Naya Diganta

চেনা দুনিয়ার গোপন বিদায়

আলমগীর মহিউদ্দিন

০৬ ডিসেম্বর ২০১৭,বুধবার, ১৯:১৭


আলমগীর মহিউদ্দিন

আলমগীর মহিউদ্দিন

মানুষের জীবনদর্শন সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টে যায়। এমন ধারণা সবার। তবে যে প্রশ্নগুলোর জন্ম হয় ঘটনাগুলোর মাঝ থেকে, সেগুলোর বেশির ভাগের জবাব পাওয়া দুষ্কর। যেমন দু’টি পৃথক স্থানের এবং পৃথক সময়ের ছোট্ট ঘটনা আমায় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে সাড়ে চার যুগ ধরে।

প্রথম ঘটনাটি ঘটে জাতীয় সংবাদ সংস্থার অফিসে। সিনিয়র সহকর্মীর সাথে জাতীয় প্রেস ক্লাবে যাওয়ার জন্য অফিস থেকে বেরিয়ে এসেই মনে পড়ল বলপয়েন্ট কলমটা টেবিলের ওপরে রেখে এসেছি। সহকর্মীকে বললাম, ‘একটু অপেক্ষা করুন, কলমটা নিয়ে আসি।’ তিনি বললেন, ‘আবার উপরে উঠবেন? ওই বারোআনা দামের কলম কেউ নেবে না। চলেন যাই।’ চা খেয়ে ফিরে এসে দেখি, কলমটা নেই। ওখানে অফিসের ডিউটিরত পিয়ন টুকিটাকি কাজ করছে। তাকে ডেকে আমার গোল্ড প্লেটেড এনিকার ঘড়িটি দেখিয়ে হঠাৎ করেই বললাম, ‘এই ঘড়িটা হাত ধোয়ার সময় বেসিনে খুলে রেখেছিলাম। হাত-মুখ ধোয়ার পর আমার সেই সিনিয়র সহকর্মীর সাথে প্রেস ক্লাবে গিয়েছিলাম। ঘড়িটা নিতে ভুলে যাই। তুমি টেলিফোনে জানিয়েছিলে, ‘আপনি ভুলে ঘড়ি বেসিনে ফেলে রেখে গেছেন’। পরে অফিসে এলে তুমি সেটা আমাকে দাও। এ কথা বলেই, একটু খোঁচা দিয়ে বললাম, ‘এই ছোট্ট কয় আনার কলমটা কি তুমি নিয়েছ?’ হঠাৎ লক্ষ করলাম ওর চোখ ছলছল করছে আর দৃষ্টি নিচের দিকে। তখন বললাম, ‘কী করেছ কলমটা? তোমার পকেটে দেখছি না?’ সে বলল, ‘নিচে গাজীর দোকানে বিক্রি করতে দিয়েছি’। গাজী অফিসের আরেকজন পিয়ন। ও আয় বৃদ্ধির জন্য একটি ছোট্ট দোকান খুলেছিল। সব টুকটাক জিনিস বিক্রি করত। বিশ্বাসই হচ্ছিল না ও (পিয়নটির নাম ইচ্ছে করেই নিলাম না) এমন কাজ করতে পারে। কারণ, অফিসের সবচেয়ে সৎ কর্মী হিসেবে সে পরিচিত ছিল। আমাকে যখন ঘড়িটা ফেরত দিয়েছিল, তখন দেশে তুমুল স্বাধীনতা সংগ্রাম চলছে। আর যখন সে বলপয়েন্ট কলমটা বিক্রি করতে দিয়েছিল, তখন আমরা সদ্য স্বাধীন।

এরই ক’দিন পরে অন্য আদলে অনুরূপ ঘটনা ঘটল। কাওরানবাজার থেকে কাঁচাবাজার করে মনিপুরীপাড়ায় যাব বলে রিকশায় উঠেছি। তখন সোনারগাঁও ক্রসিংয়ের কাছে রাস্তাটা একটু ঢালু ছিল। রিকশা চলতে শুরু করলেই ফুলকপিটা ধাক্কা খেয়ে নিচে পড়ে গেল। এর মধ্যে রিকশা ২৫-৩০ গজ চলে গেছে। রিকশা থামার পর পেছনে তাকিয়ে দেখি, এক সাইকেল আরোহী ওখানে থেকে ফুলকপিটা উঠিয়ে তার হ্যান্ডেলের সাথে বাঁধছে। ভাবলাম, আমায় দেবে বলে সে হয়তো উঠাচ্ছে। তার দিকে তাকিয়ে একটু স্মিত হাসলামও। কিন্তু সে সাইকেল চালিয়ে ফুলকপিটা নিয়ে চলে গেল। তখন আমরা স্বাধীন হয়েছি, সর্বত্র আনন্দের জোয়ার। আমার মনে পড়ল, দুই বছর আগের কথা। তখনো সোনারগাঁওয়ের সামনে দিয়ে রেললাইনটা ছিল। কাওরানবাজার থেকে বাজার নিয়ে রিকশা করে বাসায় যাচ্ছিলাম এবং ওখানে রাস্তার গর্তে হোঁচট খেয়ে বাঁধাকপিটা পড়ে গিয়েছিল। এক সাইকেল আরোহী সেটা উঠিয়ে চিৎকার করে বলছিলেন, ‘ভাই, আপনার বাঁধাকপিটা পড়ে গেছে’। তিনি সেটা আমাকে দিয়ে সাইকেলটা চালিয়ে চলে গেলেন। তখন স্বাধীনতা সংগ্রামে উত্তাল শহর।

এই দু’টি ঘটনা আমার মনে একটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। তা হলো, কেন একজন সৎ মানুষ (আমাদের পিয়নটি) স্বাধীনতার বিশাল ঘটনার পর অসৎ কাজ করতে কষ্ট পেল না? আবার আমাদের সমাজের এবং দেশের বহুলপ্রচলিত প্রথা বা অভ্যাস- কোনো কিছু পড়ে থাকলে, তা তার মালিককে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টাটা হারিয়ে গেল কেন?

তখন প্রশ্ন জাগল, মানুষের জীবনদর্শন পাল্টে গেছে কতখানি? তাই জানাশোনা ব্যক্তিদের নিয়ে একক গোপন অনুসন্ধান চালালাম। একদিন লক্ষ করলাম, একজন ছাত্র তার শিক্ষককে একটা সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিলো। তারপর পকেট থেকে দুটি সিগারেট বের করে একটি শিক্ষককে দিলো এবং আরেকটি নিজের ঠোঁটের মাঝে রেখে আগুন জ্বালাতেই, শিক্ষক তার সিগারেটটা মুখে পুরে তাতে আগুন ধরালেন। সত্যি বলতে কি, মানসিকভাবে ধাক্কা খেলাম। চেনা দুনিয়াটা যেন অন্য রকম লাগল।

এই অনুসন্ধানের আরেকপর্যায়ে গ্রামে গেছি। বাল্যবন্ধুর সাথে দেখা। দাড়ি রেখেছে। অনেক কথা হলো। লক্ষ করলাম, সে সত্য-মিথ্যা-অবাস্তব বিষয়ের বিশেষ কোনো পার্থক্য করছে না। অথচ ছোটবেলায় এ বন্ধু কেউ মিথ্যা কথা বললে তার হাতের ছোঁয়া পানির গ্লাসে মুখ পর্যন্ত দিত না। তাকে বললাম সে কথা। জিজ্ঞেস করলাম, এমনভাবে সে কেমন করে বদলে গেল। সে বলল, ‘দেখছিস না, এখন আমি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছি। সে তখন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় হোমরা-চোমরা। তখন মনে হলো, শুধু সময়ই না, রাজনীতিও জীবনদর্শন বিশেষভাবে পাল্টাতে পারে এবং সেখানে ভালোমন্দের কোনো প্রশ্ন নেই। সত্য-মিথ্যার ভেদাভেদ নেই। তখনই মনে পড়ল এক বিখ্যাত পশ্চিমা দার্শনিকের উক্তি। তা হলো, ‘প্রগতিশীল শক্তিশালী সমাজের ভিত্তি হলো সত্য’ (ফাউন্ডেশন অব অ্যা ডাইনামিক সোসাইটি ইজ ট্রুথ)। অর্থাৎ যে সমাজের সদস্যরা মিথ্যে বলে, অন্যায় কর্মকাণ্ডে লিপ্ত বা স্পর্শে থাকে, তা প্রগতিশীল হতে পারে না এবং শক্তিশালী সঙ্ঘবদ্ধ হবে না। তিনি আরো বলেছিলেন, ‘মিথ্যা-আশ্রিত সমাজের নেতৃত্ব দেয় স্বৈরাচারী ক্ষমতাবানেরা।’

তাহলে আমাদের সমাজের সেই চেনা দুনিয়াটা কি নেই? যেখানে অন্যায়কারীদের প্রতিহত করতে না পারলেও নীরবে ঘৃণা করা হয়। আমার এক আত্মীয়া সেকালে পুলিশ ইত্যাদি চাকরিরতদের যত প্রস্তাব আসে তা ফিরিয়ে দেন। কারণ, সাধারণ্যে প্রচলিত ধারণা- এরা ঘুষ ইত্যাদিতে অভ্যস্ত।
তাহলে সমাজ সত্যকে তেমন পাত্তা দেয় না? এক একক অনুসন্ধান চালালাম। ১৫ দিন ধরে বাসে চলে তিন বয়স গ্রুপের (৩৫, ৩০ এবং ২০ বছরের) ১০৫ জনকে একটি প্রশ্ন করলাম একটা শর্তে। তা হলো, এ বিষয়টি শিক্ষক আলোচনা করেছেন কি না বা তারা পাঠ্যপুস্তকে পড়েছে কি না। পরিবারে কিংবা বাবা-মা এ আলোচনার মাঝে আসবে না। বিষয়টা হলো- ‘সদা সত্য কথা বলিও’। জবাব যা পেলাম, তা আমায় বিস্মিত ও অভিভূত করল। তারা বলল, ‘পাঠ্য-পুস্তকেও এ কথা পড়িনি এবং শিক্ষক এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেননি।’ তবে বাবা-মা সর্বদা সত্য বলার জন্য চাপ দিতেন।

তাদের এ প্রশ্ন করার পেছনের কারণটি হলো, একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এখন অনেক প্রচলিত ধারণা পাল্টে গেছে। তার একটি হলো, আজকের শিশু ও মানুষের ওপর পরিবেশের প্রভাব একচ্ছত্র। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবেশ দ্বারা চালিত হয়। পরিবার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দর্শকের ভূমিকায় নীত হয়। তাই এই ১০৫ জনকে পরের প্রশ্ন ছিল, তাহলে সত্যকে কিভাবে দেখছে? তারা প্রায় একস্বরেই বলল, ‘সত্য বললে লাভ হলে তা বলি, নতুবা অন্য কথা বলি।’ তারা বলেনি, মিথ্যে বলে। এক কথায়, তারা সত্যকে লাভ বা লোকসানের নিক্তিতে বিচার করে থাকে। এই সাধারণ যাত্রীদের সাথে আলোচনাকালে একটি কথা বারবার উঠে এলো তা হলো, সত্য এখন পরাজিত এবং তার প্রতিপক্ষ রাজ দখল করে আছে। এখন এ দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ ৩৫ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ বলা যায় (যদি এই ১০৫ জনকে জনমনের প্রতিনিধি ভাবা যায়) বেশির ভাগ মানুষ সত্যকে লাভ-লোকসানের নিক্তিতে বিচার করে। কী ভয়াবহ অবস্থা! সেই চিরচেনা নৈতিকতার স্থান হারিয়ে যাচ্ছে বা গেছে।

বিখ্যাত মার্কিন লেখক কলামিস্ট রবার্ট ফিস্ক তাই তার এক প্রবন্ধে বলেছেন, ‘আমরা প্রাক সত্য বা সত্যপূর্ব কোনো বিশ্বেই করিনি বা করি না। আমরা সর্বদা মিথ্যার সায়রে ডুবে আছি।’ তার এ মন্তব্য এসেছে সারা বিশ্বের সংঘর্ষ-সঙ্ঘাত, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাতের ওপর আলোচনার শেষে। এসব বিষয়ে মিথ্যের ছড়াছড়ি, সত্য স্থানই পাচ্ছে না। বরং যারা প্রতিহিংসা এবং অত্যাচারের বলি, তারাই অভিযুক্ত হচ্ছে; বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব। আইরিশ টাইমসের আলোচক ফিনটান ও’টুলে সম্ভবত এক মন্তব্যে বিশ্বের বর্তমান চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, বিশ্বনেতাদের কারণে এখন বিশ্ব মিথ্যার সাগরে ডুবে আছে। এখান থেকে উদ্ধারের আশা কম। ফিস্ক বলেছেন, ‘যে যত শক্তিশালী, সে তত বড় নির্লজ্জ মিথ্যা বলছে। প্রতিবাদীরা সবসময় নির্যাতিত হচ্ছে।’

ইন্টারনেটের প্রতিষ্ঠাতা টিম বার্নাস লি এক বক্তব্যে তার হতাশা উল্লেখ করে বলেছেন, আশা ছিল ইন্টারনেটটা একটা মুক্ত এলাকা হবে যেখানে সবাই তাদের বক্তব্য মন খুলে আলোচনা করবে। কিন্তু এখন তার প্রায় সর্বাংশই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ফলে সত্য প্রায়ই আত্মহত্যা করছে। তিনি লিখেছেন, ইন্টারনেট এখন আর নিরপেক্ষ থাকতে পারছে না। এর পরিবেশক, পরিচালকেরা ক্ষমতাসীনদের ইশারাতেই চলতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে নেতৃত্ব দিচ্ছে সরকার এবং বিভিন্ন করপোরেশন শুধু লাভ আর ক্ষমতার জন্য। আরো ভয়ঙ্কর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন ব্রডকাস্ট ব্লুর পরিচালক সু উইলসন তার ‘ভুয়া খবরের কেবল শুরু’ (ফেক নিউজ ইজ অনলি দ্য বিগিনিং) প্রবন্ধে। তিনি অভিযোগ করেছেন, মার্কিন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এফসিসি (ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশন) এই মিথ্যা প্রচারে সহায়তা দিচ্ছে। কোনো প্রতিবাদ, সমালোচনা বা নিন্দা যা ক্ষমতাবানদের কাছে গ্রহণীয় নয়, তা তারা সেন্সর করছে। ফলে বিশ্ব শুধু পাচ্ছে নিয়ন্ত্রিত প্রচার যার বিরাট অংশই মিথ্যাশ্রিত। তবে সু বলেছেন, একপর্যায়ে এসে মিথ্যা নিশ্চয়ই পরাজিত হবে। তখন চেনা দুনিয়াটা হয়তো তত দ্রুত হারাবে না।

Logo

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,    
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫