Naya Diganta

গদ্য কবিতার ছন্দ নিপুণতা

খন্দকার ফিরোজ আহম্মেদ

২৩ নভেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:৫৬


জীবন ছন্দময়। জীবনের প্রতিটা কাজ ছন্দময় না হলে জীবন তার স্বাভাবিক গতিতে চলে না। নদী পাহাড় সাগর মানুষের হাঁটাচলা-যেদিকেই তাকাই না কেন, প্রতিটি স্থানে আমরা একটা নিপুণ ছন্দ দেখতে পাই। আমাদের দেহেরও একটা রিদম আছে। হৃৎপিণ্ড একই ছন্দে চলছে মৃত্যু পর্যন্ত। ছন্দ ছাড়া কোনো কিছুই চলে না; কিন্তু ছন্দটার যখন পতন হয়, তখনই সব কিছু এলোমেলো বিষাদময় হয়ে ওঠে। কবিতার ক্ষেত্রেও বিষয়টা তেমনই। কবিতা মানেই ছন্দ। ছন্দ মানেই কবিতা।

কবিতার দুটো রূপ আমরা দেখতে পাই। পদ্য কবিতা এবং গদ্য কবিতা। কবিতা কাকে বলে? ‘যাহা দেখিতে কবিতার মতো, পড়িতে কবিতার মতো ও শুনিতে কবিতার মতো তাহাই কবিতা’ সংজ্ঞাটা শুনতে পড়তে এবং বলতে বেশ মজার। কিন্তু আসলেই তাই।
বাংলা কবিতার ইতিহাস অনেক লম্বা, ত্রিশের দশক পর্যন্ত প্রলম্বিত। প্রাচীন চর্যাপদ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত কবিতার আঙ্গিক ভাব ভাষা বিষয়ে অনেক কিছু সংযোগ হয়েছে। লেগেছে নতুনত্বের ছোঁয়া। বহু গড়াপেটার পর অতি আধুনিক যুগে গদ্যে ছন্দ এসে স্থিরতা পেয়েছে কবিতা। বর্তমান আধুনিক কবিরা গদ্যছন্দে লিখতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। রবীন্দ্রনাথের আগে কবিতা বলতে মাত্রা ছন্দবদ্ধ পদ্য কবিতাকেই বোঝাতো। কিন্তু ছন্দ মেলাতে গিয়ে কবি মনের ভাব প্রকাশে ছন্দ মেলানোর জন্য অনেক সময় যথাযথ শব্দ খুঁজে পান না এবং এই কাজটা খুবই মুশকিল, তখন মাত্রার বিষয়টাকে এড়িয়ে গিয়ে জটিল এক অন্ত্যমিলের কবিতা রচনা করলেন, যেটাকে আমরা গদ্য কবিতা বলি। আমি কিছু কবির কথা বলেছি, যাদেরকে আনাড়ি বলা যায়- সবাই নয় এই দলে। তারা কবিতা লিখছেন ঠিকই কিন্তু কবিতার ভাষা, কবিতার ছন্দ অন্ত্যমিল পাঠকের বোধগম্য হচ্ছে না। এই অবোধগম্যতার কারণে অনেকে গদ্যছন্দের কবিতাকে কবিতাই মনে করেন না। আসলে কবিতা আকারে সাজালেই তাকে কবিতা বলে না, পড়তেও কবিতার মতো লাগতে হবে।
আগেই বলেছি ছন্দ ছাড়া কবিতার অস্তিত্ব নেই। গদ্য কবিতারও ছন্দ আছে। কবি তার মনের ভাবকে পাঠকের চাহিদা মতো ছোট বড় লাইনে সাজিয়ে কাব্যিক ভাষায় উপস্থাপন করেন। এর মাঝেই ছন্দ বিরাজ করে। পাঠক কবিতা পাঠ শুরু করলেই বুঝতে পারে এটা কিভাবে পাঠ করতে হবে, কিভাবে পাঠ করলে এর রসাস্বাদন করা যাবে। পাঠক যদি কোনো কবিতা থেকে এই ছন্দের রসাস্বাদন করতে পারে, তাহলেই সেটা সফল গদ্য কবিতা। সাগরে একটার পর একটা ঢেউ ওঠে, ঢেউ ভাঙে; বড় ঢেউয়ের মাঝে আবার ছোট ছোট ঢেউ তালে তালে বড় ঢেউয়ের সমান্তরালে মিশে যায়, গদ্য কবিতার ছন্দটাও তেমনি। কবিতার ভাব ভাষা সব ঠিক থাকার পরেও যদি পড়তে ছন্দময় না হয়, তাহলে বুঝতে হবে শব্দ বিন্যাসে জটিলতা হয়েছে, তখন সেটা কবিতার আকারে হয়েও কবিতা হয়নি। এখানেই একজন কবির দক্ষতা নিরূপণ হয়।
নজরুল-রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ একসময় গদ্য কবিতার ঘোর বিরোধী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ স্বরূপ তাঁর সম্পাদিত একটা পত্রিকায় গদ্য কবিতা প্রকাশ বন্ধ করেছেন, নজরুল ইসলাম তো গদ্য কবিতার বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ কবিতাও লিখেছেন। পরবর্তীতে তাঁরা বুঝেছেন যে, কবিতার গদ্যরীতি কবিতার অন্যতম প্রকাশ। রবীন্দ্রনাথ নিজেই গদ্য কবিতা লিখে গেছেন। গদ্য ছন্দে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা-‘হঠাৎ দেখা’
রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা,
ভাবি নি সম্ভব হবে কোনোদিন।
আগে ওকে বারবার দেখেছি
লালরঙের শাড়িতে
দালিম ফুলের মতো রাঙা;
আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়,
আঁচল তুলেছে মাথায়
দোলনচাঁপার মতো চিকনগৌর মুখখানি ঘিরে। (আংশিক)
জীবনানন্দ, রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, হাসান হাফিজুর রহমান, শহীদ কাদরী, আবুল হোসেন সফলভাবে গদ্যছন্দে কবিতা রচনা করেছেন, যা বাংলা সাহিত্যে গদ্য কবিতার স্কেল বললে ভুল হবে না। গদ্যছন্দের কবিতার কিছু উদাহরণ-কবি জীবনানন্দ দাস
অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি,
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।
শহীদ কাদরী ‘এবার আমি’
আমি করাত-কলের শব্দ শুনে মানুষ।
আমি জুতোর ভেতর, মোজার ভেতর সেঁধিয়ে যাওয়া মানুষ
আমি এবার গাঁও-গেরামে গিয়ে
যদি ট্রেন-ভর্তি শিউলি নিয়ে ফিরি
যে লোহা, তামা, পিতল এবং পাথর
তোমরা আমায় চিনতে পারবে তো হে!’
অবেলায় শঙ্খধ্বনি-রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ
‘অতোটা হৃদয় প্রয়োজন নেই,
কিছুটা শরীর কিছুটা মাংস মাধবীও চাই।
এতোটা গ্রহণ এতো প্রশংসা প্রয়োজন নেই
কিছুটা আঘাত অবহেলা চাই প্রত্যাখান।
সাহস আমাকে প্ররোচনা দেয়
জীবন কিছুটা যাতনা শেখায়,
ক্ষুধা ও খরার এই অবেলায়
অতোটা ফুলের প্রয়োজন নেই।’
তবে গদ্য কবিতায় সবচে বেশি যশ করতে পেরেছেন কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। রবীন্দ্রনাথের বলয় ভেদ করে তিনি এই রীতিতে কবিতা রচনা করেন। ১৯০১ সালে কলকাতার হাতিবাগানে জন্ম নেয়া এই কবি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি। ‘কবি সুধীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বিশ্বকবি বলেছিলেন; মননশীল তাঁর মন, তিনি মনন বিলাসী। তিনি বাংলা ভাষার একজন আধুনিক প্রধান কবি। তাঁকে কেউ কেউ বাংলা কবিতার ‘ধ্রুপদী রীতির প্রবর্তক’ বলে থাকেন।’ (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত-জীবন ও সাহিত্য, আলোচক-নীলরতন চট্টপাধ্যায়)। এখানে ‘ধ্রুপদী রীতির প্রবর্তক’ বলতে কবিতায় গদ্যরীতির কথা বলা হয়েছে। এই আধুনিক কালে এসেও তাঁর কবিতায় চিন্তা চেতনার স্বাতন্ত্র্য, ভাবনা, জীবনদর্শন, রোমান্টিকতা, কবিতার শব্দ প্রয়োগ এবং বাক্যগঠন তাঁর গদ্য কবিতাকে আলাদা বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছে। তাঁর একটি কবিতা ‘নাম’ সুধীন্দ্রনাথ দত্ত।
‘চাই, চাই, আজও চাই তোমারে কেবলই।
আজও বলি,
জনশূন্যতার কানে রুদ্ধ কণ্ঠে বলি-
অভাবে তোমার
অসহ্য অধুনা মোর, ভবিষ্যৎ বন্ধ অন্ধকার,
কাম্য শুধু স্থবির মরণ।
নিরাশ অসীমে আজও নিরপেক্ষ ভবন আকর্ষণ
লক্ষ্যহীন কক্ষে মোরে বন্দী করে রেখেছে প্রেয়সী;
গতি-অবসন্ন চোখে উঠিছে বিকশি
অতীতের প্রতিভাস জ্যোতিষ্কের নিঃসার নির্মোকে।
আমার আগের স্বপ্নলোকে
একমাত্র সত্তা তুমি, সত্য শুধু তোমারই স্মরণ।’
১০ পৃষ্ঠার পর

উপরে যে কবিতার অংশগুলো উল্লেখ করা হলো, সে কবিতাগুলো নিজ নিজ কবিদের সময়কালের অন্যতম সেরা রচনা এবং গদ্যছন্দে রচিত আদর্শ এবং পরিপুষ্ট কবিতা। এই কবিতাগুলোর রচনা বৈশিষ্ট্যের দিকে খেয়াল রেখে গদ্যছন্দে কবিতা রচনা করলে ছন্দে বিচ্যুতি হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে এবং শেখা যায় অনেক। আমরা ইদানীং অনেক গদ্য কবিতা পড়ি, সেটা ভালো লাগার পরিবর্তে বিরক্তি উৎপাদন করে। এসব কবিতার রচয়িতারা মনে করেন নিবন্ধ প্রবন্ধকে একটু সাজিয়ে কবিতার আকারে লিখলেই কবিতা হয়ে গেলো। আসলে তা নয়। বর্তমানকালের কবির গদ্য রচনায় সেই ছন্দ পাওয়া যায় না বলেই গদ্য কবিতা সঠিক ছন্দে পাঠকের মনে দোলা দেয় না। ছন্দের যে রীতি আছে সেটা না মেনে কবিতা রচনার কারণেই নজরুল রবীন্দ্রনাথ জীবনানন্দ আমাদের কবিকুলে জন্ম নিচ্ছেন না। সব মানুষই হাঁটে। কেউ বেঁটে-তার হাঁটার ছন্দটা এক রকম, কেউ লম্বা- তার হাঁটার ছন্দ অন্য রকম; কিন্তু প্রত্যেকের হাঁটার একটা তাল লয় মাত্রা ছন্দ আছে। গদ্য কবিতার বেলায়ও বিষয়টা তেমনি। সবার রচনা যে একই ধাচের হবে, তার কোনো মানে নেই; রচনার ভিন্নতা থাকতেই পারে। যে যেভাবে রচনায় পটু, সে সেভাবে রচনা করবে, কিন্তু অন্তর্নিহিত ছন্দটা ঠিক থাকতে হবে। অনেকে কিবতায় একটু মিস্টিরিয়াসিটি না থাকলে তাতে রস থাকে না। কবিতায় এই মিস্টিরিয়াসিটি বুঝতে যদি পাঠকের প্রাণান্তকর অবস্থা হয়, তাহলে কবিতার অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সে প্রশ্নটা থেকেই যায়। আর একটা কথা মাথায় রাখা প্রয়োজন যে, খুব উচ্চমার্গের শব্দ প্রয়োগের কবিতা পাঠের মতো শিক্ষিত লোকের সংখ্যা দেশে অপ্রতুল।
সাধারণ অল্পশিক্ষিত লোকের বোধগম্যতার বিষয়টা বোধে নিয়ে গদ্যরীতিতে কবিতা রচনা করলে পাঠকপ্রিয়তা পায় দ্রুত। সর্বোপরি একটা কথা সবাই মানবেন যে, যে যত নিয়ম মেনে কবিতাই রচনা করুন না কেন, পাঠক যদি সেটা পাঠে এবং শ্রবণে আনন্দ না পায়, যদি সাবলীলতা না থাকে, যদি পঠনে হোঁচট খেতে হয়, তাহলে তাকে আর যা-ই বলি অন্ততঃ কবিতা বলা যাবে না।

Logo

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,    
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫