Naya Diganta

রোগীপ্রতি ৪৮ সেকেন্ড মাত্র!

মো: মাকসুদ উল্যাহ্

১৮ ডিসেম্বর ২০১৭,সোমবার, ১৮:০১


রোগীপ্রতি ৪৮ সেকেন্ড মাত্র!

রোগীপ্রতি ৪৮ সেকেন্ড মাত্র!

সম্প্রতি ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশের ডাক্তারেরা নাকি ৬৭টি দেশের মধ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় রোগীদের সবচেয়ে কম সময় দেন এবং সেটা ৪৮ সেকেন্ড। সে খবর শুনে ক্ষোভে আফসোসে ফেটে পড়েছে অনেকে। তারা মনে করছে, এটা নাকি ডাক্তারদের জন্য লজ্জার ব্যাপার। 

আসলে ডাক্তারদের লজ্জা পাওয়ার কোনো কারণ নেই, বরং তারা অনেক পরিশ্রম করে জোড়াতালি দিয়ে ১৬ কোটি মানুষের চিকিৎসা দেন, যা এ জাতি স্বীকার করলে ভালো হতো।
৪৮ সেকেন্ডের বিষয়টি বাস্তবতার সাথে মেলে না। রোগী ডাক্তারের কাছে এসে চেয়ারে বসতে এবং ডাক্তার রোগীকে নাম জিজ্ঞেস করতেই তো ৫০ সেকেন্ড চলে যায়। যে তথ্যের ভিত্তিতে এ গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে, সেই প্রাথমিক তথ্যে অবশ্যই ভুল আছে।

জার্নালে বলা হয়েছে, রোগীরা সময় কম পেলে সেবার মান কম হয়। এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু সেখানে আরো বলা হয়েছে, বাজেট কম হলেই সময় কম পায় রোগীরা। কিন্তু এটা তো সংবাদপত্রে আসেনি; বরং সংবাদ হতে পারত ‘বাজেট কম হওয়ার কারণে বাংলাদেশের রোগীরা সময় পান কম।’
জার্নালে দেখা যাচ্ছে, সুইডেনের ডাক্তারেরা তাদের রোগীকে সর্বোচ্চ ২০ মিনিট সময় দেন। কিন্তু সুইডেনে তো ডাক্তারপিছু জনসংখ্যা ২৫০-৩০০ জন। তারা তো ২০ মিনিট সময় পাবেনই। আমাদের তো ডাক্তারপিছু জনসংখ্যা দুই হাজার ৫০০ জন। সে হিসেবে আমাদের রোগীরা ২ মিনিটের বেশি দাবি করা অন্যায়। সুইডেনের লোকদের মাথাপিছু আয় কি আমাদের মাথাপিছু আয়ের সমান? বাংলাদেশের রোগীরা যদি সুইডেনের মতো ২০ মিনিট সময় চায়, তাহলে বাংলাদেশের বাকি সব কিছুও সুইডেনের মতো হতে হবে। কম তেলে মচমচে ভাজা চাওয়া অন্যায়।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বলতে ইউনিয়ন এবং উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবা বুঝায়। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মাইকিং করেও রোগী নিতে পারিনি। তারা শুধু মাসের প্রথম দিকে ওষুধ এলে প্রথম দু-তিন দিনে এসে শুধু ওষুধগুলো নিয়ে যেত। তাদের বলতাম, ‘আপনার কষ্ট কী বলেন। তারপর দেখেশুনে যে ওষুধ দরকার সেটা দেবো।’

তারা বলত, ‘না সমস্যার জন্য আসিনি। শুনছি ওষুধ আসছে। ওষুধ নিতে এসেছি।’ তারা মাসের প্রথম তিন-চার দিনে এসে সব ওষুধ নিয়ে যেত। আর মাসের বাকি দিনগুলো আমি সেখানে গিয়ে শুধু বসে থাকতাম। ওরা কেউ আসত না বললেই চলে। এ ক্ষেত্রে তারা তো মাত্র ৩০ সেকেন্ড সময়ও নেয় না।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও একই অবস্থা। ২০০ জন রোগী এলে ১২০ জন সরাসরি ওষুধ চেয়ে বসে। বলে, ‘আমি/আমরা জেনে এসেছি অমুক অমুক ওষুধ আছে সেটা দেন।’ তাদের কথা না মানলে তারা খারাপ আচরণ করতে উদ্যত হয়। এ ধরনের আচরণে ডাক্তারেরা হতবাক হন। সব ডাক্তারের সাথেই তারা এমন করে। তাহলে এই ১২০ জনকে ওষুধ লিখে দিতে মূলত ৬০-৭০ মিনিটের বেশি দরকার হয় না। সে ক্ষেত্রে তো ৪৮ সেকেন্ডও লাগে না। বাকি সময় অনেক ডাক্তার তার কক্ষে খালি বসে থাকেন।

এবার আসি বাকি ৮০ জনের কথায়। এই ৮০ জনের মধ্যে অন্ততপক্ষে ৬০ জনই যাবে একজন বা দু’জন ডাক্তারের কাছে, যেই ডাক্তারেরা ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনেক আগে থেকেই চাকরি করেন। ফলে বহির্বিভাগে নির্দিষ্ট সময়ে একজন ডাক্তার ৬০ জন বা ৩০ জন রোগী দেখতে গেলে তারা ডাক্তারের কাছে সময় কম পাবেন, এটাই স্বাভাবিক। আর বাকি ২০ জন যায় বাকি পাঁচ-সাতজন ডাক্তারের কাছে। এই রোগীরা ভালো সময় পায়। অতএব দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সময় কম পাওয়ার জন্য রোগীরা নিজেরাই দায়ী।

অনেকে বলেন, প্রাইভেট চেম্বারে ডাক্তারেরা টাকার দিকে মনোযোগী থাকেন বিধায় রোগীকে সময় দিতে পারেন না। আসলে বিষয়টা এমন নয়, বরং রোগীরা একজন মাত্র ডাক্তারের কাছে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ধরা যাক, একটি বড় শহরে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ২০ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আছেন। একদিন সেখানে ২০০ জন রোগী প্রাইভেট চেম্বারে ডাক্তার দেখাবে। দেখা যায় ২০০ জনের মধ্যে ১৬০ জন যায় বড়জোর দুজন ডাক্তারের কাছে। আবেগের কারণেই তারা এমন করে। অন্য কোনো কারণ নেই। ফলে তারা ৭০-৮০ জন রোগী এক সন্ধ্যায় এক ডাক্তারের কাছে সময় কম পায়। আর বাকি ৪০ জন যায় বাকি ১৮ জন ডাক্তারের কাছে! ফলে তারা সময় পায় যথেষ্ট। ১৬০ জন কম সময় পেলে আর ৪০ জন উপযুক্ত সময় পেলে গড় সময় তো কম হবেই! এজন্য তো রোগীরাই স্পষ্টত দায়ী! কেননা ২০ জন ডাক্তারের মধ্যে খারাপ চরিত্রের হলে বড়জোর দু-তিনজন হবে। এর বেশি কখনোই নয়। বাকি সবার দক্ষতা, আচার-ব্যবহার গড়ে একই।

মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোতে বহির্বিভাগে ডাক্তারেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন রোগীদের যথেষ্ট সময় দেয়ার জন্য। যে বিভাগে ডাক্তারের তুলনায় রোগী বেশি তারা সময় কম পাবেন, এটাই স্বাভাবিক। তাই মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোতে প্রত্যেক বিভাগে আউটডোর মেডিক্যাল অফিসারের জন্য যথেষ্ট পদ সৃষ্টি করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়াতে হবে। রোগীদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে তারা যেন ডাক্তারের কাছে সরাসরি ওষুধ দাবি না করে। সুইডেনের মতো ২৫০ জন লোকের জন্য একজন রেজিস্টার্ড ডাক্তারের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে আমাদের দেশেও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় রোগীরা ২০ মিনিট করে সময় পাবে।

লেখক : চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা

Logo

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,    
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫