Naya Diganta

এ দেশের রাজনীতিতে তরুণ নেতৃত্ব আসুক নেমে

সাধন সরকার

০৪ ডিসেম্বর ২০১৭,সোমবার, ১৮:৫২


১৯৪৭ সালের পর থেকে প্রায় ৬৯ বছর এবং ১৯৭১ সালের পর ৪৫ বছর অতিক্রমের পরও রাজনীতিতে ইতিবাচক সংস্কৃতির ধারা এখনো গড়ে ওঠেনি। কিন্তু পেছনে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই ’৫২-এরর ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান ও সর্বোপরি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। যুগে যুগে তরুণেরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তাদের নেতৃত্বের গুণে কাক্সিক্ষত ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। আমাদের দেশে ষাট-সত্তর দশকের রাজনীতির লক্ষ্য ছিল জনগণের ও দেশের জন্য কল্যাণকর কিছু করা। 

যুক্তরাজ্যের ইকোনমিস্ট গ্রুপের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্ট ইউনিট’- এর নবম ‘বৈশি^ক গণতন্ত্র সূচক’-এ ১৬৫টি সার্বভৌম দেশ ও দু’টি অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। অর্থাৎ বাংলাদেশ ‘হাইব্রিড’ তথা সঙ্করধারার গণতান্ত্রিক দেশের শ্রেণিভুক্ত। সহজ কথায় বলতে হয়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিকব্যবস্থা খুব একটা ভালো নয়। রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এ দেশ অনেক পিছিয়ে। অন্যান্য সেক্টরে তরুণদের অংশগ্রহণ থাকলেও কেন রাজনীতিতে তরুণদের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না? বেসরকারি এক তথ্য মতে, দেশের অর্ধেকের বেশি তরুণ-তরুণী রাজনীতিতে তাদের অনাগ্রহের কথা প্রকাশ করেছে, যা দেশের জন্য অশনি সঙ্কেত।
উপমহাদেশের রাজনীতিতে বহু আগে থেকেই তরুণদের অংশ নেয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে তেমনটি হয়নি। সত্যিই এই জায়গায় আমরা দিনের পর দিন পিছিয়ে যাচ্ছি! এ দেশের রাজনীতিতে পরমতসহিষ্ণুতা, সহনশীলতা ও ঐক্য থাকলেও তা মন্দের ভালো। একদল এক কথা বলল, তো আরেক দল তার বিরোধিতায় নেমে পড়ল। তা হোক সেটা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি কিংবা অন্য কোনো বিষয়ে।

রাজনীতিতে নীতিহীনতা, গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার, কালো টাকার প্রভাব, দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয়, সহনশীলতার অভাব ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ ভালো ফল দেয় না। রাজনীতিতে গুণগত ও ইতিবাচক পরিবর্তনে এবং দেশের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা অর্জনে এখন তরুণ নেতৃত্ব আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরুণেরা এখন ভবিষ্যৎ নয়, তরুণেরা জাতির বর্তমান হতে চায়। এখন তারা দেশের জন্য কিছু করতে চায়। এই তরুণদের হাত ধরে স্বৈরাচার পতনের ডাক এসেছিল। এই তরুণ-তরুণীরা শাহবাগে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যের সূচনা করেছিল।

রাজনীতি হলো প্রবহমান নদীর মতো। ভালো মানুষ বা তরুণ নেতৃত্ব না এলে রাজনীতির জায়গা ফাঁকা থাকবে না। খারাপ নেতৃত্বের দ্বারা তা পূর্ণ হয়ে যাবে। তরুণ নেতৃত্ব যে আসছে না তা নয়; কিন্তু তারা টিকতে পারছে কই! তরুণ-তরুণীদের মাথায় অনেক প্রশ্ন খেলা করে, দেশের রাজনীতিতে কি সুদিন ফিরবে? দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা কি বাড়বে? কবি আবুল হাসানের কাব্যগ্রন্থের মতো বলতে হয়, ‘রাজা যায় রাজা আসে’। কিন্তু বাস্তবে সুদিন আর ফিরে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যায়, যারা ভালো রেজাল্ট করে কিংবা যাদের মধ্যে একটু দেশপ্রেম ও মানবতা লক্ষ্য করা যায় তারা রাজনীতিতে আসতে চায় না। এখানে দোষটা কাদের? বর্তমান রাজনীতির, নাকি এখনকার তরুণ-তরুণীদের!

গত বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালে কমনওয়েলথ ‘বিশ্ব মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকের’ আদলে বৈশি^ক যুব উন্নয়ন সূচক বা ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে (ওয়াইডিআই) বাংলাদেশ রাজনীতিসহ অন্যান্য কয়েকটি সূচকে ১৮৩টি দেশের মধ্যে ১৪৬ অবস্থান নিয়ে নিচের সারিতে। এখানে আরো বলা হয়েছে, রাজনীতিতে তরুণদের অংশ নেয়া কমছে। বর্তমানে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয়ব্যবস্থা মিলিয়ে যে পরিবেশ তা মোটেই তরুণদের রাজনীতিতে আকৃষ্ট করে না। রাজনীতিতে আকৃষ্ট করার মতো ‘রোল মডেল’ তরুণদের সামনে এখন আছে বলে মনে হয় না। ২৬ লাখ তরুণ এখন বেকার। এই বিপুলসংখ্যক তরুণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত হতে তো পারছেই না বরং তরুণদের একটি বড় অংশ রাজনীতির প্রতিও অনাগ্রহী হয়ে উঠছে।

শাসকগোষ্ঠীরা বা নীতিনির্ধারকেরা চায় না এ দেশের শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা রাজনীতিতে আসুক! কেননা পরিবর্তনকে অনেকে ভয় পায়। দিন দিন রাজনীতি ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যাচ্ছে। স্বার্থের রাজনীতি ও দলীয় প্রভাবের রাজনীতি এখন দৃশ্যমান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সমাজ যখন রাজনৈতিকভাবে অসচেতন হয়, তখন তা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কখনো শুভ হতে পারে না। এই তরুণদেরকেই এখন সব অন্যায়ের প্রতিবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের শক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়ে কাজ করতে হবে। সংস্কৃতির বিকাশ সাধন এবং উন্নয়ন স্থায়ী করতে হলে রাজনীতিতে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে। আর এ দায়িত্ব নীতিনির্ধারকদেরই নিতে হবে।

দার্শনিক জর্জ বার্নাড শ-এর কথাতে বলতে হয়, ‘নতুন কিছু করাই তরুণদের ধর্ম’। সত্যিই তরুণেরা নতুনের পূজারি। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী, বর্তমান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ওবায়দুল কাদের অতিসম্প্রতি একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘মেধাবীরা রাজনীতিতে না আসলে রাজনীতি মেধাশূন্য হয়ে যাবে।’ তিনি হয়তো চরম সত্য কথাটাই অকপটে স্বীকার করেছেন। কল্যাণকর রাজনীতির চর্চায় তরুণেরা নেতৃত্ব দিতে চায়। একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠন ও কার্যকর গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করতে হলে এবং রাজনীতিতে ইতিবাচক ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় তরুণ নেতৃত্বের অংশ নেয়া সবার আগে জরুরি। 

sadonsarker2005@gmail.com

Logo

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,    
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫