১৫ নভেম্বর ২০১৮

পাটের মূল্য প্রতিমণ ৩ হাজার টাকা চান কৃষকরা

-

ফরিদপুরের হাটবাজারে নতুন পাট উঠতে শুরু করেছে। বেশিরভাগ স্থানে এখনো চলছে পাট কেটে জাগ দেয়ার কাজ। কোথাও জলার অভাবে পাট জাগ দিতে সমস্যায় পড়ছেন কৃষকরা। অনেকে ক্ষেতের পাশে হাঁটুপানিতে পাট জাগ দিচ্ছেন। এই পাট মজার পর পরিষ্কার পানিতে নিয়ে ধুতে হবে। কোথাওবা বৃষ্টি ও মেঘলা আবহাওয়ার কারণে জাগ দেয়া পাট শুকাতেও সমস্যায় পড়ছেন অনেকে। এনিয়ে একপ্রকার ভোগান্তিতেই রয়েছেন চাষীরা। এই পাট বাজারে নিয়ে লাভের মুখ দেখবেন কিনা সেই দুশ্চিন্তাও তাড়া করে ফিরছে তাদের। যেভাবে মূল্য স্ফীতি বেড়েছে তাতে পাটের মণ ৩ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া জানান, গুণে ও মানে ফরিদপুরের পাট দেশ সেরা। সারাদেশের মধ্যে ফরিদপুর অঞ্চল এজন্য পাট উৎপাদনে খ্যাত। এ জেলার পাটের আঁশে বিশেষ ধরনের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। দেশীয় ও বিশ্ব বাজারে দিন দিন পাটের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সোনালী আঁশে ভরপুর, ভালবাসি ফরিদপুর’ এই শ্লোগানে কৃষি পণ্য পাটকেই সরকারিভাবে ফরিদপুর জেলার ব্র্যান্ড হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে।

কৃষি বিভাগ বলছে, এবছর ফরিদপুর জেলায় পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। পাটের উৎপাদন গত বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে এ জেলায় ৮৩ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে সেখানে আবাদ হয়েছে ৮৫ হাজারের হেক্টরেরও বেশি জমিতে। গত বছরের তুলনায় এ বছর আবাদ ভালো হয়েছে। গত বছর জেলায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮২ হাজার ৫০ হেক্টর। চাষ হয় ৮২ হাজার ৮৬৫ হেক্টর জমিতে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফরিদপুরের যেসব হাটে নতুন পাট উঠেছে সেখানে সর্বোচ্চ ভালো মানের পাট মণপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ২২শ’ থেকে ২৩শ’ টাকা দরে। তবে পাট চাষে জমি তৈরি থেকে পাট শুকানো পর্যন্ত নানা প্রক্রিয়ায় যে হারে খরচ হয়েছে তাতে অবশ্য এই দরে বিক্রি করেও খুশি নন কৃষকেরা। তারা বলছেন, পাট চাষে যে হারে খরচ বেড়েছে সেই হারে মিলছে না পাটের মূল্য। তার চেয়ে বরং সব্জি চাষেও লাভ বেশি। ২ হাজার থেকে ১৮শ’ টাকা দরেও অনেকে পাট বিক্রি করছেন। পাট বিক্রি করে তাই কৃষকেরই মুখে তৃপ্তির সেই হাসি নেই। পাট চাষ করে লাভের মুখ দেখছেন না তারা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এবার নিচু জমির তুলনায় উচু জমিতে পাটের ফলন ভাল হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি ও ঝড়ে অনেকস্থানে পাটের চারা গাছ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আবার নিচু জমিতে বৃষ্টির পানি জমে কোথাও পাট গাছে শেকড় গজিয়ে সোনালী আঁশ ক্ষত্রিগ্রস্থ হচ্ছে। দীর্ঘকাল যাবত পাট উৎপাদনের অভিজ্ঞতার কারণে ফরিদপুরের কৃষকদের মাঝে পাট চাষের প্রতি একপ্রকার দূর্বলতা রয়েছে। এখানকার বিস্তীর্ণ জমিতে পাট চাষ করা হয়। যে হারে বীজ, সার, মজুর ও অন্যান্য খরচ বেড়েছে সেই হারে পাটের দাম বাড়েনি বলে তাদের অভিমত। ন্যায্য মূল্য না পেলে তারা উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন। কৃষি বিভাগের লক্ষমাত্রার হিসাব নিয়েও তাদের সন্দেহ রয়েছে।

মধুখালীর মেগচামী ইউনিয়নের রাজিব হোসেন বলেন, তিনি এ বছর এক একর জমিতে পাট চাষ করেছেন। কিন্তু বৃষ্টির কারনে ৬০ শতাংশ জমির পাট তলিয়ে যায়। তিনি বলেন, এক পাখি তথা ২২ শতাংশ জমিতে পাট চাষ করতে তার খরচ হয়েছে ৬ হাজার ৮শ’ টাকা। সেখানে সর্বোচ্চ ফলন হলে পাবেন ৪ মণ পাট। তবে গড়পড়তায় ফলন হবে ৩ মণ। এখন যদি ২৩শ’ টাকা মণ দরে বিক্রি করেন তবে এক পাখিতে পাওয়া ৩ মণ পাট বিক্রি করে তিনি পাবেন ৬ হাজার ৯শ’ টাকা। এতো কষ্ট করে তাহলে তার লাভ কোথায় থাকলো?

একই গ্রামের ইছাক খন্দকার বলেন, এক পাখি জমিতে পাট চাষের যে খরচ হয় তাতে প্রথমেই জমি তৈরির জন্য চাষ দিতে ৫শ’ টাকা, বীজ ক্রয় করতে ১শ’ টাকা, সার কিনতে ৫শ’ টাকা, সেচ দিতে ৬শ’ টাকা, ক্ষেত নিরাতে প্রথম দফায় দুইজন শ্রমিকের মজুরি ৮শ’ টাকা, দ্বিতীয় নিরানিতে আবারও ৮শ’ টাকা, এরপর পাট কাটতে তিন জন শ্রমিকের মুজুরি ১৫শ’ টাকা, ক্ষেত থেকে পাট কেটে জাগ দেয়ার জন্য জলায় নিতে শ্রমিকের মজুরী ৫শ’ টাকা এবং সবশেষে সেই পাট পঁচার পর ধুয়ে রোদে শুকাতে তিনজন শ্রমিকের মজুরী ১৫শ’ টাকা খরচ হয়। এছাড়াও কৃষকের নিজেরও শ্রম দিতে হয়। এখন এতো পরিশ্রম ও টাকা খরচ করে পাট বিক্রি করে তিনি লাভ করবেন কিভাবে? পাটের দাম সর্বনি¤œ ৩ হাজার টাকা হলে তারা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন বলে জানান।

ইছাক খন্দকার বলেন, হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে পাট চাষ করতে হয়। ধান চাষের চেয়ে এতে কষ্ট বেশি। এতো পরিশ্রম করেও পাট চাষে খরচ তুলতে হিমসিম খাচ্ছে কৃষকেরা। তাদের দাবি পাটের মন ৩ হাজার টাকা ধার্য্য করা হোক। নাহলে কৃষকেরা আগামীতে পাট চাষের প্রতি আগ্রহ হারাবেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সরকার চাকরিজীবীদের বেতন বাড়াচ্ছে কিন্তু কৃষকদের লাভ বাড়াচ্ছে না। সরকারের কাছে আমাদের দাবি পাটের মূল্য যেন বৃদ্ধি করা হয়।

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কার্তিক চন্দ্র অবশ্য পাট আবাদে কৃষকের আগ্রহ বেড়েছে বলে জানান। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার খাদ্যদ্রব্যসহ বিভিন্ন পণ্যে পরিবেশবান্ধব পাটের মোড়ক ব্যবহার করায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে পাটের উৎপাদন ও বাজার দর। ফলে গত কয়েক বছর ধরে প্রান্তিক পর্যায়ের চাষিদেরও পাট চাষে আগ্রহ বাড়ছে। পাটের দামও সন্তোষজনক।

তিনি বলেন, এবছর পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় পাট গাছগুলো ভালো হয়েছে। ফরিদপুরে মূলত দুই জাতের পাট তোষা ও মেস্তা জাত আবাদ করে থাকে। এর মধ্যে তোষা জাতটি চাষিদের কাছে অধিক প্রিয়।


আরো সংবাদ