২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

কবরস্থানে মূর্তি রেখে লাশ দাফনে বাধা

-

নরসিংদীর পলাশে কবরস্থানের জমি নিয়ে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্ধের জেড়ে মৃত ব্যক্তির লাশ দাফনে বাধা প্রয়োগ করেছে একটি সংখ্যালঘু পরিবার। সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যরা কবরস্থানে মূর্তি রেখে লাশ দাফনে বাধা সৃষ্টি করে।

রোববার রাতে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার জিনারদী ইউনিয়নের গয়েষপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার জেড়ে ওই এলাকায় হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করে। পরে উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে মৃত ব্যক্তির লাশ দাফন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রোববার রাত আনুমানিক ৮ টার দিকে গয়েষপুর গ্রামের মসজিদের কবরস্থানে একই গ্রামের মৃত মোহাম্মদ আলীর লাশ দাফন করতে গেলে প্রশেন জিত, ডলি রানী দাস, দুধু দাস ও বিপ্লব কুমারসহ কয়েকজন এসে কবরস্থানের জমিকে তাদের জমি দাবি করে। পরে কবরস্থানে মূর্তি রেখে লাশ দাফন না করার জন্য বাধা প্রদান করে। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে হিন্দুদের সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজনের হাতাহাতির সৃষ্টি হয়।

গয়েষপুর মসজিদ কমিটির সভাপতি মো: মজিত মিয়া জানান, মসজিদের কবরস্থানের জন্য কয়েক বছর আগে আবদুল রহমান এ সম্পত্তি দান করেন। এরপর থেকে এখানে গয়েষপুর গ্রামে বসবাসকৃত বাসিন্দারা মারা গেলে তাদের লাশ এ কবরস্থানে দাফন করা হয়।

তিনি আরো জানান, এ কবরস্থানে পূর্বেও গ্রামবাসীর লাশ দাফন করা হয়েছে।

লাশ দাফনে বাধা দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ডলি রানী দাস বলেন, আমাদের সম্পত্তি অন্য কেউ এসে কবর স্থানের নামে দিয়ে দিলেই হবে নাকি। আমরা আমাদের সম্পত্তি রক্ষা করতে বাঁধা দিয়েছি।

পরে রোমেল, আলতাফ, বাবুল, দেলোয়ার ও ইদ্রিস আলীসহ কয়েকজন আমাদের বাড়িতে তাণ্ডব চালিয়ে সরস্বতী মূর্তি, বাড়ি-ঘর ও ঘরের বিভিন্ন জিনিস ভাংচুর করে। আমাদের মারধর করে। তাদেরকে বাঁধা দিতে গিয়ে আমার কলেজ পড়ুয়া ছোট বোন রিতু গুরুতর আহত হয়েছে।

তিনি আরো অভিযোগ করেন, আবদুল রহমান দীর্ঘদিন যাবত তাদের সম্পত্তি জোরপূর্বক ভোগ করে আসছে। এ নিয়ে আদালতে মামলা চলছে।

ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে পলাশ থানার ওসি (তদন্ত) গোলাম মোস্তফা জানান, লাশ দাফনের বাধা দেওয়ার খবর শুনে ঘটনাস্থলে পুলিশ যায়। তারা সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এছাড়া হামলার ঘটনায় অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে পলাশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ভাস্কর দেবনাথ বাপ্পি বলেন, কেউ মারা গেলে তার লাশ দাফন নিয়ে ঝগড়া খুবই দুঃখজনক। লাশ দাফনকে কেন্দ্র করে যেনো কোন রকম সংঘর্ষ না হয়, সে জন্য এ কবরস্থনেই তাদেরকে বুঝিয়ে লাশ দাফন করতে দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, যেহেতু আদালতে এই সম্পত্তি নিয়ে মামলা চলমান, তাই পরবর্তীতে আদালত থেকে রায় আসা পর্যন্ত এ কবরস্থানে আর কোনো লাশ দাফন না করতে নিষেধ করা হয়েছে।

 

আরো পড়ুন:  ২০ বছর ধরে স্বেচ্ছায় ট্রাফিকের কাজ করে যাচ্ছেন আজাহার

কাজী আনিছুর রহমান ও হারুন আল রশীদ হীরা, মান্দা (নওগাঁ) থেকে, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮


পরনে ট্রাফিক পুলিশের রঙচটা পুরনো পোশাক। মাথায় সেলাই করা ছেড়া ক্যাপ ও পায়ে ছেড়া জুতা। আর বগলে পল্লী বিদ্যুতের দুই হাত লম্বা মোটা তার। লিক লিকে গড়নের ৫৫ বছর বয়সী এ মানুষটির নাম আজাহার আলী মন্ডল। বাড়ি নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভালাইন ইউনিয়নের লক্ষ্মীরামপুর গ্রামে।

কথা বলে জানা যায়, আজাহার আলী মন্ডলের টানা-পোড়নের সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে-মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। তাদের আলাদা সংসারও আছে। জীবন জীবিকার তাগিদে এক সময় তিনি ঢাকায় রিকশা চালাতেন। প্রায় ১৬ বছর রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। এরপর এলাকায় চলে আসেন।


জেলার মহাদেবপুর উপজেলা প্রবেশ মুখে ব্রিজের ওপর একটি দুর্ঘটনায় মা-মেয়ে মারা যান। তার বিবেককে নাড়া দেয়। এরপর থেকে স্বেচ্ছায় প্রায় ২০ বছর ধরে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তিনি।

প্রথমে আজাহার আলী মহাদেবপুর উপজেলায় আট বছর ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করেন। পরে সেখান থেকে আজ অবধি জেলার মান্দা উপজেলার ফেরিঘাটে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রথম প্রথম তাকে কেউ মানতে চাইত না। তবে সময়ের প্রেক্ষিতে যখন যানজট বেড়ে যাচ্ছিল তখন সবাই তাকে মানতে শুরু করে। নিয়মমতো সবাই যানজটমুক্ত করে চলাচলের সুযোগ করে দেন। প্রতিদিন ফেরিঘাটে সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নিরলসভাবে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন আজাহার আলী।

স্বেচ্ছাসেবী আজাহার আলী বলেন, ১৯৯৫ সালে আনছার ভিডিপি থেকে প্রশিক্ষণ নেই। সেখানে ট্রফিকের কিছু কলাকৌশল শিখানো হয়েছিল। আর সে অভিজ্ঞতা থেকে ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছি। তবে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকা পালন করলেও মন্ত্রী স্যার (বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী মুহাম্মদ ইমাজ উদ্দিন প্রামানিক), ইউএনও অফিস, থানা ও সার্কেল স্যার আর্থিক কিছু সহযোগিতা করে থাকেন।

তিনি আরো বলেন, অর্থ সঙ্কটে চলি। গরিব মানুষ। পোশাক কিনতে পারি না। মন্ত্রী স্যার পোশাক কেনার জন্য টাকা দিয়েছিলেন। সে টাকা দিয়ে চাল-ডাল কিনে খেয়েছি। এছাড়া অ্যাকশিরা রোগে ভুগছি। ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কিছুটা বেগ পেতে হয়।

সিএনজি চালক ফজলুর এবং ভটভটি চেন মাস্টার জামিনুর রহমান বলেন, এ জায়গাটিতে বিশেষ করে সকাল ও বিকেলে বেশি যানজটের সষ্টি হয়। রাস্তা পারাপারে যে যার মতো করে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আজাহার আলী চাচা ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকা পালন করে সবাইকে শৃঙ্খলভাবে চলাচল করতে বলেন।

মান্দা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসএম হাবিবুল হাসান বলেন, আজাহার আলী একজন স্বেচ্ছাসেবক ট্রাফিক পুলিশ। সাদা মনের ওই মানুষটি বিনা পারিশ্রমিকে মান্দার ফেরিঘাট মোড়ে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সারাদিন ডিউটি করেন।

উপজেলায় যোগদানের পর তিনি আমার কাছে ছোট একটি আবদার নিয়ে আসেন। রোদ-বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পেতে একটি ছাতা পাওয়া যায় কিনা! শোনামাত্র তার ইচ্ছা পূরণ করেছি। উপহার সামান্য হলেও তার স্বেচ্ছাশ্রমের কাজের আগ্রহ অনেকগুণ বাড়িয়ে দিবে।

নওগাঁ সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (মান্দা সার্কেল) হাফিজুল ইসলাম বলেন, ফেরিঘাট একটি জনগুরুত্বপূর্ণ ও ব্যন্ততম জায়গা। আজাহার আলী স্বেচ্ছায় নিরলস শ্রম দিয়ে ট্রাফিকের যে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন সেটা নিঃসন্দেহ ভালো উদ্যোগ।

 


আরো সংবাদ