২৩ জুলাই ২০১৮

ডাক্তার না কসাই ?

ডাক্তার না কসাই - সংগৃহীত

কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে রোগীর নিকট থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ব্রাহ্মনবাড়ীয়া জেলার সরাইল উপজেলার রাজাপুর গ্রামের অসুস্থ মস্তু মিয়ার স্ত্রী হতদরিদ্র জহুরা খাতুন (৭০) অভিযোগ করে বলেন, ৪ জুলাই বুধবার সকালে বিভিন্ন লোকের নিকট থেকে সাহায্য তুলে ৮ শ টাকা নিয়ে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন চর্মরোগের চিকিৎসা নিতে।

হাসপাতালের কাউন্টার থেকে টিকেট কেটে তিনি চিকিৎসক (সেকমো) রাজেশ কান্তি দাসের নিকট গিয়ে রোগের বিস্তারিত বলার পর ওই চিকিৎসক ইনজেকশন দেয়ার কথা বলে বৃদ্ধার নিকট ৮ শ ৫০ টাকা দাবী করেন। ওই বৃদ্ধা অভিযোগ করে আরো বলেন, তিনি চিকিৎসক রাজেশকে বলেছিলেন, ‘বাবারে আমার কাছে ৮ শ টাকা আছে। এখনো কিছুই খাইনি। নাতিকে নিয়ে বাড়ী যাবো কিভাবে? ১শ টাকা কম নেন’।

এভাবে আকুতি মিনতি করে ডাক্তারকে বলার পরও ডাক্তার তার নিকট থেকে ৮ শ টাকা নিয়ে তাকে বাহিরে গিয়ে বসতে বলে। পরে তাঁকে কোন ইনজেকশন না দিয়ে ওই ডাক্তার হাসপাতাল থেকে চলে যায়। বহু খোঁজাখুজি করে ডাক্তার রাজেশকে হাসপাতালের কোথাও না পেয়ে ওই বৃদ্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরেক কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ মিজানুর রহমানের নিকট অভিযোগ করার পর চাপের মুখে চিকিৎসক (সেকমো) রাজেশ কান্তি দাস তার প্রতিবেশী ছোট ভাই সানীর (১৬) মাধ্যমে বৃদ্ধার ৮ শত টাকা ফেরৎ দেয়।

এ ব্যাপারে সেকমো রাজেশ কান্তি দাসের সাথে যোগাযোগ করা হলে বৃদ্ধাকে নিকট থেকে ইনজেকশন দেওয়ার কথা বলে ৮ শত টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ওই বৃদ্ধার টাকা ফেরতৎ দেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও প. প. কর্মকর্তা ডাঃ মুহাম্মদ মিজানুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, চর্মরোগের চিকিৎসক না হয়েও সেকমো রাজে কান্তি দাস ওই বৃদ্ধার চিকিৎসা করে ও ইনজেকশন দেওয়ার কথা বলে টাকা নিয়ে ভুল করেছে।

মৌখিক অভিযোগ পাওয়ার পর বৃদ্ধার টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কিশোরগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ হাবিবুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।


মহান চিকিৎসা পেশা : খন্ড চিত্র
ইব্রাহীম মন্ডল
চিকিৎসা একটি মহান পেশা। নিজেকে প্রকাশ করার এবং জীবনে বেঁচে থাকার অনেক পেশা আছে। সবচেয়ে মহান পেশা, উৎকৃষ্ট পেশা, চিকিৎসা সেবা। এই পেশায় মানুষের কাছে যাওয়া, তাদের সেবা করার সুযোগ আছে।

মানুষ যখন রোগাক্রান্ত হয়, মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করে, তখন চিকিৎসার মাধ্যমেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে চায়, আর তা চিকিৎসকের উছিলাই আরোগ্য হয়।

রোগগ্রস্ত অবস্থায় মানুষ অসহায় দুর্বল থাকে। এই দুর্বল সময় চিকিৎসকই তার বড় অবলম্বন, বড় বন্ধু, অসহায়ের সহায়। এজন্যই চিকিৎসা সেবা মহান পেশা হিসেবে গণ্য।

রোজ কিয়ামতের দিন আল্লাহ মানুষকে জিজ্ঞাসা করবেন, ‘‘হে আদম সন্তান! আমি অনাহারি ছিলাম, রোগগ্রস্ত ছিলাম তুমি আমাকে খাবার দাও নাই’’ সেবা করো নাই’’

মানুষ বলবে, ‘‘হে আল্লাহ একি বলছেন আপনি! আপনি কখন অনাহারি ছিলেন, রোগগ্রস্ত ছিলেন, যে আপনাকে খাওয়াব, সেবা করবো?

আল্লাহ বলবেন, ‘‘তোমাদের সামনে রোগ যন্ত্রণায় আদম সন্তান ছটফট করে নাই? না খেয়ে কষ্ট করে নাই? তখন যদি খাওয়াতে, সেবা করতে, তবেই আমাকে সেবা করা হতো, খাওয়ানো হতো, সুতরাং এই চিকিৎসা সেবার মাধ্যমে মানুষের সেবা করে ইহকাল এবং পরকালের অনন্ত জীবনের সফলতা সম্ভব।

সুতরাং অর্থ চিন্তার সাথে সেবার মানসিকতা যাদের আছে তাদেরকেই এই পেশায় আসা উচিত। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, বর্তমানে পত্র-পত্রিকায় চিকিৎসার ওপর যেসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে তা পড়ে গা শিউরে ওঠে। ঢাকা মেডিকেল কলেজে ইন্টার্নি ডাক্তার কর্তৃক অন্য ইন্টার্নি ডাক্তারকে ছাদ থেকে ফেলে খুন। ডাক্তারদের ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু। অপারেশন করেও রোগী সুস্থ হয়নি বরং অবস্থার অবনতি, অপারেশনের পর রোগীর পেটে গজ ব্যান্ডেজ এমনকি কাঁচি রেখেই সেলাই, রোগীর সাথে ডাক্তারের দুর্ব্যবহার, চড়-থাপ্পর মারা। রাজপথে রোগীর স্বজনদের সাথে এমনকি সংবাদ সংগ্রহের কারণে সাংবাদিকদের লাথি, ঘুষি, আমরা ইলেক্ট্রনিক প্রচার মাধ্যমে দেখেছি। সরকারি হাসপাতালে রোগীর সাথে ডাক্তারের খারাপ আচরণ তো আছেই।

গত ২৫-৯-১২ তারিখ আমার এক বন্ধু ঢাবির সহযোগী অধ্যাপক, যিনি ভারতের একটি হাসপাতালে তার স্ত্রীকে অপারেশন করিয়েছেন এবং বর্তমানে সুস্থ আছেন, তার সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘‘আমার স্ত্রীর ফুসফুসে পানি জমে, তার সুস্থতার জন্য কয়েকজন ডাক্তারের পরামর্শে রাজধানীর নামকরা একটি হাসপাতালে ভর্তি করাই যথারীতি অপারেশন হলেও সুস্থ হয়নি। এর মাঝে অপারেশন করতে বড় অংকের টাকা লেগে যায়। যা পরিশোধ করতে অনেক ধার-কর্জ করতে হয়েছে। গত এক বছরে আবার অর্থ সংগ্রহ করে স্ত্রীকে নিয়ে বোম্বের একটি মিশনারী হাসপাতালে যাই এবং দ্বিতীয়বার অপারেশন করাই।

দেখা গেছে ফুসফুসে যে পানি জমে ছিল, যার জন্য অপারেশন করানো হয়, সে পানি ঠিকই ছিল, তবে অপারেশন কি করা হয়েছে? এবং আগের অপারেশনের ব্যবস্থাপত্র সাথে নিয়ে যাই, ডাক্তাররা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। এত এন্টিবায়টিক, এত ওষুধ কেন সেবন করানো হল? যাক আল্লাহর রহমতে অল্প সময়েই অপারেশনের পর সুস্থ হয়ে দেশে ফিরি। তার মতে বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন ৫০ জন রোগী ভারতে ঐ হাসপাতালে যাচ্ছেন; আরও বিস্ময়কর ব্যাপার যে, যারা যাচ্ছেন তারা অধিকাংশই দেশে ভুল চিকিৎসায় কারো অপারেশন হয়েছে সুস্থ হননি এমন সব রোগী। এক সময় টিভি চ্যানেলে দেখা যায় ভারতের চিকিৎসার জন্য যেতে এ্যাম্বাসিতে ভিসার জন্য রোগীদের লাইন, সারারাত জেগে কেমন করে লাইনে শুয়ে আছে জটিল রোগীরা।

আমার এক আত্মীয়, কলেজ ছাত্র বাবা নেই। ছেলেটি পায়খানা করার সময় আরীশ বের হয়ে যায়, এই ব্যাধি নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত কষ্ট করছে। অর্থের জন্য চিকিৎসাও করাতে পারছে না। ছেলেটিকে তার মা আমার কাছে পাঠান। আমি এ বিষয়ে পিজির জনৈক ডাক্তারের সাথে কথা বলি, তিনি হাসপাতালে ভর্তি হতে বলেন। বলা হলো ২০ হাজার টাকা লাগবে। অনেক বলার পর ইয়াতিম ছেলেটির জন্য দুই হাজার কমে অপারেশনে রাজী হন অর্থাৎ ১৮ হাজার টাকায়। যথারীতি অপারেশনও হয়। কিন্তু দেখা গেল সমস্যাটি সারেনি। সাতদিন পর তার সাথে ছেলেটিসহ যোগাযোগ করলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, গিটটি ছুটে গেছে। এমন হওয়ার কথা ছিল না। যাক আবার অর্ধেক টাকা নিয়ে আসেন অপারেশন করে দেই। ছেলেটির মা আগের টাকাই পরিশোধ করতে পারে নাই এখন টাকা পাবে কোথায়। এখনো কষ্ট করছেন ছেলেটি।

আমার স্ত্রীর মেরুদন্ডে ব্যথা দুই বছর যাবত কষ্ট করছে। এ বিষয়ের ভাল ডাক্তারও দেখানো হয়েছে। ডাক্তার প্রথম ৩ মাসের ওষুধ, পরে একমাস ফিজিও থেরাপি ইত্যাদি করেও কোন উন্নতি হয়নি। আমার এক বন্ধু পিজির কর্মকর্তা তার মাধ্যমে পিজিতে ভর্তি করাই, আমার বিশ্বাস এখানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের এক্সপার্ট ডাক্তার। বন্ধুর বদৌলতে বিভাগের চেয়ারম্যান কয়েকজন ডাক্তারসহ দেখলেন এবং ভর্তি করালেন।

এমআরআইসহ অনেকগুলো টেস্টের পর ভাল করে দেখে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেন। যথারীতি অভিজ্ঞ ডাক্তার দীর্ঘ সময় যাবত অপারেশন করলেন। কিন্তু দেখা গেল, অপারেশনের ১৫ দিন পরও রোগী বেড থেকে পিঠ তুলতে পারছেন না। ডাক্তার এক্স-রে করে দেখলেন, মেরুদন্ডে যে দুটি জোড়া লাগানো হয়েছে তার একটি নড়ে গেছে এবং অপরটির স্ক্রু ঢিলা হয়ে গেছে। ব্যথাও কমছে না, ব্যথা হলেই ইনজেকশন আর এন্টিবায়টিক ওষুধ। অপারেশন সংশ্লিষ্ট ডাক্তার শেষ সিদ্ধান্ত জানালেন, দেড় মাস পর রোগী দাঁড়াতে পারবে।

বাসায় নিয়ে যান। অগত্যা নিরূপায় হয়ে ডাক্তারের কথা বিশ্বাস করে হেঁটে হাসপাতালে যাওয়া রোগীকে এ্যাম্বুলেন্সে করে বাসায় এনে স্টেচারে করে পাঁচতলার বেডে শোয়াই। এখন একমাত্র আল্লাহই জানেন কতদিনে উনি দাঁড়াতে পারবেন, অথবা আদৌ দাঁড়াতে পারবেন কি না।

ডাক্তারদের একটু অবহেলা একটু অসতর্কতায় পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়। আল্লাহর দেয়া সুন্দর জীবন বিষাদময় হয়ে যায়। এতটুকু আন্তরিকতা রোগীদের প্রতি নেই। এই হল আমাদের দেশের চিকিৎসা সেবার খন্ড চিত্র; ঢাকায় থেকে সচেতন মানুষ হয়েও হয়রানি ও সু-চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত, প্রত্যন্ত গ্রামের গরিব রোগীদের কি অবস্থা আল্লাহ জানেন।

আমার বন্ধুর ছেলে সলিমুল্লাহ মেডিকেলের ছাত্র সে বলছিল তাদের প্রথম ক্লাসে একজন শিক্ষক এবং আমার মেয়ের মেডিকেলে অরিয়েনটেশন ক্লাসে শিক্ষক বলেছিলেন তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা যে, ভাল ছাত্র ভাল রেজাল্ট করেও ভাল ডাক্তার হওয়া যায় না। ভাল ডাক্তার হতে হলে মানুষের প্রতি রোগীদের প্রতি আন্তরিক সেবার মনোভাব ও দরদ থাকতে হয়।’’

প্রতিবছর অসংখ্য মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি যুদ্ধে অংশ নেয় এবং একান্ত ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ভর্তির আসন এত কম হওয়ায় ভর্তি হতে পারেন না, তাদের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। আর অন্যদিকে ডাক্তারী পেশা নয় অন্য পেশার উপযুক্ত এমন ছাত্ররাও চান্স পেয়ে যায় এবং ডাক্তারী পড়া সমাপ্ত করতে সরকারের বা জনগণের ট্যাক্সের একটা বিরাট অংকের টাকা খরচ হয়। পাসের পর বাস্তব জীবনে দেখা যায় ভাল করছে না অন্য পেশায়ই ভাল করতো।

এসব দিকগুলো বিবেচনা করে আমার মনে হয় দেশের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ও দেশের প্রতি মানুষের প্রতি যারা আন্তরিক, যাদের সেবা করার একান্ত মানসিকতা আছে, শুধুমাত্র তারাই এই মহান পেশা চিকিৎসা সেবায় আসবেন। তবেই দেশ, জাতি তথা মানুষের কল্যাণ হবে। এটাই আমাদের কাম্য।


আরো সংবাদ