Naya Diganta

গ্রামে চিকিৎসা: ফার্মেসি ব্যবসায়ীকে থামাবে কে?

মো: মাকসুদ উল্যাহ্

২৭ ডিসেম্বর ২০১৭,বুধবার, ১৭:৫৬


ফার্মেসি ব্যবসায়ীকে থামাবে কে?

ফার্মেসি ব্যবসায়ীকে থামাবে কে?

বক্তব্য: কিছুদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত উপসম্পাদকীয় ‘গ্রামে স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্ব কারা নেবেন?’ পড়েছিলাম। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, ডাক্তারেরা গ্রামে থাকেন না বলে। যা পরিপূর্ণভাবে সত্য নয়। লেখাটিতে এমন পরিস্থিতির মূল কারণগুলোর কোনোটিই উল্লেখ করা হয়নি। আর সমাধানের জন্য যেসব পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে সেগুলোও অবাস্তব। সেখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জানতে চাওয়া হয়েছে গ্রামে বা উপজেলায় প্রশাসনিক অফিসারেরা থাকতে পারলে, ডাক্তারেরা পারবেন না কেন?

বাস্তবতা হচ্ছে, প্রশাসনিক অফিসারেরা থাকেন সর্বনিম্ন উপজেলা পর্যায়ে, ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডপর্যায়ে নয়। পক্ষান্তরে ডাক্তারের পদায়ন কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যন্ত যা ওয়ার্ডে তথা প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থিত। অনেক ক্ষেত্রেই সেখানে পৌঁছার পথটা হয় খুবই কষ্টকর।

প্রশাসনিক অফিসারদের বিচারিক ক্ষমতা আছে। তাদের সর্বনিম্ন কর্মস্থল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসে গিয়ে কোনো দুর্বৃত্ত তাদের লাঞ্ছিত করার কথা কল্পনাও করে না। কেননা এমন করার চেষ্টা করা মাত্র তাকে জেলখানায় পাঠানো হবে। কিন্তু কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে শুরু করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পর্যন্ত দুর্বৃত্তরা চাইলেই ডাক্তারের ওপর হামলে পড়ে। তাদের মর্জিমোতাবেক না চললেই দুর্বৃত্তরা এমন করে। কেন না ডাক্তারের হাতে বিচারিক তথা গ্রেফতারের ক্ষমতা নেই। উপজেলাপর্যায়ে ডাক্তারের ওপর হামলার ঘটনা প্রতিদিনের ডালভাতের মতো বিষয়ে পরিণত হয়েছে! সরকারি দায়িত্ব বাদ দিয়ে রোগী দেখতে বাড়িতে না যাওয়ায় ডাক্তারের তিন দাঁত ফেলে দেয়া হয়েছে। এরকম অসভ্যতার মুখোমুখি হয়ে গ্রামে তারা ডাক্তারি করবেন কিভাবে?
প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা জেলায় বা উপজেলায় চাকরির নির্দিষ্ট মেয়াদ পার করলেই তাদের পদোন্নতি হয়। কিন্তু উচ্চতর ডিগ্রি না করলে ডাক্তারদের পদোন্নতি হয় না। তাহলে তারা গ্রামে থাকবেন কেন? অন্যান্য খাতের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদের মতো ডাক্তারদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা হয়েছে কী? তাহলে?

ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত যেতাম গ্রামের রোগীদেরকে চিকিৎসা দেয়ার জন্য। রোগীরা আসে শুধু সরকারি ওষুধ নেয়ার জন্য মাসের প্রথম তিন- চার দিন। তাদের বলতাম, ‘আপনার সমস্যার কথা বলুন, তারপর দেখেশুনে যাচাই করে যে ওষুধ দরকার সেটার ব্যবস্থা করবো’। তারা বলত, ‘সমস্যা বলার দরকার নেই, আমরা জেনে এসেছি অমুক অমুক ওষুধ আছে, সেগুলো দেন।’ তাদের কথামতো না চললে অনেকে বিরূপ মন্তব্য করত এবং লাঞ্ছিত করতে চেষ্ট করত। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীরা ডাক্তারকে শুধু মাসের প্রথম তিন চার দিন ওষুধ বিতরণকারী পিওন হিসেবে দেখতে চায়। তারা মাসের প্রথম তিন-চার দিন এসে শুধু ওষুধ নিয়ে যেত। স্থানীয় মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে এবং প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয় এবং মাদরাসায় সশরীরে গিয়ে প্রচার করেছিলাম, এ ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আমি সরকারি ডাক্তার এবং নিয়মিত আসছি। আপনারা চিকিৎসার জন্য আসবেন। কিন্তু মাসের বাকি দিনগুলোতে তারা কেউ চিকিৎসার জন্য যেত না। তাহলে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডাক্তার গিয়ে খালি বসে থেকে সময় এবং যোগ্যতা নষ্ট করবে কেন? সেখানে দুর্বৃত্তের দিয়ে লাঞ্ছিতও হয়েছি! একদিন নিকটস্থ সড়ক থেকে এক লোক এসে আমার কাছে টয়লেটের চাবি দাবি করে। আমি তার অনুগত দাসের মতো টয়লেটের চাবির ব্যবস্থা করতে পারিনি বলে সে আমাকে ঝুলানোর হুমকি দিয়ে চলে যায়। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাথে কেউ কোনোদিন এমন করতে পেরেছে? এমন করলে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা কেউ সেই কর্মস্থলে থাকবে?

ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিষাক্ত সাপে দংশনের রোগী বা হার্ট অ্যাটাক-স্ট্রোক বা অন্য কোনো জটিল রোগী এলে তাদের সঠিক চিকিৎসার জন্য উচ্চতর হাসপাতালে পাঠাতে হয়। কিন্তু দুর্বৃত্তরা সেটা না মেনে ডাক্তারের ওপর হামলা করে। তারা বলে, ‘এ রোগীর চিকিৎসা করতে না পারলে কী কচুর ডাক্তার হইছেন?’ তারা বলে, ‘আপনারা আমাদের ট্যাক্সের টাকায় ডাক্তার হইছেন, চিকিৎসা এখানেই করতে হবে’। এই বলে তারা অনেক সময় পশুর মতো ডাক্তারের ওপর হামলে পড়ে! অসভ্যতারও একটা সীমা-পরিসীমা থাকা উচিত। যারা ডাক্তারদের গ্রামে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তারা কি কখনো ডাক্তারদের প্রতি এসব অসভ্য আচরণের বিরোধিতা করেছেন? বিরোধিতা দূরের কথা, কখনো তো উল্লেখই করেন না। একতরফা অপপ্রচার করেন কেন? কাপুরুষতা পরিহার করা উচিত।

আবার রোগীদের যখন ব্যবস্থাপত্র দেয়া হয় তখন অনেক ফার্মেসি ব্যবসায়ী ব্যবস্থাপত্রের ওষুধ বাদ দিয়ে বরং নিজের ঔদ্ধত্য ও মর্জিমোতাবেক তার ফার্মেসিতে যা ওষুধ আছে তা রোগীর হাতে তুলে দেয়। ফলে সময়ের সাথে রোগীর অবস্থা আরো খারাপ হয়। দোষ হয় ডাক্তারের! ফার্মেসি ব্যবসায়ী মনে করে, সেটা তার এলাকা! সে যা ইচ্ছা রোগীকে তাই ওষুধ দেবে। ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র তো, কোন স্যার। সে বরং আরো বড় ডাক্তার।

দেখা যায়, অনেক ফার্মেসি ব্যবসায়ী নিজের নামের আগে ডাক্তার লিখে বিশাল বিশাল সাইনবোর্ড, ব্যানার টানিয়ে রেখেছে। তারা রোগীর থেকে ভিজিট ফি নিচ্ছে পঞ্চাশ-এক শ’ টাকা। তারা রোগীকে টেস্ট করতে দিচ্ছে। কোনো কোনো ফার্মেসি ব্যবসায়ী রোগীর সামনেই অধ্যাপকের ব্যবস্থাপত্রকে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে। এসব অসভ্যতা অরাজকতা জিইয়ে রেখে ডাক্তারের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করে গ্রাম এলাকায় চিকিৎসা পরিস্থিতিকে বরং আরো খারাপ অবস্থার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। গ্রামের কলেজের সহকারী অধ্যাপক বাজারে একটি ফার্মেসি খুলে বিশাল সাইনবোর্ড টানিয়ে নিজের পরিচয় লিখে রেখেছেন, ‘অধ্যাপক ডা: অমুক’। মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপকের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে রোগী ফার্মেসি ব্যবসায়ীর কাছে গেলে ফার্মেসিতে সেই ওষুধ নেই বলে ফার্মেসি ব্যবসায়ী অধ্যাপকের ব্যবস্থাপত্র ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলে, ‘কি আবাল ডাক্তার দেখাইছেন? এই নামে তো কোনো ওষুধই নাই দুনিয়াতে!’ কিন্তু রোগী তো ফার্মেসি ব্যবসায়ীর অসভ্যতা শনাক্ত করতে পারে না। ফার্মেসি ব্যবসায়ীর দাপটে রোগী মনে করে, এই ডাক্তার বুঝি আসলেই অযোগ্য। এভাবেই প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে রোগীরা নিজেদের সরলতার কারণে নিজেদের অজান্তেই ফার্মেসি ব্যবসায়ীর কাছে জিম্মি। বেপরোয়া ফার্মেসি ব্যবসায়ীরা এভাবেই রোগীর চিকিৎসাকে অকার্যকর করে দিয়ে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে দিচ্ছে।
বেকার যুবকেরা অনেকেই জেলাপর্যায়ের স্থানীয় পত্রিকা বের করছে। এক দিকে তারা নিজেদেরকে সাংবাদিক হিসেবে তুলে ধরছে, অন্য দিকে তারাই ফার্মেসি খুলে বিশাল সাইনবোর্ডে নিজেকে হুঙ্কারের ভঙ্গিতে ডাক্তার উল্লেখ করে সেটা আবার সেই পত্রিকায় বড় বড় বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। ফলে এ দেশের মানুষেরা তাদেরই ডাক্তার বলে মনে করছে। ফলে ‘ডাক্তার’ শব্দটার আর আলাদা কোনো তাৎপর্য থাকতেছে না।

হোমিওপ্যাথি বা আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল কলেজ থেকে বিএইচএমএস বা ডিএইচএমএস লেখাপড়া করে সবাই নিজের সাইনবোর্ডে নিজেকে এমবিবিএস পরিচয় দিয়ে এলোপ্যাথি ডাক্তারি করতেছে! অথচ তাদের ডিগ্রির নাম বি এইচএমএস বা ডিএইচএমএস এবং তাদের করার কথা হোমিওপ্যাথি বা আয়ুর্বেদিক ডাক্তারি! সবাই নিজেকে এমবিবিএস হিসেবে তুলে ধরার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে! এসব অসভ্যতা চলমান রেখে বা না দেখার ভান করে শুধু এমবিবিএস ডাক্তারদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করে গ্রামে চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতি হবে কিভাবে?

অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ফার্মেসি ব্যবসায়ীকে ‘ডাক্তার’ সম্বোধন করছে। লোকেরা প্রথমত, ফার্মেসি ব্যবসায়ীকে ডাক্তার বলে সম্বোধন করছে, তারপর আবার তাদের দিয়ে ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রকে যাচাই করছে! তাদের পঞ্চাশ-এক শ’ টাকা ভিজিট ফি দিচ্ছে! সর্বশেষ ডাক্তারের দুই শ’ টাকা ভিজিট ফি’র বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। তাহলে কিভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি হবে? কিভাবে হবে?

গ্রামে ফার্মেসি ব্যবসায়ীদের অনেকে ডাক্তারের দিকে ইঙ্গিত করে রোগীকে বলে, ‘রোগ সারানোর মালিক আল্লাহ। বাইরের লোকদের গিয়ে ২০০ টাকা ভিজিট দেয়ার কি দরকার? আমরাই তো কম ভিজিটে চিকিৎসা দিতেছি।’ তারা রোগীকে বুঝাতে চায় আল্লাহ যদি রোগ সারায়, তাহলে সেটা তার চিকিৎসায়ই সারবে; বাইরের লোকের ( ডাক্তার) কাছে যাওয়ার দরকার নেই।
সব রোগীকে সব সময় গ্যাস্ট্রিক আলসারের ওষুধ বা ভিটামিন বা স্যালাইন দেয়া লাগে না। কিন্তু রোগীরা ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে ফার্মেসিতে গেলে ফার্মেসি ব্যবসায়ীরা রোগীকে বলে, ‘কই, গ্যাসট্রিকের ওষুধ তো দেয় নাই! ভিটামিন তো দেয়া নাই।’ এভাবে তারা রোগীকে বুঝায়, ডাক্তারের চিকিৎসা ভুল হয়েছে। নির্বোধ রোগীও ফার্মেসি ব্যবসায়িকে বড় ডাক্তার মনে করে বিভ্রান্ত হয়। মানুষের মূর্খ্যতার সুযোগ নিয়ে ফার্মেসি ব্যবসায়ীদের অনেকেই গ্রামের রোগীদের সুচিকিৎসার পথ বন্ধ করে রেখেছে।

গ্রামে একজন ডাক্তারের সততার সাথে ডাক্তারি করার পথ অনেকটাই বন্ধ করে রেখেছে ফার্মেসি ব্যবসায়ী আর ক্লিনিক মালিকেরা। রোগীরা কোনো ডাক্তারের কাছে প্রাইভেট চেম্বারে দেখাতে চাইলে তারা সেই ক্লিনিকে পাঠায় এবং দরকার না হলেও রোগীকে অনেকগুলো টেস্ট করায়। যে ডাক্তার দরকার ছাড়া রোগীকে টেস্ট করতে দেয় না, সেই ডাক্তারের কাছে রোগীকে যেতে দেয় না তারা। ফলে সৎভাবে ডাক্তারি করতে চাইলে আর্থিকভাবে শোচনীয় অবস্থা বরণ করতে হয় সেই ডাক্তারকে। রোগী এবং ডাক্তার উভয়েই ফার্মেসি ব্যবসায়ী আর ক্লিনিক মালিকের কাছে জিম্মি। এসব অরাজকতার সুযোগে বেকার শিক্ষিত যুবকেরা ব্যাঙের ছাতার মতো ফার্মেসি আর ক্লিনিক খুলে বসছে। এক সময় দেশে জনসংখ্যা বাড়ত জ্যামিতিক হারে। এখন জনসংখ্যা অনেকটাই স্থির আছে, কিন্তু বেকারত্বের কারণে গ্রামে ফার্মেসি আর ক্লিনিক বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। আর তার ফলে সৃষ্ট অরাজকতার দায় জ্ঞানপাপীরা অন্ধ বিদ্বেষবশত ডাক্তারদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। বেকারত্বের ফলে সৃষ্ট অরাজকতার দায় ডাক্তারদের ঘাড়ে বর্তাবে কেন? ফলে ফার্মেসি ব্যবসায়ীরা হয়ে উঠছে আরো বেপরোয়া!

শুধু ডাক্তারেরা কেন, সবাই তো করদাতাদের করের টাকায় লেখাপড়া করছে। ডাক্তার হওয়ার জন্য সরকারের খুব কম টাকাই খরচ হয়। কেননা সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারেরা অতিরিক্ত কষ্ট করে মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষকতা করে শিক্ষার্থীদের ডাক্তার বানান। সেজন্য সেই ডাক্তারদের আলাদা বেতন দেয়া লাগে না। এক বেতনেই তারা দুই কাজ করেন, ডাক্তারি এবং ডাক্তার বানানো। প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তার হতে ২৫-৩০ লাখ টাকা লাগলেও সরকারি মেডিক্যাল থেকে ডাক্তার হতে একজন শিক্ষার্থীর জন্য বছরে এক লাখ টাকা করে সর্বমোট পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয় কি না সন্দেহ আছে। তাই প্রাইভেট মেডিক্যালের সাথে তুলনা করা অন্যায়। সবচাইতে বেশি খরচ হয় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য। তাদের প্রত্যেকের জন্য প্রতি বছর দুই লাখ টাকার বেশি খরচ হয়। চার বছরে নয় লাখ টাকার বেশি খরচ হয়। পক্ষান্তরে নিজেদের জীবনকে মোমবাতির মতো করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে অল্প সরঞ্জাম ব্যবহার করে শুক্রবার-শনিবারসহ দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা অক্লান্ত পরিশ্রম করে অল্প সংখ্যক ডাক্তারেরা জোড়াতালি দিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে! বিনিময়ে এ জাতি ডাক্তারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা তো দূরের কথা, উল্টা তাদের প্রতি কাপুরুষতা করছে। সবাই তাদের নিজেদের অন্যায় ঢাকার জন্য ডাক্তারের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছে। ফলে দেশে ডাক্তারদের জন্য জাহান্নামের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

গ্রামে চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতির জন্য সবার আগে ফার্মেসি ব্যবসায়ী আর ক্লিনিক মালিকদের দৌরাত্ম্যের লাগাম টেনে ধরতে হবে। ফার্মেসি ব্যবসায়ীকে ‘ডাক্তার’ সম্বোধন করা বন্ধ করতে হবে। গণমাধ্যমে প্রচার করতে হবে, রোগীরা যেন ফার্মেসি ব্যবসায়ীর কথায় ডাক্তারের চিকিৎসা পরিবর্তন না করে। কোনো ফার্মেসি ব্যবসায়ী নামের আগে ‘ডাক্তার’ পরিচয় ব্যবহার করলে বা রোগীর থেকে ভিজিট নিলে বা রোগীকে টেস্ট করতে দিলে বা ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র স্থগিত বা পরিবর্তন করলে সবাই যেন প্রকাশ্যে বা গোপনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেন। ফার্মেসি ও ক্লিনিকগুলোতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের তদারকি বাড়াতে হবে। প্রত্যেক ইউনিয়নে বা উপজেলায় যেন জনসংখ্যার অনুপাতে নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি ফার্মেসি এবং ক্লিনিক না থাকে। ডাক্তারের কর্মস্থলের নিরাপত্তা এবং যাতায়াত ব্যবস্থার উপযুক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে বিচারিক এবং গ্রেফতার আদেশের ক্ষমতা দিতে হবে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিরাপত্তারক্ষীর ব্যবস্থা করতে হবে। গণমাধ্যমে প্রচার করতে হবে, রোগীরা যেন সেখানে গিয়ে ডাক্তারের কাছে সরাসরি ওষুধ দাবি না করে বরং নিজের শারীরিক কষ্টের কথা যেন তুলে ধরে। সুস্থ লোকেরা রোগী সেজে যেন সেখানে গিয়ে ওষুধ দাবি না করে। সাধারণ বিসিএস থেকে সরিয়ে বিচারকদের মতো ডাক্তারদের ভিন্ন পদ্ধতিতে চাকরিতে যোগদান করার ব্যবস্থা করতে হবে। ডাক্তারদের গ্রেড-১ পর্যন্ত পদোন্নতির ব্যবস্থা করতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব সদা ডাক্তারদের মধ্য থেকেই হতে হবে। অ্যাকাডেমিক লাইনের বাইরে অন্যান্য ক্যাডারের মতো ডাক্তারদের জন্যও চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে পদোন্নতির ব্যবস্থা করতে হবে। ডাক্তারেরা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় লেখাপড়া করে- এ ধরনের কাপুরুষতাপূর্ণ প্রপাগান্ডা বন্ধ করতে হবে। কেননা, সবাই জনগণের ট্যাক্সের টাকায় লেখাপড়া করে। অনারারি মেডিক্যাল অফিসার সিস্টেম বাতিল করে তাদের জন্য উপযুক্ত ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন সৃষ্ট মেডিক্যাল কলেজগুলোতে প্রত্যেক বিষয়ের যথেষ্ট সংখ্যক শিক্ষকের পদবি সৃষ্টি করতে হবে।

লেখক: চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।

Logo

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,    
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫