ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১২, ১১ ফাল্গুন ১৪১৮, ৩০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৩
  • হোম >
  • বিস্তারিত >
  • মার্কিন বৈদেশিক নীতিতে এশিয়া-প্যাসিফিক

উপ-সম্পাদকীয়

মার্কিন বৈদেশিক নীতিতে এশিয়া-প্যাসিফিক

মার্কিন বৈদেশিক নীতিতে এশিয়া-প্যাসিফিক

অন্তর্দর্শন

॥ এম. আবদুল হাফিজ ॥

আন্তর্জাতিকতার কেন্দ্রবিন্দুতে এশিয়ার প্রত্যাবর্তন একুশ শতকের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিবিন্যাস। ১৭৫০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের তিন ভাগ এশিয়ায় বাস করত এবং উৎপন্ন দ্রব্যেরও একই অনুপাত ছিল মহাদেশটির ক্ষেত্রে। ১৯০০ সাল নাগাদ ইউরোপ ও আমেরিকায় শিল্প বিপ্লব ঘটার পর বৈশ্বিক উৎপাদনে এশিয়ার অংশ মাত্র এক-পঞ্চমাংশে সঙ্কুচিত হয়ে আসে। কিন' ২০৫০ সাল নাগাদ এশিয়া আবার তার তিন শ’ বছর আগের অবস'ানে ফিরে আসবে। কিন' আত্মপ্রসাদে বিভোর পরাশক্তি আমেরিকা এমন ক্ষমতাচক্র সম্পর্কে সতর্ক না হয়ে একুশ শতকের প্রথম দশকজুড়ে ইরাক ও আফগানিস্তানে যুদ্ধে লিপ্ত থেকে অপচয় করেছে। অবশ্য এত দিনে সম্বিত ফিরে পাওয়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন সমপ্রতি তার এক বক্তব্যে বলেছেন, মার্কিন বৈদেশিক নীতির কীলক (পিভোট) এবার পূর্ব এশিয়ার দিকে ঘোরানো হবে।
উত্তর অস্ট্রেলিয়ার এক সামরিক ঘাঁটিতে দুই হাজার ৫০০ মার্কিন নৌ-সৈনিকের আবর্তনসংক্রান্ত বারাক ওবামার সামপ্রতিক সিদ্ধান্ত সেই কীলক ঘোরানোর পূর্বাভাস। এ ছাড়াও নভেম্বরে ওবামার নিজ অঙ্গরাজ্য হাওয়াইয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সম্মেলন সূচনা এবং উৎসাহিত করেছে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, যাকে বলা হয়েছে ‘ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ’। উভয় ঘটনাই এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতি ওবামার সঙ্কেতকে জোরালো করে; যুক্তরাষ্ট্রের অভিপ্রায় এই অঞ্চলকে ঘনিষ্ঠভাবে অঙ্গীভূত করে রাখা।
মার্কিনিদের ভরকেন্দ্র এশিয়ায় স'ানান্তরিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল তাদের কাছে গুরুত্ব হারিয়েছে; বরং সেগুলো, বিশেষ করে ইউরোপ যার অর্থনীতি চীনের অর্থনীতির চেয়ে বৃহত্তর ও ঐশ্বর্যপূর্ণ, সেখানে তাদের আগ্রহ থাকবেই। ওবামার জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টার সামপ্রতিক ব্যাখ্যায় মার্কিন বৈদেশিক নীতি বিগত ক’বছরে ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ, সন্ত্রাসের দুশ্চিন্তা, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক শক্তি বিস্তার এবং সামপ্রতিক আরব বসন্তের মধ্য দিয়ে বেশ মুষ্টাঘাত খেয়েছে। এশিয়ায় ওবামার নভেম্বরের সফর মার্কিন বৈদেশিক নীতিকে একই সরল রেখায় বিন্যাস করার একটি প্রচেষ্টা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির নতুন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা টম ডনিলনসের ভাষায় এই প্রাণবন্ত এশিয়া অঞ্চলকে আমাদের কৌশলগত অগ্রাধিকারের মাপকাঠিতে একটি উন্নত অবস'ানে এনে ওবামা রাষ্ট্রীয় পোতকে চলমান সঙ্কটের ঘূর্ণাবর্ত থেকে বাঁচিয়ে রাখছেন। ওবামা প্রশাসন আরো ঘোষণা করেছেন, প্রতিরক্ষা বাজেটের বিতর্কে যা-ই ফলাফল হোক না কেন আমরা এ কথা নিশ্চিত করতে চাই, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলকে ধরে রাখতে আমাদের যে পরিমাণ শক্তি সঞ্চয় ও সংরক্ষণের প্রয়োজন, তা আমরা যেকোনো উপায়ে অর্জন করবই।
ওবামার নভেম্বর মাসের সফর চীনের জন্য একটি বার্তা বহন করেছিল। ২০০৮ সালের মন্দার পর চীনারা ভ্রান্ত বিশ্বাস পোষণ করেছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি অটুট থাকলেও অন্তত প্রান্তিক পর্যায়ে ক্ষয়প্রাপ্ত এবং এটাই চীনের জন্য নিজের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার সময়। বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সমুদ্রে তার সামুদ্রিক বাণিজ্যসংক্রান্ত দাবি বাস্তবায়নের সুবর্ণ সুযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা তেমনটি করার আগে চীনেরই সুযোগ গ্রহণ করার কথা।
ওবামার প্রেসিডেন্সির প্রথম বছরে তার প্রশাসন চীনের সাথে সহযোগিতার একটি উদ্যোগও নিয়েছিল। কিন' চীনা নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের এমন নীতিতে দেশটির দুর্বলতা ভেবেছিল। পরে মার্কিন প্রশাসন চীনের প্রতি কঠোর নীতি গ্রহণ করে, যখন হিলারি ক্লিনটন ২০১০ সালের জুলাই মাসে দক্ষিণ চীন সমুদ্রের বিষয়টি অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ ইস্ট এশিয়ান নেশনসে উত্থাপন করেন হ্যানয় সম্মেলনে। চীনা প্রেসিডেন্ট হু জিনতাওয়ের ওয়াশিংটনে ২০১১ সালের সরকারি সফর সফল হয়। তবুও চীনা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটন চীনকে পরিবেষ্টনে (কনটেইনমেন্ট) সচেষ্ট, ওরা তাদের দেশের শান্তিপূর্ণ উত্থানকে ব্যবহৃত করতে চায়।
একটি অনুমিত মার্কিন পরিবেষ্টন নীতি সম্পর্কে চীনের উদ্বেগ আবার বেড়েছে, যেহেতু হিলারি ক্লিনটন আগামী বছরে ম্যানিলায় অনুষ্ঠিতব্য পূর্ব এশিয়ার শীর্ষ সম্মেলনে অ্যাজেন্ডায় প্রতিবেশীদের সাথে চীনের সমুদ্রসীমা বিবাদ অন্তর্ভুক্ত করতে বদ্ধপরিকর। ওই সম্মেলনে ওবামা এবং হু জিনতাওসহ ওই অঞ্চলের সব নেতাই উপসি'ত থাকবেন। যদি দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে সৃষ্ট কলহের বিষয় উত্থিত হয়, চীনের একার পক্ষে তা সামলানো দুরূহ হবে। তবে চীনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র পরিবেষ্টন নীতি বহাল রাখলেও স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের সোভিয়েত শিবিরকে পরিবেষ্টন করার নীতি থেকে তা আলাদা। যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সামান্যই বাণিজ্যিক ও সামাজিক সম্পর্ক ছিল। কিন' চীনের বেলায় তা অনেকটা ভিন্ন প্রকৃতির। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের জন্য বহির্বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র বৃহত্তম বাজার। মার্কিনিরাই ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশনে ডব্লিউটিও চীনের প্রবেশ সম্ভব করেছে।
এখানেই শেষ নয়। মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতি বছরে এক লাখ ২৫ হাজার চীনা ছাত্রের জন্য তাদের দরজা খুলে রেখেছে। পেন্টাগনের ইস্ট-এশিয়া স্ট্র্যাটেজি রিভিউ ১৯৯৫ সাল থেকে মার্কিন নীতি নির্ধারণ করে এসেছে। সেই কৌশলপত্রই চীনকে আন্তর্জাতিক ব্যবস'ার সাথে চীনের একীভূত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। চীনাদের সাথে মার্কিনিদের সম্পর্কের এই উষ্ণতা এখন অনেকটা প্রশমিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একই সাথে জাপানপ্রীতির কারণে। কিন' এটাকে ‘চীন পরিবেষ্টন’ বলা যায় না।
মার্কিন সেনাবাহিনীও চীনকে স্নায়ুযুদ্ধের আদলে পরিবেষ্টন করতে অনিচ্ছুক। কিন' তারা একটি পারিপার্শ্বিকতা রচনা করতে পারে, যার মধ্য থেকে ভবিষ্যতের চীনা নেতৃত্ব বাছাই করতে পারে তাদের পথ। চীন যদি কখনো এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে তর্জনগর্জনের কর্তৃত্ব হাতে নিতে চায়, সে অবস'ায় এ অঞ্চলের অপরাপর দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নিয়ে চীনকে মোকাবেলা করবে। সে পরিসি'তির দুর্ভাবনায় চীনের বেশ ক’টি প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের বন্ধন সুদৃঢ় করেছে ২০০৮ সাল থেকেই। উল্লেখ্য, ওই সময় থেকেই চীনের বৈদেশিক নীতি স্পষ্টত দৃঢ়তাসূচক ভঙ্গি ধারণ করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র কিছুতেই এশিয়ায় আর একটি স্নায়ুযুদ্ধের আবহ চাইবে না।
দুই পক্ষের প্রতিযোগিতামূলক অবস'ান যা-ই হোক না কেন- বাণিজ্য, আর্থিক সি'তিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ইস্যুগুলোতে চীন-মার্কিন সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে এবং তা উভয় দেশকেই ফায়দা দেবে। ওই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোও একই সহযোগিতা থেকে উপকৃত হবে। ওবামা প্রশাসনের কীলক হেতু গতিপথ আলোচ্য অঞ্চলে শক্তিমত্তার দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে এবং এই শক্তিমত্তার স্বীকৃতি নিশ্চিত করে একটি বহুল প্রচলিত চীন পরিবেষ্টনের ধারণাকে বাতিল করে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার এবং
নিরাপত্তা, রাজনীতি, বৈদেশিক নীতি
ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

বিস্তারিত মন্তব্য

মন্তব্য করার জন্যে লগইন করুন

সকল সংবাদ