১২ ডিসেম্বর ২০১৮

ভারতে এসে আশাহত হিন্দুরা ফিরে যাচ্ছেন পাকিস্তানেই

ভারত
ভারতের অমৃতসরে ভিসা নবায়নে উল্লাস করছেন একদল পাকিস্তানী হিন্দু তীর্থযাত্রী - ছবি : বিবিসি

পাকিস্তানে অত্যাচার-বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন ভেবে যেসব হিন্দু ভারতে চলে এসেছিলেন, তাদের একটা অংশ আবারো ফিরে যেতে শুরু করেছেন।

এদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে আশায় থেকেও ভারতের নাগরিকত্ব পাচ্ছেন না তারা। তাই তারা আবারো ফিরতে শুরু করেছেন নিজের দেশে।

নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার ২০১৬ সালেই ঘোষণা করেছিল যে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে কোনো হিন্দু যদি ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হন, তাহলে তাদের স্বাগত জানাবে ভারত, দেবে নাগরিকত্ব।

কিন্তু পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দুদের একাংশের এখন মনে হচ্ছে যে ওই ঘোষণাই সার হয়েছে, নাগরিকত্ব দেয়া হচ্ছে না নানা অছিলায়।

পাকিস্তান থেকে হিন্দুদের ভারতে চলে আসা শুরু হয়েছিল ১৯৬৫-তে দুই দেশের যুদ্ধের পরেই। তারপরে আরও এক ঝাঁক হিন্দু ভারতে চলে এসেছিলেন ৭১-এর যুদ্ধের সময়, আর শেষবার বড় সংখ্যায় হিন্দুরা পাকিস্তান ছেড়ে আসেন ৯২-৯৩ সালে, অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরবর্তী সময়ে।

কিন্তু অন্য বছরগুলোতেও অল্প হলেও পাকিস্তান থেকে হিন্দুদের ভারতে চলে আসা বন্ধ হয়নি। এদের অভিযোগ, হিন্দু হওয়ার জন্যই পাকিস্তানে নিয়মিত অত্যাচারের সম্মুখীন হতেন তারা।

রাজস্থানের যোধপুর শহরের বাসিন্দা এক শ্রমিক মি. কিষান পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের সাঙ্ঘার জেলা থেকে ভারতে চলে এসেছেন ২০০০ সালে।

তিনি বলছিলেন, আমার বাবা-মা ভারত থেকেই পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। তাই ভারতকেই নিজের দেশ বলে মনে করি।

যোধপুর শহরেরই আরেক বাসিন্দা গোর্ধন ভীল পাকিস্তানের টান্ডো সুমরো থেকে ভারতে চলে এসেছেন ২০০১ সালে, কিন্তু এখনো নাগরিকত্ব পাননি তিনি।

মি. ভীলের কথায়, ‘ধর্মীয় নিপীড়নের কারণেই পরিবারসহ ভারতে চলে আসি। কিন্তু এত বছরেও ভারতের নাগরিকত্ব পেলাম না। দীর্ঘমেয়াদী ভিসা নিয়ে থাকতে হয় ভারতে।’

‘যোধপুর শহরের বাইরে বেরোতে পারি না। যেখানে ভাড়া থাকি, সেখানে বিদ্যুৎ, পানির ব্যবস্থা কিছুই নেই। ছেলেমেয়েদের স্কুল কলেজে ভর্তি করানোটাও সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এত দিন ধরে নাগরিকত্বের আবেদন করেছি, কিন্তু বারে বারে ঘোরানো হচ্ছে নানা যুক্তিতে।’

মি. ভীল বা মি. কিষানের মতো বহু মানুষ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও নাগরিকত্ব না পেয়ে তাদের কেউ কেউ আবার ফিরে যেতে শুরু করেছেন পাকিস্তানে।

সম্প্রতি রাজস্থান হাইকোর্টে দায়ের হওয়া এক জনস্বার্থ মামলায় হিন্দুদের পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার তথ্য জানিয়েছেন সেখানকার বিদেশী নাগরিক পঞ্জীকরণ অফিসার শ্বেতা ধনকার। তিনি বলেন, ২০১৫ থেকে ১৭ - এই সময়ের মধ্যে পাকিস্তান ফিরে গেছেন ৯৬৮ হিন্দু।

পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে আসা হিন্দুদের অধিকারের দাবি নিয়ে সীমান্ত লোক সংগঠন দীর্ঘদিন ধরেই সরব।

সংগঠনটির সভাপতি হিন্দু সিং সোধা বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ‘সেদেশে ধর্মের কারণে অত্যাচারিত হচ্ছিলেন, বৈষম্যের শিকার হচ্ছিলেন বলেই তো এই মানুষরা ভারতে চলে এসেছিলেন। কিন্তু এখানে যদি তারা স্বাগতই না হবেন, তাহলে তো তারা ফিরে যাবেনই।’

‘তারা তো দেখতে পাচ্ছেন যে সমস্যা শুধু পাকিস্তানে নয়, ভারতেও রয়েছে। তাই নিজের দেশে ফিরছেন তারা। শুধু যে নাগরিকত্ব না দিয়ে স্বাগত জানানো হচ্ছে না তা তো নয়। নানা সময়ে গোয়েন্দা থেকে শুরু করে নানা দফতর এদের রীতিমতো হেনস্থাও করছে।’

বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে ঘোষণা করেছিল যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান আফগানিস্তান থেকে অত্যাচারিত হয়ে যেসব সংখ্যালঘু মানুষ ভারতে চলে আসবেন, তাদের এদেশের নাগরিকত্ব দেয়া হবে।

কিন্তু মি. গোর্ধণ ভীল বলছেন, ‘২০০৯ সালে নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আবেদন করেছিলাম । গত মাসে একটা শিবির খুলে ১০৮ জনকে নাগরিকত্ব দেয়া হলো - যারা অনেক পরে এসেছে। কিন্ত আমার আবেদন এখনও ঝুলে রয়েছে। সরকার তো ঘোষণা করেছে নাগরিকত্ব দেয়ার ব্যাপারে, কিন্তু নিচের তলায় কর্মী অফিসাররা তো হেনস্থাই করছে শুধু।’

মি. হিন্দু সিং সোধা আরো জানাচ্ছিলেন, যেসব হিন্দু ভারত থেকে আবারো পাকিস্তানে ফেরত চলে গেছেন, তাদের সেখানে প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে যে ভারতে গিয়ে তোমরা কী পেলে!

নানা জায়গা থেকে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে মি. সোধা বলছিলেন যে, ভারত থেকে ফেরত যাওয়া হিন্দুদের অনেককেই ধর্ম পরিবর্তন করতে হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সরকারের ওপরে চাপ বাড়ানো কথা ভাবতে শুরু করেছেন পাকিস্তান থেকে চলে আসা হিন্দুরা। সূত্র: বিবিসি

আরো পড়ুন :
‘পাসপোর্ট পেতে হলে হিন্দু হয়ে যান’
বিবিসি, ২১ জুন ২০১৮
বিয়ের ১২ বছর পরে যে স্বামীর ধর্ম নিয়ে কোনো প্রশ্ন শুনতে হবে, এটা কল্পনাও করতে পারেন নি উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের বাসিন্দা তন্বী শেঠ।

মিসেস শেঠ টুইটারে অভিযোগ করেছেন যে লখনৌয়ের পাসপোর্ট সেবা কেন্দ্রে কর্মরত এক অফিসার সকলের সামনে তাকে প্রশ্ন করেছেন যে বিয়ের পরেও কেন নিজের পদবী পরিবর্তন করেননি তিনি।

স্বামীকেও ডেকে বলা হয় যে পাসপোর্ট নবায়ন করতে হলে তাকে হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে হবে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে ট্যাগ করে পাঁচ ভাগে পোস্ট করা টুইটে মিসেস শেঠ লিখেছেন, তিনি আনাস সিদ্দিকিকে ১২ বছর আগে বিয়ে করেছেন, তাদের বছর ছয়েকের এক সন্তানও আছে। কিন্তু ভারতের বেশিরভাগ নারীই যেমন বিয়ের পরে পদবী বদল করে স্বামীর পদবী রাখেন, সেটা তিনি করেন নি।

‘একজন মুসলিমকে বিয়ে করেও কেন পদবী বদল করি নি, সেই প্রশ্ন তুলে আমার পাসপোর্টের নবায়ন আটকে দেন বিকাশ মিশ্র নামের ওই অফিসার। সবার সামনে আমাকে অপমান তো করাই হয়, এমনকি আমার স্বামীকে ডেকে পাঠিয়ে বলা হয় যে হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করলে তবেই পাসপোর্ট নবায়ন করা হবে,’ লিখেছেন মিসেস শেঠ।

সুষমা স্বরাজকে উদ্দেশ্য করে তন্বী শেঠ লিখেছেন, ‘বিচারের প্রতি এবং আপনার প্রতি আমার গভীর আস্থা নিয়ে, একই সঙ্গে মনে প্রচণ্ড রাগ আর অনিশ্চয়তার মধ্যে এই টুইট করতে হচ্ছে আমাকে। বিকাশ মিশ্র নামের ওই পাসপোর্ট অফিসার প্রশ্ন তুলেছেন কেন আমি একজন মুসলমানকে বিয়ে করেছি, আর কেনই বা আমি বিয়ের পরে পদবী বদল করি নি। বিয়ের পর থেকে কোনও দিন এত অপমানিত হই নি।’

লখনৌয়ের রিজিওনাল পাসপোর্ট অফিসার পীযুষ ভার্মা বুধবারই সংবাদমাধ্যমের কাছে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছিলেন।

বৃহস্পতিবার সকালে ওই দম্পতিকে নিজের দপ্তরে ডেকে তাদের হাতে পাসপোর্ট তুলে দিয়েছেন তিনি।

মি. ভার্মা জানিয়েছেন, ‘পাসপোর্ট নবায়নের জন্য যে সব নথি ওরা জমা দিয়েছিলেন, তাতে কোনও অসঙ্গতি নেই। তাই নতুন পাসপোর্ট দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর যে অফিসার ওই দুর্ব্যবহার করেছিলেন, তাঁকে বদলি করে দেওয়া হয়েছে, সঙ্গে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছে।’

বিয়ের পরে নারীরা পদবী বদল করবেন কিনা, সেটা তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী পদবী বদল করতেই হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই ভারতে।

অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারীও আজকাল বিয়ের আগের পদবীই রেখে দেন, অনেকে আবার পুরনো পদবীর সঙ্গে স্বামীর পদবী - একসঙ্গে দুটিই ব্যবহার করেন।

আইন অনুযায়ী কোনও সরকারি কাজকর্মে বা নথিতে এই নিয়ে বাধ্যবাধকতা নেই।

তবে অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি কর্মকর্তারা বিয়ের রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট দেখতে চান, অথবা বলেন অ্যাফিডেফিট করিয়ে নিয়ে আসতে।


আরো সংবাদ