় কাজ। নিজের পছন্দমতো বাজার থেকে জিনিস কিনে আনার একটি আনন্দ আছে। তিনি সে আনন্দ উপভোগ করতেন পুরোমাত্রায়। হাসতে হাসতে বলতেনÑ আমি বাজার করি আমার আনন্দে। আমার খুশিতে। বউ কলম কেড়ে বাজারের থলে ধরিয়ে দেয়নি কোনো দিন। আমার বন্ধুদের অনেকেরই জীবনে এমন কাহিনী ঘটেছে। অনেকে এই নিয়ে আক্ষেপ করেছেন জীবনভর। দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে তারা সাহিত্যের কঠিন পথ পাড়ি দিয়েছেন।
লেখালেখির ক্ষেত্রে পরিবার একটি বিষয় বটে। পরিবার থেকে সহযোগিতা না মিললে একজন লেখকের জীবন কষ্টে ভরে ওঠে। হাঁসফাঁস হয় জীবনটি। দীর্ঘ নিঃশ্বাসে ভরে থাকে বুক। কোনো কিছুতে তাদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ থাকে না। তারা ধীরে ধীরে ক্রমাগত নিভে যেতে থাকে। আল মাহমুদ অন্তত পারিবারিক দিক থেকে এমন দুঃসহতা পাননি। তাঁর সন্তানদের কেউ লেখালেখিতে নেই। সাহিত্যাঙ্গনে বিচরণ নেই কারো। কিন্তু কেউ আল মাহমুদের বিপক্ষে দাঁড়াননি; বরং বাবাকে নিয়ে তারা গৌরব বোধ করেছেন। করছেন এবং সম্ভবত করবেনই।
পোশাকের দিক থেকে আল মাহমুদের পছন্দ ছিল শার্ট-প্যান্ট এবং পায়জামা-পাঞ্জাবি দুটোই। কালারফুল পোশাক ছিল প্রিয়। তবে জুতার বিষয়ে তাঁর বেশ তৃষ্ণা ছিল। পছন্দের জুতা পেলে খুব খুশি হতেন।
সাধারণত কবিতার অনুষ্ঠানে কবিরা পায়জামা-পাঞ্জাবি বেছে নেন। আল মাহমুদও তাই করতেন। তবে কোট-স্যুট পরে কবিতা পড়া ছিল তাঁর অনেক পছন্দ। হয় এটি শৌখিনতা অথবা কবিদের গতানুগতিক পোশাকের বাইরের একটি দৃষ্টান্ত। কবিতা আসরের প্রচলিত পোশাক ছেড়ে নতুন রুচির উদ্বোধন করার এক ধরনের উচ্ছ্বাস ছিল তাঁর। এ বিষয়টি তাঁদের চার বন্ধু সবারই ছিল। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী ও ফজল শাহাবুদ্দীন একই পথের যাত্রী ছিলেন এই বিষয়ে। বিশেষ করে কবিতার বড় আয়োজনে তাঁরা কোট-টাই পরে কবিতা মঞ্চে দাঁড়াতেন।
পকেটে দামি কলম রাখা ছিল আল মাহমুদের শখের বিষয়। কেউ দামি কলম উপহার দিলে খুব খুশি হতেন। আনন্দ পেতেন এমন কলম ব্যবহার করে। অটোগ্রাফ শিকারিদের মনোবাসনা পূরণে এমন কলম ছিল তাঁর হাতিয়ার। দামি কলম কেন রাখেন পকেটে? এমন জিজ্ঞাসায় বলেছেনÑ কলম দিয়ে এক ধরনের বাবুগিরি করি। কলম হাতে নিলেই আশপাশের লোকেরা কৌতূহলী হয়ে ওঠে। চোখ ডাগর হয়ে ওঠে কারো কারো। কেউ কেউ বলেন, কলমটি তো খুব সুন্দর। কথাটি শুনতে আমার বেশ ভালো লাগে। তা ছাড়া মেয়েরা অলঙ্কার পরে। অলঙ্কার ঝুলিয়ে রাখে অঙ্গে। আমি কলম রাখি পকেটে।
তাঁর শখের আরেকটি বিষয় ছিল ঘড়ি। বাম হাতে একটি ঘড়ি পরতেন তিনি। তাঁর বন্ধু ফজল শাহাবুদ্দীন ছিলেন ঘড়িপাগল একজন। বেশ দামি ঘড়ি পরতেন। ডান হাতে পরতেন তিনি। কখনো কখনো দু’টি ঘড়ি একসাথেই পরতেন ফজল ভাই। আল মাহমুদকে ঘড়ি উপহার দিয়েছেন একাধিকবার। তিনিও উপহার পেতেন ঘড়ি। খুব দামি ঘড়ি উপহার পেয়েছেন ফজল ভাই। উপহার দিয়েছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। নতুন ঘড়ি পেলে খুব খুশি হতেন আল মাহমুদ।
মাহমুদ ভাইয়ের প্রিয় খেলা ছিল ফুটবল। কিশোরকালে মামা-চাচাদের সাথে খেলেছেন খুব। একসময় স্বপ্ন দেখতেন বড় ফুটবলার হওয়ার। টেবিলটেনিসও ছিল তাঁর পছন্দের। লং টেনিসে বেশি মজা পেতেন। টিভিতে খেলা দেখলে টেনিসই দেখতেন। ক্রিকেটও দেখার আওতায় ছিল। তবে ক্রিকেটে সময়ের দীর্ঘতা পছন্দ করতেন না।
প্রিয় কবি ছিলেনÑ রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ছিল তাঁর নিত্যপাঠ্য। নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা নিয়ে প্রায়ই বিস্ময় প্রকাশ করতেন। কবিদের স্বাধীনতা এবং সৌর্যবীর্জ নিয়ে কথা উঠলেই নজরুলকে স্মরণ করতেন। বলতেনÑ কাজী সাহেব যা করেছেন এটি অসাধ্য। সাধারণ কবিদের পক্ষে তা একেবারেই অসম্ভব।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান খুব প্রিয় ছিল। তার গানের খুব ফ্যান ছিলেন তিনি। নজরুলসঙ্গীত ছিল ভীষণ প্রিয়। দু’জন শিল্পীর কণ্ঠে নজরুলসঙ্গীত শুনতেন প্রায়ই। একজন শিল্পী শবনম মুশতারী, আরেকজন ফাতেমাতুজ-জোহরা। [চলবে]

 


আরো সংবাদ

আজানের মধুর আওয়াজ শুনতে ভিড় অমুসলিমদের (২৫৪৫৭)ধর্মঘট প্রত্যাহার : কী কী দাবি মেনে নিয়েছে সরকার (২০৯৩৪)মানবতাকে জয়ী করেছে পাকিস্তান : রাবিনা ট্যান্ডন (১৯৪৬৭)কম্বোডিয়ায় কাশ্মির ইস্যুতে বক্তব্য, প্রতিবাদ করায় ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করা হলো বিজেপি নেতাকে (১৯১৮৮)ব্যাংকে ফোন দিয়ে তদবির করে ‘ছাত্রলীগ সভাপতি’ আটক (৯৮৭১)আবারো রুশ-চীনা অস্ত্র কিনবে ইরান, আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের (৯৭৬৩)৪ ভারতীয়কে জাতিসঙ্ঘের সন্ত্রাসী তালিকাভূক্ত করবে পাকিস্তান (৯৫৮৪)৩৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে নেপাল-ভারত তুমুল বিরোধ (৯৩৪৩)গৃহশিক্ষক বিয়েতে বাধা দেয়ায় ছাত্রীর আত্মহত্যা (৯০৫০)ইলিয়াস কাঞ্চনকে যে কারণে সহ্য করতে পারেন না বাস-ট্রাক শ্রমিকরা (৯০১৪)