১৯ নভেম্বর ২০১৮

অর্থের রক্ষক যেভাবে হলেন ভক্ষক

-

ফরিদপুরে দুদকের মামলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের এক পেশকার ও তার স্ত্রীকে বিভিন্ন মেয়াদে অর্থদন্ডসহ কারাদন্ড দিয়েছেন আদালত। আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে ফরিদপুরের বিশেষ জজ আদালতের বিচারিক হাকিম মতিয়ার রহমান এ আদেশ দেন।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের পেশকার, শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জিএম শাখার মো: ইমাম উদ্দিনকে (৪৫) ২৮ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৮৯ লাখ ৯৪ হাজার ২৪ টাকা আর্থিক দণ্ড প্রদান করেন আদালত। জরিমানার টাকা অনাদায়ে তাকে আরও সাত মাস ১৫দিন বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন।

একই আদেশে আদালত এ কাজে সহায়তা করার জন্য ইমাম উদ্দিনের স্ত্রী শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অফিস সহকারী কমলা আক্তারকে (৩৮) আট বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও নগদ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে তাকে আরও দেড় মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন।

রায় ঘোষণার সময় মো: ইমাম উদ্দিন ও তার স্ত্রী কমলা আক্তার আদালতে হাজির ছিলেন। তাদের দুজনকে রায় ঘোষণা পর সরাসরি কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে দুদকের আইনজীবী মজিবর রহমান বলেন, ২০১০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের ২৬ মে পর্যন্ত ভ্রাম্যমান আদালতের পেশকার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ইমাম উদ্দিন তার স্ত্রী অফিস সহকারী কমলা আক্তারের সহায়তায় আদালতের অর্থদণ্ড বাবদ প্রাপ্ত ৮৯ লাখ ৯৪ হাজার ২৪ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন।

এ অভিযোগে ২০১৫ সালের ১৮ জুন শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারি কমিশনার ও নির্বাহী হাকিম জিনিয়া জিন্নাত বাদী হয়ে পালং থানায় সরকারি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন।

পরে দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত জেলা কার্যালয় ফরিদপুরের সহকারি পরিচালক হাফিজুর ইসলাম এ অভিযোগটি তদন্ত করে ইমাম উদ্দিন ও কমলা আক্তারকে অভিযুক্ত করে চার্জশীট প্রদান করেন।

 

আরো পড়ুন: রক্ষক যদি ভক্ষক হয়?

তৈমূর আলম খন্দকার, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫

বিজয়ের মাস, সবাইকে বিজয়ের রক্তিম শুভেচ্ছা। সব শহীদ ও নির্যাতিতের প্রতি শ্রদ্ধা, গাজীদের প্রতি সম্মান। রক্ত দিয়ে কেনা এই স্বাধীনতা। রক্তের ঋণ কতটুকু পরিশোধ হয়েছে? বিজয়ের মাসেও ভাবতে হয় কেমন আছে দেশবাসী? ভূখণ্ড স্বাধীন হয়েছে, দেশবাসী কি স্বাধীন হয়েছে? অর্থাৎ স্বাধীন দেশের একজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্র থেকে দলমত নির্বিশেষে যথাযথ সম্মান ও অধিকার সমভাবে ভোগ করতে পারছে? দেশের আইন ও বিচার কি সমভাবে কার্যকর হচ্ছে? গণতন্ত্র কি পরিস্ফুটিত না নির্বাসিত? সম্পদের সুষম বণ্টন হচ্ছে না কুক্ষিগত হচ্ছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান মানুষ কি পাচ্ছে? ধর্মীয় স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, চিকিৎসা এবং শরীর, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা কি নিশ্চিত হচ্ছে?

উপরিউক্ত প্রশ্নগুলো যখন দেশবাসীর মনে রেখাপাত করছে, তখন চার দিক থেকে সরকারে উন্নয়নের জয়গান ভেসে আসছে। সার্বিক অবস্থায় আসলেই কেমন আছে দেশবাসী? এর উত্তর খোঁজার কি সময় আছে তাদের, যাদের হাতে দেশবাসীর ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হয়? রাষ্ট্রীয় বাহিনী সাতজনকে খুন করার পর গোটা দেশবাসী এর বিচার চেয়েছিল। এ ঘটনায় মামলাই হতো না, যদি উচ্চ আদালত তদন্তের নির্দেশ না দিতেন। তদন্তের পর চার্জশিট হয়েছে। পুলিশ বলছে, ‘চমৎকার তদন্ত হয়েছে এবং একটি নির্ভুল চার্জশিট।’

অথচ হাইকোর্ট বলেছে, ‘এই মামলার চার্জশিটে একটি মারাত্মক ত্রুটি আছে। আমি জানি, কিন্তু এখন বলব না, খুঁজে বের করুন।’ চার্জশিটে ত্রুটি এ মামলার ভাগ্য সম্পর্কে দেশবাসীকে আবারো ভাবিয়ে তোলেনি, কারণ ক্ষমতাসীনদের বেলায় চার্জশিট এমনই হয়। এ দেশের এটাই অভিজ্ঞতা। অথচ পৈশাচিক কাপুরুষোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড মামলায় সম্পূরক চার্জশিট দিয়ে তারেক রহমানকে আসামিভুক্ত করা হয়েছে। এতেও মানুষ আশ্চর্য হয়নি। কেননা এ দেশে পুলিশ ও ক্ষমতাসীনেরা সবই পারে। সরকারের অংশীদার ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এরশাদ বলেছে, ‘ঘরে থাকলে খুন, বাইরে থাকলে গুম।’

বিজয়ের মাসে অর্থাৎ গত ৪ ডিসেম্বর গুম হওয়া ১৯টি পরিবার জাতীয় প্রেস কাবে সংবাদ সম্মেলন করে তাদের সন্তানদের ফিরিয়ে দেয়ার আবেদন করে। স্বজনেরা সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘গুম হওয়া স্বজনদের অপেক্ষায় কাঁদতে কাঁদতে আমাদের চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। কেউ কি আমাদের কান্না শুনবে না? আমরা আর কাঁদতে চাই না। প্রধানমন্ত্রী, আপনি চাইলেই আমাদের স্বজনদের উদ্ধার সম্ভব।’ এসব কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন রেহেনা বানু মুন্নী।

২০১৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর পল্লবীর বিব্লকের ৯ নম্বর রোডের ৫ নম্বর বাড়ি থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচয় দিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় মুন্নীর ভাই সূত্রাপুর থানা ছাত্রদল সভাপতি সেলিম রেজা পিন্টুকে। সংবাদ সম্মেলনে ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর পরিচয়ে গুম হওয়া ১৯ জনের স্বজনেরা একইভাবে আকুতি প্রকাশ করেন। নিখোঁজ ১৯ জনই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। এই সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ২৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, নিখোঁজ সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন সানজিদা ইসলাম তুলি।

উপস্থিত ছিলেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক নর খান। বংশাল এলাকার নিখোঁজ বিএনপি নেতা সোহেলের ছেলে জেএসসি পরীক্ষার্থী রাজু বলে, ২ ডিসেম্বর ছিল তার জন্মদিন। ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর তার জন্মদিনে বাবা বাসা থেকে বের হয়েছিলেন ফুল আনার জন্য। জন্মদিনের কেকও আনা হয়েছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করলেও বাবা আর ফিরে আসেনি। এর পর থেকে তার আর জন্মদিন পালন করা হয় না। নিজের জন্মদিনে যেন বাবার মৃত্যুদিন না হয়, সে জন্য ছেলেটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুতি জানিয়ে বলে, ‘একবারের জন্য হলেও আপনি আমার বাবাকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিন।’

বিমানবন্দর থানা ছাত্রদল শাখার যুগ্ম সম্পাদক নিজাম উদ্দিন মুন্নার বাবা শামসুদ্দিন জানান, ‘২০১৩ সালের ৬ ডিসেম্বর রাতে দক্ষিণখানের ১২৫, মোল্লারটেকের বাড়ির সামনে থেকে ডিবি পুলিশ মাইক্রোবাসে করে তার ছেলে ও বন্ধু তরিকুল ইসলাম ঝন্টুকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। র‌্যাব, পুলিশ, ডিবি সবার কাছে গিয়েছি। কেউ কিছু জানাতে পারেনি। এখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ, আমার ছেলেকে যারা যে মাটিতে পুঁতে রেখেছে, সেটি বলে দিক...’ বাবা শামসুদ্দিন আর বলতে পারলেন না।

সংবাদ সম্মেলনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের তৃতীয়বর্ষের ছাত্র আসাদুজ্জামান রানার বোন মিনারা বেগম বলেন, তাদের বাড়ি রংপুরে। তারা পাঁচ ভাই-বোন। রানা ঢাকার উত্তর মুগদায় তার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করত। মিনারা কেঁদে কেঁদে বলেন, ‘আমার ভাই ছাত্রদল করত, এটাই অপরাধ? প্রধানমন্ত্রী চাইলে ভাই ফিরে আসতে পারে। আমাদের বিশ্বাস সে ফিরে আসবে।’

সবুজবাগ থানা ছাত্রদল শাখার সভাপতি মাহবুব হাসান সুজনের ছোট ভাই শাকিল বলেন, ‘সুজনের দুই সন্তান রয়েছে। তারা এখন বাবার অপেক্ষা করছে। বাবা কোথায় আছে, এ প্রশ্ন করলে আমরা কোনো উত্তর দিতে পারি না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই বলে দিন, সুজন এখন কোথায় আছেন।’ ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়া বাংলাবাজার এলাকার ছাত্রদল নেতা খালিদ হাসান সোহেল ও সম্রাট মোল্লাকে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য পরিচয় দিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।

খালিদের স্ত্রী সৈয়দা শাম্মী সুলতানা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘খালিদের একটি ছেলে রয়েছে। প্রতিদিন বাবার কথা জিজ্ঞাসা করে। কিন্তু কিছুই বলতে পারি না। আমরা আর কত দিন এভাবে থাকব? প্রধানমন্ত্রী একজন মমতাময়ী মা। তিনি যদি একটু দৃষ্টি দেন তাহলে খালিদের ছেলে তার বাবাকে ফিরে পাবে।’

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে গণপিটুনিতে আটজন খুন হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। রক্ষক যদি ভক্ষক হয় তবে ভুক্তভোগীর দাঁড়ানোর কোনো আশ্রয় থাকে না। দেশবাসীর হয়েছে সে অবস্থা।

২৪ ফেব্রুয়ারি রূপগঞ্জ থানাধীন গাউছিয়া মার্কেটে আগুনে ঢাকা-জ-১১-১১৩৪ নাম্বার বাসটিতে ঘুমন্ত অবস্থায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে বাসের হেলপার শাকিল ও ইয়াসিন মৃত্যুবরণ করেন। মোকদ্দমার বাদি সাতগ্রাম ইউনিয়ন শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় ইউপি সদস্য সোরহাব ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালে কোরবান, হানিফ, এনামুল ও লিটনকে আসামি করে মামলা করে। কিন্তু পুলিশ ওই এজাহারে আসামিদের নাম পাল্টে স্থানীয় বিএনপি নেতা আলমগীর, তার ভাই ইজ্জত আলী ও কামরুলকে আসামি করে এজাহার করে, যার প্রতিবাদে বাদি পুলিশ সুপারের কাছে দরখাস্ত ও সেশন জজ আদালতে এফিডেভিট করেও প্রকত আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট করাতে পারেননি। তাই আবার বলছি, সরকারি দল অপরাধ করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না বরং উল্টো বিরোধী দলের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। এ মামলাটি টেস্ট কেইস হিসেবে ধরলেই ‘দেশবাসী কেমন আছে? বোঝা যাবে।’

গোলাম মাওলা রনি (সরকারি দলীয় সাবেক এমপি) তার একটি লেখায় দেশবাসীর অবস্থা কেমন আছে তা দেখার জন্য পুলিশপ্রধানকে বোরকা পরে বেশি দূরে নয় শুধু রাজধানীতে বাসে বাসে ঘোরার পরামর্শ দিয়ে ছিলেন। বর্তমান পেক্ষাপটে ‘পুলিশ প্রধান’ একজন বিরাট ক্ষমতাশালী ব্যক্তি; যেহেতু আমরা এখন ‘পুলিশি রাষ্ট্রে’ বাস করছি। তাই পুলিশপ্রধানকে বোরকা পরার রনির পরামর্শের সাথে আমি একমত নই এ কারণে যে, পুরুষ হয়ে মহিলার বেশ ধারণ আমাদের দেশে নিন্দনীয়। তবে পুলিশপ্রধান যদি পাগলের ছদ্মবেশে দেশবাসীর কথা জানতে চান, তাহলে তা সহজে জানতে পারবেন।

কারাগারে বন্দীদের কী অবস্থায় কী কী মামলায় কিভাবে দীর্ঘ দিন আটক রেখেছেন; তাহলে তার উভয় কূলই রক্ষা পাবে; অর্থাৎ পুরুষ হয়ে মহিলার বেশ ধরতে হবে না; অন্য দিকে দেশবাসী কেমন আছে এবং দেশরক্ষকদের প্রতি সাধারণ মানুষের ধারণা কী তা সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন।
‘দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিএনপি নেতারা বিদেশে পাচার করেছে’Ñ এটাই সরকারের মন্ত্রী, এমপি, নেতাদের গলা ফাটানো দাবি। অথচ তারেক রহমানকে মানিলন্ডারিং মামলায় খালাস দেয়ার পর বিচারক মোতাহার হোসেনকে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। কিন্তু অর্থপাচার কি বন্ধ হয়েছে বা এর পরিমাণ কি কমেছে?

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) বিভিন্ন দেশ থেকে মুদ্রা পাচারের তথ্য প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে ২০১৩ সালে ৭৬ হাজার ৩৬১ কোটি ৪০ লাখ টাকা পাচার হয়েছে। পাচার হওয়া এই অর্থ আগের বছরের তুলনায় ৩৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেশি।

এ সরকারের আমলে কারা অর্থ পাচার করছে এবং কী পদ্ধতিতে করছে সরকার কি এর ব্যাখ্যা দেবেন?

দেখুন:

আরো সংবাদ