২২ নভেম্বর ২০১৯

‘আহত পাখির মতো ইতিহাস অন্ধকারে যায়’

-

মোস্তফা হায়দার
কবি ময়ুখ চৌধুরী এক নিখুঁত শব্দের কারিগর। কবিতা বিষয়ে হঠাৎ মনে পড়ে গেল কবি আল মাহমুদের সে কথাটিÑ “পাখির নীড়ের সাথে নারীর চোখের সাদৃশ্য আনতে যে সাহসের দরকার সেটাই কবিতা” বাবুই পাখির বাসা বানানো দেখলে কবিতা বুননের শিল্পকলা আত্মস্থ করা সহজ না হলেও ধারণার উদয় নিশ্চিত।
কবিতাকে আপন শার্টের মতো ম্যাচিং করে নিতে জানা এক কবি তিনি। তাঁর কবিতার ওজনের চেয়ে বোধের জায়গা অনেক ব্যাপৃত। “বর্ষা নিজেই কবি, কাব্য লেখে জলের অক্ষরে” কী অসাধারণ এক ঘোড়ার ক্ষুরের ধার চোখে পড়ে! কবিতার বাহাদুরি তো এখানেই। পাঠক থমকে দাঁড়াবে পথিমধ্যে। বর্ষা নিয়ে এত গভীর বাক্য হয়তো চোখে পড়বে না। কবির ভাবনার অন্তপুর অনেক দূর। কবিরা সব সময় শিল্পের কাছে আশ্রয় খোঁজেন। আর কবি ময়ুখ চৌধুরী নিখুঁত শিল্পের চর্চা করতে বড় ভালোবাসেন। পাঠক নিয়ে মজা করেন বোধের দরোজায় কড়া নাড়িয়ে।
কবির দায় মানুষের বহির্চেতনায় নাড়া দিয়ে বোধের উদয় ঘটানো হয়তো। আয়নাবিষয়ক একটি কবিতায় কত গভীরে প্রবেশের ইঙ্গিত দিয়েছেন নিপুণ হাতে। কবিতাকে এভাবে যাপিতাংশের মতো করে সহজিয়া শিল্পে রূপ দিয়ে কবির পরিচয়ও দিলেন বটে। কবিতার ভাষায়Ñ
ঐ রাক্ষুসটা গতকাল দুপুরে একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছে
দুই আর তিন মিলিয়ে মোটে পাঁচ পেগ।
তারপর-শাড়ি, ব্লাউজ, পেটিকোট যাবতীয় সজ্জিত আহার
এমনকি জিন্স প্যান্ট, বেল্টের কঠিন ইস্পাত, ঘোড়ার নিঃশ্বাস।
বলছিলাম আয়নাটার কথা
(ক্যাঙ্গারুর বুকপকেটে)
একটি জীবনের পরিশুদ্ধতা খুঁজতে হলে আয়নার সামনে যেতে হবে। যেতে হবে ম্যাচিংয়তার ভেতর ধরে। যেমনটি আত্মসমালোচনার পরিপূরক অংশও বটে। ইহকাল আর পরকালের এই বিশাল মাঠে আত্মসমালোচনা অথবা আয়নার সামনে যাওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এই যে কবি বোধের চিন্তাপুরে হাঁটিয়ে দিচ্ছেন পাঠকদের। গাড়ি ধরতেই হবে। ধরতে জানা গাড়ির মাঝে লুকিয়ে আছে বাঁচতে জানা তরীর গল্প। যে গল্প ভাসতে ভাসতে দিগন্তরেখা ছুঁতে স্বপ্ন দেখায়। স্বপ্নের সামিয়ানা আর ইচ্ছে পুরুষতা হাতল ঠেলে বিচ্ছুরণ ঘটাতে চায় আলো আঁধারীর ধোঁয়াশা মাঠে। মাঠের পরিচয় চিনে নিতেই তবে কবিতার আশ্রয়। কবির ভাষায়-
রেখে যাচ্ছি মোমবাতি, মেরুদণ্ডে শাদা অন্ধকার
যেন প্রত্যাশার চেয়ে অতিরিক্ত আলো পেতে পারো।
(যেতে যেতে রেখে যাচ্ছিÑ ক্যাঙ্গারুর বুকপকেটে)
কবি দায় নিয়ে ফররুখের মতো সূর্যোদয়ময় সময়ের প্রত্যাশা রাখেন মনুষ্য সমাজের। সমাজের মুক্তির মাঝে মানবতার মুক্তি ভর করবে। আলোর নিচে আলোরই ছায়া পড়বে। জাগতিক শিল্পের কাছে আলোরা দ্যুতি ছড়াবে। অসংখ্য স্থানের স্থানিক স্খলন ভেতরের কামিজ খোলার মতো সময়ের অযাচিত বিষয় এসে কবির জোড়া পায়ে দাঁড়ায়। কবি তখন শিল্পের কাছে মুক্তির দ্যুতি খোঁজেন। যেমন-
পড়ে থাকে ফুটপাতে রাতের ক্ষুধায়
নিহত বিশ্বাসটুকু কুয়াশার কাঁপনে জড়ানো
এইতো শীতের গল্প,ঋতুচক্র, দেনা আর দায়
আহত পাখির মতো ইতিহাস অন্ধকারে যায়
একজন কবি আয়নার মতো ঘটনার ক্যামেরাম্যানও বটে। সত্যটাকে আড়াল করতে করতে একসময় সত্য নামক শব্দই মিথ্যার ঘরে গিয়ে সংসার করবে নিশ্চিত। প্রতিকারের ভাষায় চড়তে হবে বজরার মতো।
কবির নিপতনে সিদ্ধ কবিতায় দেখি-
অগ্নিউপাসক তার কথা রেখেছিল,এসেছিল
উদ্ধতবৃক্ষের মমো ব্যাকুল নেশায়,
তুমি কিনা নিজ নাম লিখিয়েছ ক্ষুধাহীন শামুকের বংশতালিকায়।
‘বহুদিন বাদে রিকশায় করে চলে যাচ্ছিল আমার প্রেম’ চমৎকার এ লাইনটি একটি কবিতা হয়ে সময়ের পরিচয় দিয়েছে। কবিতার শৈল্পিকতার চেয়ে সহজিয়া এক নতুন ক্রিয়া ভর করেছে এ কবিতায়।
কবির ক্রেতাদুরস্ততা অথবা বিনয়ী শিল্পচর্চার এক নরম মেদ হচ্ছে নিজেকে আড়াল করে উপমাকে টেনে আনা। কবির বাহাদুরিÑ সে যা বলবে, পাঠক গিলে খাবে আপনহাতে। কবি ময়ুখ চৌধুরী শব্দকে মানুষের কাছে এত চমৎকার ঢঙে উপস্থাপন করে চলেছেন, যেখানে গোগ্রাসে গিলে যাচ্ছে। উদভ্রান্ত সময়ে দিক হারা বিষণœতার ঘোর ভেদ করে কবি মূর্তমান যে শব্দকলার চিত্রণ করে চলেছেন তা যেন লুফে নেয়া এক অফারও বটে! কবির ভাষায়-
আমার ঘরের ভেতর, সে আমার অক্ষমতা নিয়ে
শাটলককের মতো খেলা করে গেল আর আমি
রক্ষণশীলতা ভেঙে ডাকতে পারিনি তাকে, বলতে পারিনিÑ
আসুন, বসুন এইখানে;
বড্ড গরম আজ, এই নিন লেবুর শরবত।
(বিনিদ্র শয্যায় এক কুমারীর ভাবনা- জারুলতলার কাব্য)
আশ্চর্য এক সমীকরণময় শব্দরা হয়ে যায় কবিতা। কবিতার স্থানিক রূপ কবিরা ধরতে জানেন বলে কবিতা কথা বলে সময়ের, কবিতা কথা বলে দেয়া না দেয়ার, কবিতা হেসে ওঠে জাত-বেজাতে, কবিতা গেয়ে চলে রূপ অপরূপের ঈশ্বরের সামিয়ানায়। ‘প্রভু বুদ্ধিসুদ্ধি দিলে না কিছুই’ কবিতার শেষাংশে কবির বিনয়ের সুর বেজে উঠেছে ঐশ্বরিক লীলার খোঁজে। যার দেয়া জিনিসের কদর গিয়াছে হারিয়ে। শোধানোর ইচ্ছের কাছেও মানুষের আগ্রহ কুণ্ঠিত। অথচ কবি কত বিরহের ভাষায় অথবা বিনয়ের সুর মেখে নিজের ত্রুটির ক্ষণ যাচাই করতে করতে প্রভুর কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন আনতসুরে। যে সুরে প্রভুর দরিয়া প্রশমিত হয়। স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে প্রভুর দরবারে। কবিতার ভাষায়-
জটিলরেখায় ভরা দুইখানা হাত দিয়েছিলে
সেই হাতে অনেকের পথের ঠিকানা,
অথচ নিজেই আমি কানা ফকিরের মতো ঘুরপাক খাই।
দু’হাতে অঞ্জলি পেতে চাঁদের পাথর
কিভাবে নামাতে হয়Ñশেখালে না প্রভু
বুদ্ধিসুদ্ধি দিলে না কিছুই।
কবি ময়ুখ চৌধুরী ময়ূরের পেখমের মতো কবিতায় শব্দের বিন্যাস ও যে গাঁথুনি দিয়েছেন তা যেন কুমারের মৃত্তিকাশিল্পের রূপ অথবা জেলেদের জাল বুননক্রিয়া। চৌধুরী প্রেমময় কবিতাবিশ্ব গড়তে চেয়েছেন নিখুঁতভাবে। সে যাত্রায় বিরলপ্রজ কবি হলেন ময়ুখ। তাঁকে পাঠ করতে বসলে শিল্পের উৎকর্ষের রূপ এসে ভর করে। জানান দেয় কবিতার শৈল্পিকত। তেমনই একটি চমৎকার কবিতা হলো ‘সাবলেট’
ভাড়ার ব্যাপারটা বড় কড়াকড়ি; মাসে দুইবার
শুক্ল আর কৃষ্ণপক্ষের ভাড়া দিতে হবে গুণে গুণে।
প্রথম কিস্তির ভাড়া নিম্নরূপ :
প্রতি পূর্ণিমার রাতে চাঁদ যদি দুধে ভরে যায়
পিপাসা মেটাতে হবে পনেরোটি অধিক চুম্বনে,
দ্বিতীয় কিস্তির ভাড়া নিম্নরূপ :
নদীতে জোয়ার এলে, মোহনায় জমে গেলে লবণাক্ত ফেনা,-
মুহূর্তে চুকিয়ে দিতে হবে সব দেনা।
কোথায় একটা যেন কামরা খালি আছে। ...
ভোগবাদী সময়ে কবিতার সংজ্ঞা এমনই। তবে চিরায়ত সময়ে কবিতাটি আসলে এক সৌরমাসের ক্রিয়া নিয়ে সুন্দর উপমায় বর্ণনাও বটে। কবিতাকে এত শিল্পময় করে তোলা কবি ছিলেন ‘নদীর ঢেউয়ের মত বল কন্যা কবুল কবুল’খ্যাত সদ্যপ্রয়াত কবি আল মাহমুদ। দুজনের চিন্তার প্রখরতায় ভিন্ন স্বাদ রয়েছে। একজন লোকজ শব্দের আশ্রয় খোঁজেছেন আর একজন উপমাময় বাক্যবাণে প্রকৃতি আর সৃষ্টিলীলায় বুঁদ হয়ে কবিতা চাষ করে চলেছেন। নিত্যঘটমান ক্রিয়ার হাতে ভবিষ্যতের চাবি তুলে দেয়া এক কবি হলেন ময়ুখ চৌধুরী।


আরো সংবাদ

আজানের মধুর আওয়াজ শুনতে ভিড় অমুসলিমদের (২৫৪৫৭)ধর্মঘট প্রত্যাহার : কী কী দাবি মেনে নিয়েছে সরকার (২০৯৩৪)মানবতাকে জয়ী করেছে পাকিস্তান : রাবিনা ট্যান্ডন (১৯৪৬৭)কম্বোডিয়ায় কাশ্মির ইস্যুতে বক্তব্য, প্রতিবাদ করায় ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করা হলো বিজেপি নেতাকে (১৯১৮৮)ব্যাংকে ফোন দিয়ে তদবির করে ‘ছাত্রলীগ সভাপতি’ আটক (৯৮৭১)আবারো রুশ-চীনা অস্ত্র কিনবে ইরান, আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের (৯৭৬৩)৪ ভারতীয়কে জাতিসঙ্ঘের সন্ত্রাসী তালিকাভূক্ত করবে পাকিস্তান (৯৫৮৪)৩৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে নেপাল-ভারত তুমুল বিরোধ (৯৩৪৩)গৃহশিক্ষক বিয়েতে বাধা দেয়ায় ছাত্রীর আত্মহত্যা (৯০৫০)ইলিয়াস কাঞ্চনকে যে কারণে সহ্য করতে পারেন না বাস-ট্রাক শ্রমিকরা (৯০১৪)