Naya Diganta

ধলেশ্বরীর পাড়ে

দিল আফরোজ রিমা

১১ জানুয়ারি ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ১৫:৪৯


সারা দিন মাছের ঝাঁকা মাথায় নিয়ে বাড়ি বাড়ি মাছ বিক্রি করে মাত্রই ঘরে ফিরেছে লক্ষী। এমন সময় উঠানে কিসের যেন হট্টগোল শোনা যায়। জেলে পাড়ারই কয়েকজন কিশোর লক্ষীর উঠানে এসে দাঁড়াল। একজনের কোলে একটি বাচ্চা, লক্ষী এগিয়ে যায়। এগিয়ে দেখে বাচ্চাটি তার নিজের তিন বৎসরের ছেলে। লক্ষী জানতে চায়- কিরে গোবিন্দ আমার রামের কি অইছে? তোর হাতের ওপর বাছা আমার নেতাইয়া পইড়া আছে, কিরে কথা কস না ক্যান, কী অইছে।

গোবিন্দ ভয়ে ভয়ে বলে- চাচীগো রামরে বুঝি আর বাঁচানো গেল না। আমি তো খেয়া পাড়ে ব্যস্ত আছিলাম। একবার নৌকা পাড়ে নৌকা ভিড়ানোর সময় মনে অইল পানিতে কিছু একটা লাফালাফি করতাছে। বেশি পানি না, খেয়াল কইরা দেখলাম ছোট পোলাপাইনের মতো মনে অয়। আমি নৌকায় একজনেরে ডাইকা লই। তারপর নিজে পানিতে নাইমা বাচ্চাডারে তুলবার চেষ্টা করি, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দূর ভাইসা গেছে। তখন আমার লগে আরো দুই তিন জন ডাইকা লইলাম। অনেকক্ষণ ধইরা খুঁজাখুঁজি করি। হেরপর হঠাৎ আমার পায়ের কাছে কিছু আন্দাজ করি। তুইলা দেখি ও আর কেউ না, তোমার রাম। ওর বুকের মধ্যে কান লাগাইয়া দেখলাম কোনো শব্দ নাই।
লক্ষী ছেলেকে বুকের মধ্যে ঝাপটে ধরে। বাচ্চাটি সত্যিই বেঁচে নেই। প্রচুর পানি পেটে ঢুকেছে। অনেক্ষণ পানির মধ্যে থাকায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছে। লক্ষীর আত্মচিৎকার ছড়িয়ে পড়ে সারা পাড়ায়। দিনের প্রায় শেষ, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। জেলে পাড়ার বাড়িতে বাড়িতে আলতো আলোর প্রদীপ জ্বলছে। ভেসে আসছে তুলসী তলার সাখের ধ্বনি। এমনি সময়ে ছোট্ট রামকে চিতায় নিয়ে যাওয়া হলো। খানিকটা দূরে গ্রামের মেঠো পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিল প্রাইমারি স্কুলের এক মাস্টার ঘনশ্যাম। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখে তিনি মনে মনে ভাবেন, জেলে পাড়ায় বুঝি আবার কেউ মারা গেল। দেখি একটু গিয়ে। ঘনশ্যাম মাস্টার কিছু পথ হেঁটে ওখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন- কে মারা গেল রে সোনাই?
সোনাই চোখের জলে ভেসে জবাব দেয়- মোস্টার মশাই আমার কপাল পুইড়েছে গো, আমার ব্যাটা আইজ পানিতে ডুইবা মরল। তারেই জ্বালাইয়া দিলাম।
মাস্টার মশাই দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলেন- আফছোস করিস না সোনাই সবই তার ইচ্ছে। নদীর পাড়ের মানুষগুলোর কাছে নদীটা অনেক পরিচিত। ছোট শিশু নদীর কূলে কাদামাটি মেখে খেলাধুলা করে বড় হয়। ছোট বেলা থেকে নদীর সাথে তাদের ভাব হয়ে যায়। শিশুরা সাঁতার কেটে নদীর এপার ওপার যেতে পারে। তাই নদী নিয়ে কারো মনে তেমন ভয় নেই। তবে এর মধ্যে এই নদীর বুকে কত ছোট্ট শিশু কত বৃদ্ধ নারী প্রাণ দিয়েছে তার হিসাব কে রেখেছে বল। নদীর শান্ত অবস্থায়ই এসব ঘটনা ঘটে থাকে। আর নদী যখন বর্ষার ডাকে ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সব কিছু, সে কথাতো বলাই বাহুল্য। তাই আমরা নদী পাড়ের মানুষ হলেও অন্তত বাচ্চাদের একটু সাবধান রাখা দরকার।
গোবিন্দের মনটা ভালো নেই। সারাদিন খেয়া বেয়ে রাতের বেলা বড়ি ফিরে কারো কান্নার শব্দ শুনতে পায়। শব্দটা তার ভীষণ পরিচিত তাই দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলে- হায় ভগবান আমার দিদির কপালে কি কোনোদিন সুখ অইব না। জীবনডা কি তার কাইন্দা কাটাইতে অইবো। সে কোনো কথা না বলে ঘরে গিয়ে সরাসরি মাকে বলে- মা গো, ভাত দে, ম্যালা ক্ষিদা পাইছে। সকালে পান্তা খাইয়া গেছি। সারাডা দিন খেয়া বাইছি। তার মধ্যে আবার রামডা মইরা গেল। ভালোই লাগে না, কিছু আর ভালো লাগে না মা।
মা, কাবেরী বলে- তাতো বুঝলাম, তোর দিদি যে বিলাপ কইরা কানতাছে তোর চোখে পড়ে না?
চোখে পড়ছে মা, বাড়ি ঢুকার আগেই দিদির কান্দন আমার কানে আইছে। আর বুঝবারও পারছি দিদিরে জামাই বাবু মাইর-ধইর করছে। আবার টাকা পয়সা চাইছে। আমি কী করুম মা, আমি সারা দিন খেয়া বাই। যা পাই তোমার কাছে দেই। আমার ফাঁসি লইয়া মরতে অইবো।
অলক্ষ্যা কতা কস ক্যান। ভাগ্যে যা আছে তাই অইবো। তোর দিদি আর ওই বাড়ি যাইবো না। আর মাইরও খাইবো না। তোর জামাইবাবু আর নাই। মাছ ধরতে গিয়া সাপের কামড় খাইছে। ওঝা ডাকতে ডাকতে সারা গায়ে বিষ ছড়াইয়া গেছে। ওঝা অনেক চেষ্টা করছে তয় কোনো কাম অয় নাই।
গোবিন্দ আশ্চর্য হয়ে বলে- মা, এইডা তুমি কী কও, জামাইবাবু নাই। ও দিদি আমারে আগে খবর দিবি না। তুই কেমনে খবর দিবি? আমরা খুব গরিব বুইলা তোর শ্বউর বাড়ির মানুষ আমাগোরে মানুষ বুইলাই মনে করে না। আমার জামাইবাবু মইরা গেছে। আর আমারে কোনো খবর দিওনের দরকার মনে করে না। দুঃখ করিস না দিদি, ভাগ্যে যা আছে তাতো অইবোই।
কাবেরী মাটিতে আসন পেতে একটি থালায় ছেলের জন্য কয়েকটি রুটি আর পাশে মরিচ বাটা রেখে বলে আয় বাবা। রুটি কয়খান মুখে দে।
গোবিন্দ ভাবছে বিধবা মা আর নিজের খাবার যোগাড় করতে পারে না সে। কোনো দিন তিন বেলা খাবার জোটে, কোনো দিন একবেলা খেয়ে খেয়া বাইতে হয়। খেয়া পার হয়ে লোকজন ঠিকমতো ঘাটে পয়সা জমা করে না। সেই বাকি পয়সার জন্য বাড়ি বাড়ি ঘুরতে হয়। এক টুকরো জমি ছিল, তা বিক্রি করে তার দিদির বিয়ে দেয়া হয়েছে। বিয়ের পরেও ধার দেনা করে কয়েক বার জামাই বাবুকে টাকা দিতে হয়েছে। সেই ঋণ বহুকষ্টে গোবিন্দ শোধ করেছে। এখন দিদি বাড়িতে চলে এলো, গোবিন্দ তিনজনের খাওয়া-পরা কিভাবে চালাবে সেই চিন্তায় অস্থির হয়ে ওঠে। কাবেরী আবার ছেলেকে খাবার খেতে তাড়া দেয়, কিন্তু গোবিন্দ জানায় তার আর ক্ষুধা নেই।
বারান্দায় খেজুর পাতার মাদুর বিছিয়ে নেয় গোবিন্দ। ঘরে ভাঙা সিন্দুকটার ওপর থেকে একটি আধময়লা কাঁথা আর একটি তেল চিটচিটে বালিশ তুলে নেয়। খেজুর পাতার মাদুরের ওপর কাঁথাটা বিছিয়ে শুয়ে পড়ে।
সকাল বেলা খেয়া পারাপারের সময় অসুস্থ আনন্দ মিস্ত্রিকে খাটে শুইয়ে খেয়া পার করা হয়, তাই গোবিন্দ জিজ্ঞেস করে- আনন্দ দাদার পা খান বুঝি আর ভালো অইলো না?
আনন্দ মিস্ত্রির ছোট ভাই কানাই ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলে- না রে গোবিন্দ, কী একখান প্যারেক পায়ে ফুটল, সেই থিকা বেথা-বেদনা। পা ইলা গেল অহন তো অর্ধেক পা পইচাই গেছে। ফটিক ডাক্তার তো ম্যালা অসুধ খাওয়াল, কোনো কাম অইলো না। পায়ের কষ্টে দাদা এমনা কান্দাকাটি করে, হের চিল্লানীতে কারো ঘুমানোর সাধ্য থাকে না। দেখি সদরের হাসপাতালে নিয়া। ভাইরে, জমি জিরাত যেটুকুন আছিলো দাদার পায়ের পিছনে সব গেল।
নৌকার মধ্যে ঘনশ্যাম মাস্টারও ছিলেন। তিনি আফসোস করে বলেন, আহারে ছেলেটা শুধু মিস্ত্রির কাজ করত তা নয়, কত সুন্দর তবলা বাজায়। দারুণ যাত্রাপালা করে, সুন্দর ছবি আঁকতে পারে। হায় ভগবান জানি না তুমি কেন এমন কর। এত সুন্দর নদী আর তার পারিপাশ। নদীর স্বচ্ছ টলমলে পানি। দূরে দূরে ঝাঁক বেঁধে হাসেরা ভাসে। জলকেলি নদীর পাড়ে কলমি আর হেলেঞ্চারা সবুজ ডগা বাড়িয়ে মনোরম করেছে ধলেশ^রীর শোভা। আকাশে উড়ে বলাকার ঝাঁক। নেচে গেয়ে খেলা করে খঞ্ছনা। নদী পাড়ের মানুষগুলোর কেন এত দুর্দশা। হাতেগোনা কয়েকটি পরিবার আছে যা সচ্ছল। আর সব মানুষই খুব কষ্টে দিন কাটায়। অভাব-অনটন, দুঃখ-দুর্দশা নিয়েই এদের জীবন। কেউ শাপলা তুলে লবণ মরিচ দিয়ে রেঁধে দু’মুঠো ভাত মুখে তুলে। কেউ দু’বেলা, কেউ এক বেলা খেয়ে দিন কাটায়। কেউ মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে। কেউ কুমারের কাজ করে। নদী পারের মানুষগুলো সাধারণত নিম্ন মধ্যবৃত্ত পারিবারের। এদের বুঝি দেখার কেউ নেই। এই অসহায় মানুষগুলোর ওপর নদীও খেপে ওঠে। ভাসিয়ে নিয়ে যায় এদের কুঁড়ে ঘরখানি, এক চিলতে জমি তার সাথে হারিয়ে যায় এদের নয়নের মনি ছোট ছোট বাচ্চারাও। যাদের মুখে অসহায় বাবা-মা দু’টো মাছ-ভাত তুলে দিতে পারেনি। গায়ের জন্য একটি খুব সাধারণ জামা দিতে পারেনি। খালি গায়ে, খালি পায়ে যাদের দিন কাটে। সেই শিশুদের হারিয়ে যেতে হয় নদীর ভয়াল করাল গ্রাসে। হায় প্রভু এরাও যে মানুষ, এদের দয়া কর।
রাত তো কম হয়নি। লোক চলাচলও বন্ধ হয়েছে। তাই গোবিন্দ বাড়িতে যায়। বাড়ির বাইরে তার দিদি সুবালা মাটিতে বসে আছে। গোবিন্দ সুবালাকে দেখে বলে- ও দিদি তুই এত্ত রাইতে আমার জন্য বাইরে বইয়া থাকিস নাতো। আমারতো রাইত অইবই। প্রত্যেক দিনই রাত অইবো। সুবালার চোখে পানি, কপালে চিন্তার রেখা। সে কান্না জড়িত কণ্ঠে বলে, ভাইরে মা বাজারে গেছে আর তো ফিরা আইলো না।
মার বাজারে যাওয়ার দরকার অইল ক্যা?
মায় কয়ডা মাছ ধরছে তাই লইয়্যা...।
তাই বেচবার জন্য মাইরে তুমি বাজারে পাঠাইছ।
মাইরে আমি বাজারে যাইতে দেই না। মার শরীরডা খুব খারাপ। দিদি আইজ মার যদি কিছু অয়? মার গায়ে জ্বর থাকে। মার একখান বড় সড় অসুখ অইছে আমি বুঝবার পারছি কিন্তু ডাক্তার দেখাইতে পারি নাই। মাগো ... মা তুমি কই গ্যালা মা...। গোবিন্দ ও সুবালা বাজারের মধ্যে এবং চারিদিকে অনেকক্ষণ ধরে খুঁজতে থাকে, তারপর বাজারের কাছে একটি ঢালু জায়গায় তার মৃতদেহ পাওয়া যায়।
পনের দিন পর নদীর দিকে যাচ্ছিল গোবিন্দ, রাস্তায় কৃষ্ণকলি তাকে ডেকে দাঁড় করাল। বলল, গোবিন্দ দা আমি জানি তোমার মনের অবস্থা ভালো নাই। তয় আমিও যে বেজায় বিপদে আছি। তোমার সাথে আমার কতা আছে।
গোবিন্দ গম্ভীর কণ্ঠে বলে- ক, কী কবি।
বাবায় আমার বিয়ার জন্য পাত্র খুঁজতাছে।
তা, আমি কী করুম, পাত্র খুঁজতাছে ভালা কতা। বিয়া কইরা শওর ঘরে সুখে সংসার করবি। গোবিন্দ দাদা, তুমি আমারে অমন কইরা কইতে পারলা। আমি যে তোমারে ছাড়া আর কারো সাথে সংসার করবার পারমু না। আমি তোমারে ছাড়া বাঁচুম না।
কৃষ্ণকলি আমার ভাগ্যে বিয়া-সাদি, সংসার এইসব কিছুই নাইরে। দুঃখ করিস না, খুরু মশাই তো তোর ভালার জন্যই চিন্তা করতাছে। তুই আমারে ভুইলা যারে কৃষ্ণকলি। আমার মতো কুলাঙ্গাররে আর ভালোবাসিস না কলি, ভুইলা যা, আমারে ভুইলা যা। কাঁধের গামছা দিয়ে চোখ মুছে দ্রুত পায়ে হেঁটে যায় গোবিন্দ। কৃষ্ণকলি মাটিতে বসে পড়ে। বিলাপ করে কাঁদে, ওরাও যে মানুষ ওদেরও মন আছে। তাই ওরাও ভালোবাসে। প্রিয়জনের সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে।
কেটে যায় বেশ কিছু বৎসর। বদলে যায় অনেক কিছু। গোবিন্দর দিদি সুবালার যক্ষ্মা হয়। কিছুদিন রোগে ভুগে তার পর একদিন মারা যায়। তার কিছুদিন পর একদিন অনেক রাতে গোবিন্দ খেয়াপার করতে গিয়ে ভয় পায়। সে দেখতে পায় তার নৌকায় একজন মানুষ উঠেছে, কিন্তু তার পা দেখা যাচ্ছে না। সে খুব ভয় পেয়ে যায়। এটা গোবিন্দর চোখের ভুল ছিল কিনা কেউ জানে না। তবে সে ভয় পেয়েছিল। ভয় পেয়ে বাড়িতে গিয়ে শুয়ে পড়ে। গায়ে ভীষণ জ্বর ওঠে। সাত দিন জ্বরে ভুগে তারপর একদিন গ্রামের একজন তার খোঁজ নিতে গিয়ে দেখে, মরে পড়ে আছে সেও।

 

Logo

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,    
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫