Naya Diganta

ডুবন্ত ফারমার্স ব্যাংককে ১১ শ’ কোটি টাকা জোগানের নীতিগত সিদ্ধান্ত

আশরাফুল ইসলাম

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,বুধবার, ০৮:৫৩


১১ শ’ কোটি টাকা জোগানের নীতিগত সিদ্ধান্ত

১১ শ’ কোটি টাকা জোগানের নীতিগত সিদ্ধান্ত

নানা অনিয়মে ডুবতে থাকা নতুন প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংকের বিপর্যয় কাটাতে এবার ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার তহবিল জোগান দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কী প্রক্রিয়ায় এ তহবিল জোগান দেয়া হবে তার রূপরেখা তৈরি করা হবে। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবিরের সাথে ৫ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।

কার্যক্রম শুরু করার চার বছরে ব্যাপক অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ দেয়ার পর এখন অনেকটা ডুবতে বসেছে ফারমার্স ব্যাংক। অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ দেয়ার চিত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে বেরিয়ে আসে। এর ফলে ব্যাংকটির তীব্র তারল্য সঙ্কট দেখা দেয়। গ্রাহকদের টাকা দিতে পারছে না ব্যাংকটি। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির এমডিকে অপসারণ করে। একই সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। কিন্তু এতেও তারল্য সঙ্কট কাটছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে বাধ্যতামূলক নগদ জমা (সিআরআর) রাখতে পারছে না তারা।

এ দিকে গ্রাহকের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে না পারায় সাধারণ গ্রাহকের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারি, বেসরকারি কোনো গ্রাহকের অর্থই ফেরত দিতে পারছে না ব্যাংকটি। সর্বশেষ গত ২২ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ফারমার্স ব্যাংকের ঢাকার বিভিন্ন শাখা জলবায়ু পরিবর্তন ফান্ডের মোট ৫০৮ কোটি ১৩ লাখ ২৯ হাজার টাকা ফেরত দিচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শরণাপন্ন হয়েছে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে বিআইডব্লিউটিএ।

গত এক বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে নগদ জমা (সিআরআর) রাখতে পারছে না ফারমার্স ব্যাংক। ক্রমাগতভাবে সিআরআর ঘাটতির ফলে ইতোমধ্যে ব্যাংকটির সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জরিমানার আদেশ দেয়া হয়েছে, যার ৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ফারমার্স ব্যাংকের বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২০১৩ সালের ৩ জুন ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই ঋণ নিয়মাচার পরিপালনে এবং ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় শিথিলতা দেখা দেয়। ফলে ব্যাংকটিতে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম সংঘটিত হতে থাকে। মোটা দাগে ১৩টি বিশেষ অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে ব্যাংকের নিজস্ব ঋণ নীতিমালা অনুসরণ না করে গ্রাহকদের ঋণসুবিধা প্রদান করা হয়েছে। ঋণের অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত না করে গ্রাহকদের উদ্দেশ্যবহির্ভূত খাতে অর্থ স্থানান্তরের পরোক্ষ সহায়তা করা হয় ব্যাংক থেকে। অস্তিত্ববিহীন ও সাইনবোর্ডসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়। ঋণ নিয়মাচার লঙ্ঘন করে ব্যাংকের পরিচালকসহ অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ প্রদান করা হয়। অপর্যাপ্ত ও ত্রুটিপূর্ণ জামানতের বিপরীতে ঋণ প্রদান ও খেলাপি গ্রাহকের বিপরীতে ঋণ প্রদান করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক বছর ধরে ফারমার্স ব্যাংক তীব্র তারল্য সঙ্কট রয়েছে। বর্তমানে এ সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে। ব্যাংকের মূল তারল্য পরিমাপক সূচক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত নগদ জমা (সিআরআর) সংরক্ষণে ব্যাংকটি ক্রমাগতভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। গত এপ্রিল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ব্যাংকটি একটানা সিআরআর সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে। এ ছাড়াও, গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ব্যাংকটি বেশ কয়েকদিন এসএলআর সংরক্ষণেও ব্যর্থ হয়েছে। ভবিষ্যতে এ সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করার আশঙ্কা করছে স্বয়ং বাংলাদেশ ব্যাংক।

ব্যাংকটির পরিচালনায় যথাযথ নিয়মাচার অনুসরণ না করায় আয়ের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গত বছরের জুনের পর হতে কেবল ডিসেম্বর ত্রৈমাসিক ছাড়া ব্যাংকটি ক্রমাগত লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে। গত জুন প্রান্তিকে ব্যাংকটির নিট লোকসানের পরিমাণ ছিল ১৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। এ ছাড়া ব্যাংকটির মোট ৫৪টি শাখার মধ্যে ২৮টিই লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, নিয়মের বাইরে বেশি ঋণ দিয়ে এসব ঋণ আদায় করতে না পেরে ব্যাংকটিতে বড় ধরনের তারল্য সঙ্কট তৈরি হয়েছে। তার ওপর, এখন আর আমানত সংগ্রহে সাড়া পাচ্ছে না ফারমার্স ব্যাংক। সাধারণ গ্রাহক আমানত তুলতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন।

এখন ব্যাংকটি চূড়ান্ত বিপর্যয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। এমনি পরিস্থিতিতে ডুবন্ত ফারমার্স ব্যাংককে জাগাতে মূলধন জোগান দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারি ব্যাংকগুলো। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে এ সংক্রান্ত বৈঠকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব ইউনুসুর রহমান, মূলধন জোগানে নির্দেশিত প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি), রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, রূপালী, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংকের পর্ষদ চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে আইসিবির চেয়ারম্যান মজিব উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ফারমার্স ব্যাংককে কিভাবে সহায়তা করা যায় সে বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা কিভাবে অংশগ্রহণ করতে পারি কেবল সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, ফারমার্স ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন দেড় হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিশোধিত মূলধন রয়েছে ৪০০ কোটি টাকা। বাকি ১ হাজার ১ শ’ কোটি টাকা জোগান দেয়ার জন্য সরকারের ইঙ্গিত রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গতকালের বৈঠকে রাষ্ট্রায়ত্ত ৫টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কী প্রক্রিয়ায় এ তহবিলের জোগান দেয়া হবে সে বিষয়ে একটি রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে।

Logo

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,    
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫