Naya Diganta

শীতলক্ষ্যা মৃতপ্রায়

সাধন সরকার

২৫ ডিসেম্বর ২০১৭,সোমবার, ১৫:১১


শীতলক্ষ্যা মৃতপ্রায়

শীতলক্ষ্যা মৃতপ্রায়

কাগজে-কলমে বাংলাদেশে ৮০০টিরও বেশি নদী থাকলেও দখল আর দূষণের কবলে পড়ে বর্তমানে সচল নদীর সংখ্যা এর অর্ধেকে নেমে এসেছে। ঢাকাকে ঘিরে থাকা চারটি নদ-নদীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি নদী হলো শীতলক্ষ্যা। বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদ ব্রহ্মপুত্রের একটি শাখা নদী হলো এই শীতলক্ষ্যা। শীতলক্ষ্যা নদীকে ঘিরে প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জ শহরে বহু আগেই ব্যবসায়-বাণিজ্য প্রসার লাভ করেছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, দূষণ-আবর্জনা আর দখলের কবলে পড়ে শীতলক্ষ্যা নদীর অবস্থা মুমূর্ষু রোগীর মতো। নদীটির দুই পাশে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন শিল্পকারখানা। মূলত শিল্পকারখানাগুলোয় বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) মাধ্যমে বর্জ্য শোধন করার কথা থাকলেও বেশির ভাগ কারখানায় তা করা হচ্ছে না। ফলে নদীর সাথে সংযোগ থাকা বিভিন্ন খাল-নালা দিয়ে এসব কারখানা থেকে রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে।

নদীর কিনারে স্তূপ করে রাখা হয়েছে নানা রকমের বর্জ্য। এর ফলে নদীর পাড় দিয়ে যাতায়াত এখন মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। গৃহস্থালির বর্জ্য ও শহরের সিটি করপোরেশনের বর্জ্যরে একটা বিরাট অংশ নদীতে গিয়ে পড়ছে। এসব বর্জ্যরে কারণে নদী তীরবর্তী বাতাস ময়লা-আবর্জনায় দূষিত হয়ে চার দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। নদীর পাড় ঘেঁষে পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্য আসছে স্থানীয় মার্কেট ও আড়ত থেকে। শীতলক্ষ্যা নদীর সীমানা পিলারের মধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে অনেক অবৈধ স্থাপনা। নদীর পাড় দখল করে প্রভাবশালী মহল বালুর আড়ত বসিয়ে বালুর রমরমা ব্যবসায় চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ দিন ধরে। পরিস্থিতি এমন, যেন দেখার কেউ নেই!

ঢাকা শহরের খাওয়ার পানি সরবরাহের অন্যতম একটি উৎস এই শীতলক্ষ্যা নদী। মূলত শীতলক্ষ্যার পানি শোধন করে তা পানের উপযুক্ত করা হয়। কিন্তু দিন দিন যে পরিমাণ দূষণ বাড়ছে তাতে শীতলক্ষ্যার পানি শোধনের উপযুক্ততা হারাতে পারে। শীতলক্ষ্যার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। পানিতে ‘ডিও’-এর পরিমাণ কমে গেলে তাতে জীবন ধারণের অস্তিত্ব বা কোনো প্রাণীর টিকে থাকার সম্ভাবনা কমে যায়। পৃথিবীর বহু দেশে নদীবেষ্টিত শহরগুলোর নদী দূষণের ফলে নদী ও মানুষের ওপর মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আবার অনেক শহর নদীকেন্দ্রিক হওয়ায় ব্যবসায় বাণিজ্য, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও বিনোদনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর বড় বড় সভ্যতাগুলো গড়ে উঠেছে মূলত বিখ্যাত সব নদীগুলোকে ঘিরে। তাই এখনই আমাদের নদী রক্ষায় সচেতন হতে হবে। শীতলক্ষ্যার এই দখল ও দূষণ বাড়তে থাকলে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা শহরের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে।

অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এ দেশের মানুষের মধ্যে নদীবিষয়ক সচেতনতা এখনো ব্যাপকভাবে গড়ে ওঠেনি। ঢাকা শহরের আশপাশের আরো তিনটি নদী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদীও দখল এবং দূষণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। শীতলক্ষ্যাসহ এই নদীগুলোকে ঢাকার লাইফলাইন বলা হয়। অথচ মানুষ অতি সহজে অনেকটাই না ভেবেচিন্তে ময়লা-আবর্জনা, রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ফেলছে। নদীখেকোরা দখলের মহোৎসবে মেতে উঠেছে। দেখে মনে হয় যেন আবর্জনা, রাসায়নিক বর্জ্য আর দখলের উপযুক্ত জায়গা একমাত্র নদীই! নদী দূষিত হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে নদী তীরবর্তী সংশ্লিষ্ট মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর। নদী দূষণের প্রভাব কোনো না কোনোভাবে মানুষের ওপরই পড়ে। এ ছাড়া দূষণের ফলে নীরবে বিভিন্ন রোগের বিস্তার ঘটতে পারে।

শীতলক্ষ্যা নদীটিকে তাই যত দ্রুত সম্ভব বাঁচানোর উদ্যোগ নিতে হবে। নদীর স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। ময়লা-আবর্জনা ও রাসায়নিক বর্জ্যরে দূষণ থেকে নদীটিকে রক্ষায় দরকার সচেতনতা। নদী তীরবর্তী কারখানাগুলোকে বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) ব্যবহারে বাধ্য করতে হবে। গৃহস্থালির বর্জ্যসহ কোনো বর্জ্য যাতে নদীতে ও এর তীরবর্তী স্থানে না ফেলা হয় সে ব্যাপারে সিটি করপোরেশনকে দায়িত্ব নিতে হবে। নদীর পাড়ে সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার পাশাপাশি দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। কারণ, নদী আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নদী দূষণমুক্ত, স্বাভাবিক ও সুন্দর থাকলে মানুষ যেমন এর সুফল পাবে তেমনি এর ওপর দূষণ ও অত্যাচার বাড়তে থাকলে তার খারাপ প্রভাবও মানুষের ওপরই পড়বে।
লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

Logo

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,    
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫