ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১২, ১১ ফাল্গুন ১৪১৮, ৩০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৩
  • হোম >
  • বিস্তারিত >
  • স-ম্ভিত দেশ ও জাতি

মুক্তকলম

সীমানে- নির্যাতন

স-ম্ভিত দেশ ও জাতি

ফিরোজ আহমেদ

ভারত সীমানে- কুড়িগ্রামের কিশোরী ফালানী হত্যা ও লাশ কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকার ছবিতে স-ম্ভিত হয়েছিল সারা জাতি, দংশিত হয়েছিল বিশ্ববিবেকের মন। ভারত সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ শীর্ষ ব্যক্তিরা সীমানে- আর হত্যা হবে না, এ রকম আশ্বাসবাণী একাধিকবার উচ্চারণের পরেও এই হত্যাকাণ্ড থেমে থাকেনি। সর্বশেষ ভারতীয় সীমান- বাহিনী বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশের এক নাগরিককে যে নৃশংস নির্যাতন করেছে, পশ্চিমবঙ্গের টিভি চ্যানেল এনডিটিভি তা সমপ্রচার করার পর সারা জাতি স-ম্ভিত ও বেদনাদগ্ধ হয়ে পড়েছে। এমনকি বিএসএফের দক্ষিণবঙ্গ সীমানে-র মহাপরিদর্শক টেলিফোনে বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ঘটনাটি অত্যন- ভয়াবহ আর লজ্জাকর, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।’
নির্যাতনের শিকার হাবিবুর রহমান ওরফে হাবু চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার সতেররশিয়া গ্রামের অধিবাসী। তাকে বিবস্ত্র করে যে রকম শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে তা আন-র্জাতিক মানবাধিকার সনদকে কাঁদাবে। গত ৯ ডিসেম্বর রাজশাহীর পবা উপজেলার খানপুর সীমান- দিয়ে দেশে ফেরার পথে মুর্শিদাবাদ জেলার রানীপুর ক্যাম্পের জওয়ানেরা তাকে আটক করে বিবস্ত্র করে সারা রাত নির্যাতন চালায়। জ্ঞান হারিয়ে ফেললে হাবিবুরকে পার্শ্ববর্তী সরিষা ক্ষেতে ফেলে রাখা হয়। পরদিন গরুর রাখালেরা তাকে উদ্ধার করে। গত ১৯ জানুয়ারি প্রকাশিত বাংলাদেশের পত্রপত্রিকার সংবাদে জানা গেছে, হাবিবুরের শরীরে এখনো নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন বিদ্যমান।
ভারতের একাধিক মানবাধিকার সংস'া এই নির্যাতনের ভিডিও ক্লিপসহ দেশটির রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিল ও প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংকে চিঠি পাঠিয়েছে। মানবাধিকার সংস'া মাসুম (মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ) পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, মুখ্যসচিব সমর ঘোষসহ স্বরাষ্ট্র সচিব এবং রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের কাছেও অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্যদের শাসি-র দাবি করে ই-মেইল পাঠিয়েছে। এসব চিঠি ও ই-মেইলে বলা হয়েছে, দেশের একজন নাগরিক অপরাধ করলে তাকে যদি পুলিশ গ্রেফতার করে, তাহলে এভাবে একজন মানুষকে নগ্ন করে পেটানোর পরেও কেন বিএসএফ সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়নি? অন্য দিকে রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের অ্যাকটিং চেয়ারম্যান বিচারপতি নারায়ণ শীল বলেছেন, ‘এখনো লিখিতভাবে কোনো অভিযোগ আমার দফতরে জমা পড়েনি।’ মানবাধিকার সংগঠন মাসুমের সেক্রেটারি কিরিটি রায় জানিয়েছেন, ‘এই ঘটনা শুধু রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী নয়, জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার বিষয়ক সেলের কাছেও পাঠানো হয়েছে। সেখানে ভিডিও ক্লিপ দেয়া হয়েছে। বিএসএফ একের পর এক নিরস্ত্র বাংলাদেশীদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে। এটা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং ভারতীয় সংবিধানপরিপন'ী। কিন' দুঃখজনক হলেও সত্য, বিএসএফের বিরুদ্ধে কোনো আইন প্রয়োগ হয় না। এ কারণে তারা যা ইচ্ছে, করে পার পেয়ে যাচ্ছে।’ বিএসএফের এই ঘটনা আসলে টাকা-পয়সা লেনদেনের কারণে হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন প্রখ্যাত লেখক ও কবি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। গত ১৮ জুন কলকাতা থেকে প্রকাশিত প্রায় সব বাংলা ও ইংরেজি কাগজে বিএসএফের এই নির্যাতনের খবর প্রকাশ হয়েছে। এই নির্যাতনের কাহিনী আমেরিকার গুয়ানতানামো বে কারাগারের লোমহর্ষক নির্যাতনকেও হার মানিয়েছে বলে কোনো কোনো পত্রিকা মত প্রকাশ করেছে। অধিকাংশ পত্রিকার দাবি, চাহিদামতো অবৈধ অর্থ না পেলে বিএসএফ বাংলাদেশের নাগরিকদের এ রকম নির্যাতন করছে। জানা গেছে, সেদিনের এই নির্যাতনের কাহিনীটি তোলা হয়েছে মোবাইল ফোনের ক্যামেরায়।
বাংলাদেশ একে তো ভারতের পানি আগ্রাসনে ধ্বংস প্রায়, তারপর যদি সীমানে- হত্যা ও নির্যাতন চলতে থাকে, তাহলে সেই বিপন্নতা রোধ হবে কিভাবে? বিএসএফের কথিত যুক্তি হচ্ছে, দুর্বৃত্তদের কবল থেকে আত্মরক্ষায় তাদের গুলি চালাতে হয়। আমাদের দেশে বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টার হত্যাকাণ্ডে ঘটনাস'লে অস্ত্র দেখানো হয়ে থাকে। কিন' বিএসএফের হত্যাকাণ্ডে এ রকম অস্ত্র পাওয়া গেছে, এমন কাহিনী শোনা যায়নি। নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সব সময় ‘গরু পাচারকারী’ বলে অভিহিত করে বিএসএফ। কিন' সীমান- এলাকার সাধারণ মানুষ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ‘ট্রিগার হ্যাপি’ কথাটি বাংলাদেশ-ভারত সীমানে-র মতো অন্য কোনো আন-র্জাতিক সীমানে- প্রযোজ্য কি না সন্দেহ।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দফতর অতীতের মতো প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছে। এটা কোনো কাজে আসবে কি না জানি না। যে সীমান- অতিক্রম করে একদিন মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে গিয়েছিলাম এবং অস্ত্র হাতে যে সীমান- অতিক্রম করে স্বদেশে প্রবেশ করেছিলাম, সেই সীমান- আজ বাংলাদেশের জনগণের জন্য মৃত্যু উপত্যকা। একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে এটি মেনে নেয়া কষ্টকর। রাজনীতির ঊর্ধ্বে, দল পরিচয়ের বাইরে বাংলাদেশের জনগণকে আজ সীমান- হত্যা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। আমরা সীমানে- আর কোনো মৃত্যু ও রক্তক্ষরণ চাই না।
লেখক : আইনজীবী, খুলনা

বিস্তারিত মন্তব্য

মন্তব্য করার জন্যে লগইন করুন

সকল সংবাদ