১৪ নভেম্বর ২০১৮

দুর্নীতিতে একাট্টা নগরকান্দা পৌর মেয়র ও সচিব

-

ফরিদপুরের নগরকান্দা পৌরসভায় দীর্ঘদিন যাবত ফ্রি ষ্টাইলে দুর্নীতির রামরাজত্ব চলছে। বিদেশী প্রকল্পের বিল উত্তোলন করে আত্মসাত, বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে বিলের টাকা তুলে আত্মসাত, হাটবাজারের সরকারী ভ্যাট, আয়কর ও অন্যান্য খাতের টাকা আত্মসাত সহ নানা উপায়ে চলছে দুর্নীতি। অভিযোগ রয়েছে, পৌর মেয়র ও সচিবের যোগসাজশে নানাভাবে কোটি কোটি আত্মসাত হচ্ছে। ক্ষমতাসীন মহলের ছত্রচ্ছায়ায় থাকায় তাদের এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ।
সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো প্রকল্পের মোটা অংকের ঠিকাদারের অজান্তেই ব্যাংক হিসাব থেকে উত্তোলন করার পর নগরকান্দা পৌর মেয়র ও সচিবের সমন্বিত দুর্নীতির বিষয়টি নজরে আসে। এব্যাপারে হাসিবুল হাসান নামে ফরিদপুরের একজন ঠিকাদার স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং দুদকের উপপরিচালকের নিকট তাদের দুর্নীতির ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। এসব অভিযোগ তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।
২০১৫ সালের ৬ মে নগরকান্দা পৌরসভার উপনির্বাচনে মেয়র হন নগরকান্দা পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি রায়হানউদ্দিন মিয়া ওরফে রব্বেল মাষ্টার। তিনি নগরকান্দা উপজেলা ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতিও। গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর নগরকান্দা পৌরসভায় সচিব পদে যোগ দেন আব্দুল আলীম মোল্যা। তিনি বাংলাদেশ পৌর কর্মকর্তা-কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিও। ক্ষমতাসীন প্রভাবশালী মহলের সাথে সখ্যতা থাকায় তাদের এসব দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাসিবুল হাসান অভিযোগ করেন, ৫ বছর মেয়াদী গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো প্রকল্পে তিনি ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে প্যাকেজ নং- আইইউআইডিপি/নগর:/০১/০১/২০১৬-১৭৪৮ এর চুক্তিমূল্য ৪৮ লাখ ৮ হাজার টাকায় একটি সড়ক নির্মাণ কাজ করেন। কিন্তু ওই প্রকল্পের প্রায় ৪০ লাখ টাকা তার অজান্তেই তুলে নিয়েছেন পৌর মেয়র ও সচিব।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সোনালী ব্যাংক- আইইউআইডিপি নগরকান্দা, পৌরসভার হিসাব নম্বর ২০২৬৩৩৩০০৯০১৩ এর হিসাব বিবরণী পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ওই হিসাব নম্বরে ২০১৭ সালের ২১ ডিসেম্বর ৭০ লাখ টাকা ও চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল ২৮ লাখ ৬২ হাজার ৫শ’ টাকা বাবদ মোট ৯৮ লাখ ৬২ হাজার ৫শ’ টাকা জমা হয়। আর এরমধ্যে ঠিকাদারী বিল বাবদ হাসিবুল হাসান গ্রহণ করেছেন ১৩ লাখ ৫ হাজার ৭৭২ টাকা এবং অন্য একজন ঠিকাদার ৩৮ লাখ ৩৮ হাজার ১৫৭ টাকা বাবদ মোট ৫১ লাখ ৪৩ হাজার ৯২৯ টাকা পেয়েছেন। বর্তমানে ওই ব্যাংক হিসাবে জমাকৃত স্থিতির পরিমাণ মাত্র ১ হাজার ৫৬৮ টাকা। বাদবাকি ৪৭ লাখ ১৮ হাজার ৫৭১ টাকা অভিযুক্তদের স্বাক্ষরে উত্তোলন করা হয়েছে। যদিও নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ ছাড়া উক্ত টাকা ব্যয় করার কোন বিধান নেই। আবার ঠিকাদারী কাজের বিল বাবদ উত্তোলনকৃত টাকা হতে ভ্যাট ও আয়কর বাবদ যে টাকা সরকারী কোষাগারে জমা দেয়ার বিধান রয়েছে, সেই টাকাও জমা দেয়া হয়নি।
নগরকান্দা পৌর মেয়র ও সচিবের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত অন্যান্য অভিযোগ হচ্ছে, ১৪২৫ বাংলা সনের হাট বাজার ইজারা বাবদ মোটা অংকের টাকা পাওয়া গেলেও ওই টাকার ১৫ পার্সেন্ট ভ্যাট ও ৭ পার্সেন্ট আয়কর মুক্তিযোদ্ধা তহবিলের ৪ পার্সেন্ট টাকা সরকারী কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাত করা হয়েছে। পৌর এলাকার যেকোন দলিল হলে নিয়মানুযায়ী ভূমি অফিস থেকে সেভেন এলআর এর একটি ফি পৌরসভার একাউন্টে জমা হয়। এই টাকাও আত্মসাত করা হয়েছে। সরকারী তহবিলে জমা না করে বিভিন্ন ভুয়া বিল ভাউচারের এসব টাকা ব্যয় দেখিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স বাবদ প্রাপ্ত টাকাও সঠিকভাবে জমা হয় না বলে অভিযোগ।
এছাড়াও এডিবির কাজে অনিয়ম সহ উন্নয়ন খাতের লাখ লাখ টাকা তসরুফের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের (এডিপি) গত বছরের ১৩ অগাষ্ট তারিখের ২৭ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারীর ১৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা, ৮ মার্চের ৫০ লাখ টাকা এবং ১০ এপ্রিলের ১৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা বরাদ্দ হলেও প্রথম বরাদ্দের ২৭ লাখ ৬৪ হাজার টাকা ব্যতিত বাদবাকি সকল বরাদ্দের টাকা নামমাত্র প্রকল্প দেখিয়ে তসরুফ করা হয়েছে। এর মধ্যে এডিবি থেকে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের (মেমো নম্বর-২১৬) উন্নয়ন মুলক কাজের কোন হদিসই নেই।
অভিযোগ রয়েছে, পৌর মেয়র ও সচিবের সমন্বিত দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে পৌরসভার নানান কর্মকান্ডে। পৌর সচিব আব্দুল আলীম মোল্যা ইতিপূর্বে মধুখালি পৌরসভায় কর্মরত থাকাকালীন দুর্নীতিতে অভিযুক্ত হন। এরপর তাকে শরিয়তপুর জেলার গোসাইর হাট পৌরসভায় বদলী করা হয়। সেখানেও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের মামলা হয়। সে মামলা এখনো চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে একের পর এক দুর্নীতিতে সিদ্ধহস্ত হলেও তিনি উপড়ের মহলের প্রভাব খাটিয়ে এখনো বহাল তবিয়তে দুর্নীতিতে লিপ্ত রয়েছেন। সম্প্রতি পৌর মেয়র তার বাড়িতে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন।
অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নগরকান্দা পৌর সচিব আব্দুল আলীম মোল্যা বলেন, ৪৮ লাখ টাকার এই কাজে ঠিকাদার প্রায় ২৮ লাখ টাকার কোন কাজ করেননি। ১৬ লাখ টাকার একটি আইটেমে তিনি টাচ্-ই করেননি। কাজ না করেই তিনি ফাইনাল বিল দাবি করেন? কাজই যদি না হয় তাহলে প্রকল্পের ব্যাংক হিসাব থেকে ফাইনাল বিলের টাকা কেনো তুললেন? এর কোন সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। তার বিরুদ্ধে আনীত ইতিপূর্বেকার দুর্নীতির ব্যাপারে জানতে চাইলে সেগুলোও সঠিক নয় দাবি করে এসব বিষয়ে নিউজ না করার জন্যও এই প্রতিবেদককে অনুরোধ জানান তিনি।
এব্যাপারে নগরকান্দা পৌর মেয়র রায়হান উদ্দিন মিয়ার সাথে যোগাযোগ করে ঠিকাদার হাসিবুল হাসানের অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রথমেই তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। কি অভিযোগ করেছে জানতে চেয়ে পাল্টা তিনি জানান, এসব অভিযোগ কোনটাই সঠিক নয়। ঠিকাদার আবোল-তাবোল বলছে। পরে অবশ্য তিনি পাল্টা ফোন করে জানান, টাকাটা সচিবের কাছে রয়েছে। কাজ করে নাই তাই ঠিকাদারকে টাকা দেয়া হয় নাই। টাকাটা রিটার্ন দেয়ার সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে। আর তার আমলে পৌরসভায় কোন দুর্নীতি হচ্ছে না বলেও তিনি জোর দাবি করেন। নিজের বাড়িতে বহুতল ভবন নির্মাণের ব্যাপারে তিনি বলেন, নিজের টাকাতেই একতলা বিল্ডিং তুলছি। চারতলা ফাউন্ডেশন রেখেছি। যদি ভবিষ্যতে কেউ বাড়াতে পারে বাড়াবে।


আরো সংবাদ