ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১২, ১১ ফাল্গুন ১৪১৮, ৩০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৩
  • হোম >
  • বিস্তারিত >
  • সাঈদীর বিরুদ্ধে যথাসময়ে সাক্ষী হাজিরে বারবার ব্যর্থ হচ্ছ...

প্রথম পাতা

যুদ্ধাপরাধ মামলা

সাঈদীর বিরুদ্ধে যথাসময়ে সাক্ষী হাজিরে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষ

মেহেদী হাসান

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে যথাসময়ে সাক্ষী হাজিরে বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। এ কারণে ট্রাইব্যুনাল তাদের বিরুদ্ধে সর্বশেষ পরপর দুইবার অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এর আগে জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযম, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে তারা যে চার্জশিট জমা দিয়েছিলেন তা যথাযথ না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল ফেরত দিয়ে আবার দাখিলের নির্দেশ দেন। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতা শাহরিয়ার কবির প্রসিকিউশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, চিফ প্রসিকিউটরের (গোলাম আরিফ টিপু) পদত্যাগ করা উচিত।
গত বছর ৭ ডিসেম্বর মামলার বাদি মাহবুবুল আলম হাওলাদার মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে আদালতে প্রথম সাক্ষ্য দেন। গত বৃহস্পতিবার ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষ ১৭ জন সাক্ষী মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে হাজির করে। তাদের জবানবন্দী ও জেরা শেষ হয়েছে। মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে শতাধিক সাক্ষীর নাম দেয়া হলেও তারা এ পর্যন্ত ১৭ জন সাক্ষীকেও নিয়মিত হাজির করতে পারেননি। একজনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হওয়ার পর তারা নতুন সাক্ষী আনতে পারেননি বেশ কয়েকবার। আদালতের কাছ থেকে সময় নিয়েও যথাসময়ে সাক্ষী হাজিরে ব্যর্থ হওয়ায় আদালত ক্ষুব্ধ হয়েছেন। মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী তাজুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, ১৭ জন সাক্ষী হাজির করতে তারা আটবার সিরিয়াল ভঙ্গ করেছেন। তালিকার ক্রমানুসারে সাক্ষী হাজির করতে পারেননি। ১৭ জনের মধ্যে কোনো কোনো সাক্ষীর নাম তালিকায় ৬০ এরও পরে রয়েছে।
তালিকার সিরিয়াল অনুযায়ী সাক্ষী হাজির না করা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা সাক্ষীর অসুস' থাকা, সঠিক সময়ে ঢাকা এসে পৌঁছতে না পারা কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন আদালতে। মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীরা এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আদালতে বলেছেন, তাদের অপ্রস'ত করার জন্য এবং তারা যাতে ঠিকমতো সাক্ষীকে জেরা করতে না পারেন সেজন্য ইচ্ছাকৃতভাবে সিরিয়াল ভঙ্গ করে তালিকার নিচের দিকের সাক্ষী হাজির করছেন। এতে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সাক্ষীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে রেডি করতে না পারার কারণে তারা এভাবে দেরি করছেন এবং সিরিয়াল ভঙ্গ করছেন বলে আদালতে বেশ কয়েকবার অভিযোগ করেন তাজুল ইসলাম।
গত ২৬ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সকালে আদালতে নতুন সাক্ষী হাজির করার কথা ছিল রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের। কিন' সকালে আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জানান, সকালে সাক্ষী পৌঁছেছে। আসতে একটু অসুবিধা হয়েছে। সাক্ষী দেয়ার জন্য এখনো তৈরি হতে পারেনি। ২টায় আমরা নতুন সাক্ষী আনতে পারব।
তখন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক ক্ষোভের সাথে বলেন, আপনাদের এটা একটি নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সাক্ষী নেই, জ্যামে পড়েছে, আসছে, আসবে অজুহাত দেখাচ্ছেন। সাক্ষী না থাকলে আমাদের তো করার কিছু নেই। আমরা হয় কোর্ট রুমে বসে থাকব না হয় চেম্বারে বসে থাকব।
২টার সময় তারা নিয়মিত কোনো সাক্ষী হাজিরের পরিবর্তে জব্দ তালিকার একজন সাক্ষী হাজির করেন। তিনি প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশে (পিআইবি) একজন ক্যাটালগার হিসেবে কর্মরত। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিআইবি থেকে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে কিছু পেপার জব্দ করেছেন। সেগুলো আদালতে উপস'াপন ও ওই পেপার যে তার কাছ থেকে জব্দ করা হয়েছিল এবং তার জিম্মায় রাখা হয়েছে সে মর্মে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য আনা হয় তাকে।
এর আগে গত ১৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার ১২টায় ১৪তম সাক্ষী আবদুল হালিম বাবুলের জবানবন্দী এবং জেরা শেষ হয়। এরপর সাক্ষী দেয়ার কথা ছিল মধুসূদন ঘরামীর। আদালত নতুন সাক্ষী হাজির করা বিষয়ে জানতে চান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের কাছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আদালতকে জানান, মধুসূদন ঘরামী অসুস'। আদালত তখন জানতে চান পরের দিন বুধবার ১৮ জানুয়ারি হাজির করা যাবে কি না। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ হায়দার আলী তখন বলেন, চেষ্টা করব হাজির করতে। না পারলে ক্ষমা করতে হবে আমাদের। কিন' পরের দিনও তারা সাক্ষী হাজির করতে না পারায় ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মাওলানা সাঈদীর বিচার মুলতবি করেন আদালত। ২৪ জানুয়ারি সকালে পুনরায় আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে তখনো রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে পারেনি। সেদিনও তারা জানান, ২টার সময় তারা সাক্ষী হাজির করতে পারবেন। কিন' ২টায়ও তারা যে সাক্ষী হাজির করার কথা বলেছিলেন তাকে হাজির না করে অন্য সাক্ষী হাজির করেন। আদালত কারণ জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আবারো সাক্ষীর অসুস'তার কথা জানান। তখন আদালত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাঝে মধ্যে আপনারা এমন করেন যাতে আমরা অসন্তোষ প্রকাশে বাধ্য হই। অন্য দিকে নির্ধারিত সাক্ষীর বদলে অন্য সাক্ষী হাজির করায় মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী তাজুল ইসলাম তীব্র প্রতিবাদ করেন। ওই দিন ২টায় যে সাক্ষী হাজির করা হয় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সরবরাহ করা ৬৮ জন সাক্ষীর তালিকায় তার নাম ছিল ৬২ নম্বরে। অন্য দিকে পরের দিন ২৫ জানুয়ারি যাকে হাজির করা হয় তার নাম ছিল ৬৬ নম্বরে।
সাক্ষীদের নিয়মিত হাজির করতে না পারার অভিযোগ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু বলেন, নিরাপত্তা, দূর পথ, গাড়ি না পাওয়া, বাড়ি ছেড়ে পাঁচ-সাত দিন ঢাকায় থাকা- এসব সমস্যায় যথাসময়ে সাক্ষী হাজিরে অসুবিধা হচ্ছে। আমরা আমাদের সাধ্য অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছি।
এত বিপুল সাক্ষীর মধ্য থেকে সাক্ষী হাজির করতে তো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এ কথার রেশ ধরে গোলাম আরিফ টিপু বলেন, এত সাক্ষী আনা হবে না। যে যে অভিযোগের সপক্ষে যে সাক্ষী দরকার হবে তাকে আনা হবে।
গোলাম আরিফ টিপু বলেন, আপনারা তো কোর্টে যান। আপনারা দেখেছেন বাদিপক্ষের সাক্ষী কত অল্প সময়ে জবানবন্দী দেন। কিন' এদের দীর্ঘ সময় নিয়ে জেরা করা হয়। সেটা লক্ষ্য করেন না কেন।
গোলাম আরিফ টিপুকে তখন প্রশ্ন করা হয় লম্বা সময় নিয়ে জেরা করায় তো আপনারা বেশি সময় পেলেন নতুন সাক্ষী আনার ক্ষেত্রে। জবাবে তিনি বলেন, আমরা তো জানি না তার জেরা কখন শেষ হবে।
এ দিকে গত বৃহস্পতিবার সিজার লিস্টের সাক্ষী হাজির করা এবং জব্দকৃত পেপার বিষয়ে তার সাক্ষ্য নেয়া নিয়ে মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীদের আপত্তির ফলে দীর্ঘ বিতর্ক চলে আদালতে।
মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীরা জানান, রাষ্ট্রপক্ষ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ৬৮ জন সাক্ষীর যে তালিকা দিয়েছে তাতে এ সাক্ষীর নাম নেই। তার নাম আছে অন্য একটি তালিকায় সিজার লিস্টে।
মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীরা আদালতে জানান, সাক্ষীদের জবানবন্দীসমেত রাষ্ট্রপক্ষ থেকে তাদেরকে প্রথমে দু’টি ভলিউম দেয়া হয়েছে। তাতে এক জায়গায় ৭০ জন, এক জায়গায় ৩০ জন এবং আরেক স'ানে ৩৮ জন সাক্ষীর তালিকা রয়েছে। ১৩৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ৭০ জন রয়েছেন জব্দ তালিকার। জব্দ তালিকার সংখ্যা বাদ দিলে নিয়মিত সাক্ষী থাকে ৬৮ জন। রাষ্ট্রপক্ষ থেকেও মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীদের ৬৮ জন সাক্ষীর একটি তালিকা দেয়া হয়েছিল সর্বশেষ। মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীরা এত দিন পর্যন্ত সাংবাদিকদের বলে আসছিলেন মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষীর সংখ্যা ৬৮ জন। কিন' গত বৃহস্পতিবার সাক্ষীর তালিকা নিয়ে বিতর্কের পর জানা যায় মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে সিজার লিস্ট মিলিয়ে সাক্ষীর সংখ্যা ১৩৮ জন। সাক্ষীর তালিকা নিয়ে বিভ্রান্তি বিষয়ে মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীরা আদালতকে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ ৬৮ জনের একটি ফাইনাল তালিকা দেয়ায় স্বাভাবিকভাবে তারা ধরে নিয়েছেন সাক্ষীর সংখ্যা ৬৮ জন। তারা ৬৮ জন সাক্ষীর বিষয়ে প্রস'তি নিয়ে আগাচ্ছেন। ট্রাইব্যুনাল মাওলানা সাঈদীর আইনজীবীদের বলেন, ৬৮ জনের তালিকা বাদ দিয়ে পূর্বের দু’টি ভলিউমের সাক্ষীদের সংখ্যা বিবেচনা করতে হবে। তাদের মধ্যে যাদের জবানবন্দী রয়েছে তাদের বিষয়ে আপনারা প্রস'তি নেবেন। এর বাইরে যদি অন্য কিছু হয় তাহলে সেটি আদালত বিবেচনা করবেন।
দু’টি ভলিউমের বাইরে কেন এবং কোন আইনে ৬৮ জন সাক্ষীর আরেকটি তালিকা আসামি পক্ষকে দেয়া হলো রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের কাছে তার জবাব চান আদালত। তখন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জেয়াদ আল মালুম বলেন, আমাদের ভুল হতে পারে। আমরা কখনো দাবি করিনি, আমরা ভুলের ঊর্ধ্বে। এটা নতুন কেস। আমরা কেউ জেনে আসিনি। আমরা জানাশোনার মধ্য দিয়ে শিখছি।

বিস্তারিত মন্তব্য

  • মু: বদরুল হক
    ২০১২-০১-২৮ ০৪:২৬:০৬

    আসলে সব কিছু দেখে শুনে মনে হচেছ, যেন এ অন্যায় অবিচারের আদালত ঘাদানিক নেতা শাহরিয়ারের ইচছামত চলছে, পিছন থেকে উনি সব কিছুর কলকাঠি নাড়ছেন ।

মন্তব্য করার জন্যে লগইন করুন

সকল সংবাদ