Naya Diganta

জিয়াউর রহমানকে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা ধারণ করেন সিইসি

রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতার উদ্যেগ নেবে না ইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৬ অক্টোবর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:২৭


কে এম নূরুল হুদা

কে এম নূরুল হুদা

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিবাদমান ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার কোনো উদ্যোগ নির্বাচন কমিশন (ইসি) নেবে না বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা।

আজ বৃহস্পতিবার সংলাপ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সিইসি একথা জানান।

সংবাদ সম্মেলনে সংলাপে রাজনৈতিক সমঝোতার প্রস্তাব এসেছে, এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেবেন কী না- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি সরাসরি উত্তরে বলেন, না। এমন উদ্যোগ নেবো না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ উদ্যোগ নেয়ার কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবে সমাধান হওয়া উচিত। এ উদ্যোগে আমরা (ইসি) যেতে চাই না।
বিদ্যমান সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আগামী নির্বাচন আয়োজন করবে ইসি। সংসদ ভেঙ্গে নির্বাচনের বিষয়ে সরকারকে আইন সংশোধনে বাধ্য করা বা চাপ সৃষ্টির কোনো সুযোগ নির্বাচন কমিশনের নেই।

সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা উল্লেখ করে দেয়া বক্তব্য নিজেও ধারণ করেন বলে সিইসি বলেন, কাউকে খুশি করার জন্য তিনি এ বক্তব্য দেননি। এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও কোনো ব্যাখ্যা চাওয়া হয়নি।

১৫ অক্টোবর বিএনপির সাথে সংলাপে জিয়াউর রহমানের গুণগান করায় সমালোচনার মুখে পড়েন সিইসি। এ ধারাবাহিকতায় সংলাপ বর্জন ও সিইসির পদত্যাগ দাবি করে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ১৮ অক্টোবর জানান, ইসির কাছে ব্যাখ্যা পেয়েছেন; সিইসি এ বিষয়ে ব্যখ্যা দেবেন।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন- এমন বক্তব্য এখনও ওউন (ধারণ) করেন কী না- এ সংক্রান্ত একাধিক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘হ্যাঁ। এখনও ওউন করি। আমি বিশ্বাস করি। এটা তথ্য ভিত্তিক বলেছি। বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যতদূর মনে পড়ে, জিয়াউর রহমান সাহেব ১৯৭৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর নতুন দল গঠন করেছিলেন। তার আগে ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত দেশে গণতন্ত্র ছিল না। তার আগে (১৯৭৫ সালের আগে) গণতন্ত্র ছিল। আমি বলেছিলাম, গণতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠা করেছেন, প্রতিষ্ঠা নয়। তার আগে বহুদলীয় গণতন্ত্র ছিল। (জিয়াউর রহমানের সময়ে) গণতন্ত্র আবার ফিরে এসেছে। সেই ভিত্তিতে ১৯৭৮ সালে বহুদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আওয়ামী লীগসহ বহু দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। বহু দল সংসদে যোগ দিয়েছিল। বহু দল সংসদ পরিচালনা করেছিল। কাউকে খুশি করার জন্য এটা বলিনি, তথ্য ভিত্তিক বলেছি।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, সংলাপে আওয়ামী লীগ এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা চায়নি। তবে আমরা যে বক্তব্য দিয়েছে তাতে হয়তো বুঝতে পেরেছেন আমাদের অবস্থান কী। এমন হতে পারে।

সিইসি বলেন, নির্বাচনের সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো চাপ এলে তা সরাসরি প্রত্যাখান করবো। সংলাপে উঠে আসা প্রস্তাব বই আকারে প্রকাশ করে তা রাজনৈতিক দল ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে পাঠাবেন বলেও জানান সিইসি।

দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করতে আইনে কোনো পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করবেন কী না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না, আইনে পরিবর্তন আনার দরকার নেই। যে আইন রয়েছে তাই যথেষ্ঠ। আইন প্রয়োগ করতে হবে।

তিনি বলেন, এক্ষেত্রে বাড়তি কোনো ব্যবস্থা নেয়ার দরকার নেই। যে আইন রয়েছে তাই প্রয়োগ করবো। কোনো কর্মকর্তা আইন অমান্য করলে শাস্তির বিধান রয়েছে। অর্থাৎ কারো অপরাধ প্রমাণ হলে তাদের শাস্তি পেতে হবে।

বর্তমান সংবিধানের আওতায় দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার বিষয়ে ইসি কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে কী না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা সাংবিধানিক বিষয়। সংবিধান পরিবর্তন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। এটা রাজনৈতিক বিষয়। এদেশেতো বহুমুখী নির্বাচন হয়েছে। যখন যে সরকার এসে যে নির্বাচন করার দায়িত্ব কমিশনকে দিয়েছে, সেভাবে নির্বাচন করেছে। যেমন বলা যায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে নির্বাচন হয়েছে। পাকিস্তান সরকারের সময়ে হ্যাঁ, না ভোট হয়েছে। বেসিক ডেমোক্রেসি হয়েছিল। অর্থাৎ যেই সময়ে সরকার যে আইন তৈরি করে দেয়, ইসি সেভাবে নির্বাচন করেছে। সেই আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সাংবিধান মেনে ইসিকে চলতে হয়।

এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, আশা করি বিএনপিসহ সব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। আমরা আন্তরিকভাবে চাই বিএনপিসহ সব দল নির্বাচনে আসুক। কারণ বিএনপি একটি বড় দল। আমরা বিশ্বাস করি, আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

সংলাপে অনেক রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রস্তাব এসেছে- সরকার তা বাস্তবায়ন না করলে ইসির ভূমিকা কী হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, যেসব বিষয় ইসির এখতিয়ারভুক্ত তা সরকার করবেই। তবে জটিল কিছু বিষয় যেমন সহায়ক সরকার, সংসদ ভেঙে দেয়াসহ সাংবিধানিক বিষয়গুলোর বিষয়ে সরকারকে চাপ দেয়া বা বাধ্য করার কোনো সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, ইসির এখতিয়ার যেগুলো সে বিষযে ইসি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবো।

বর্তমান আইনী কাঠামোতে সেনা মোতায়েন কোন প্রক্রিয়ায় হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, সেনা নিয়োগ কিভাবে হবে, তাদের দায়িত্ব কী হবে তা নির্ধারণ করবে ইসি। এ বিষয়ে সেটা বলার সময় এখনও আসেনি। নির্বাচন আসুক তখন পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেখা যাবে। তবে বিদ্যমান কাঠামোতে সেনা মোতায়েন করা যাবে।

সংলাপে সেনা মোতায়েন, সংসদ ভেঙ্গে দেয়াসহ অনেক প্রস্তাব এসেছে। এমন অবস্থায় সংলাপের পর ইসি ভারমুক্ত হলেন না কি চাপে আছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচন শেষ না করা পর্যন্ত আমরা ভারমুক্ত হই না। ভারতো আমাদের উপর থাকবে, চ্যালেঞ্জ থাকবে। সেগুলো সমাধান করতে হবে।

তফসিলের পর নির্বাচনী পরিচালনার দায়িত্ব সম্পূর্ণ মাঠ প্রশাসনের হাতে চলে যায়, তখন প্রশাসনের এসব লোক কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ মাঠ প্রশাসনের হাতে যাবে না। নিয়ন্ত্রণ যাবে এমন কথার দ্বিমত করি। সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইসির হাতে। তারা আমাদের সহায়ক শক্তি মাত্র। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদের বিধান বলে প্রজাতন্ত্রের সব কর্মকর্তা-কর্মচারি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের কর্মকর্তারাও নির্বাচনে সাহায্য ও সহযোগিতা করতে সাংবিধানিকভাবে বাধ্য এবং তারা তা করে আসছে। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ ধরনের সহযোগিতা নেয় ইসি।

তিনি বলেন, তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন পর্যন্ত ২-৩ মাস সময় লাগে। ওই সময়ে ১২ থেকে ১৩ লাখ জনবল দরকার হয়। এত জনবল স্থায়ীভাবে ইসির নেই। নির্বাচন কমিশনের এত জনবল সারাবছর পোষা সম্ভব নয়, দরকারও নেই। তাই নির্বাচনের সময়ে রিকুইজিশন দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারি, সেনা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োগ দেয়া হয়। তারা নির্বাচনে ইসিকে সহায়তা করে। তাদের উপর ইসির নিয়ন্ত্রণ থাকে ও থাকবে।

তিনি আরো বলেন, আরপিওতে একটি অধ্যায় রয়েছে, যেখানে নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে শাস্তি দেয়ার বিধান রয়েছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যেখানে আইনের ব্যত্যয় হবে সেখানে আইন অনুযায়ী শাস্তির বিধান কার্যকর করা হবে।
রাজনৈতিক দলের কমিটিতে নারীদের উপস্থিতির প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, সংলাপে নারীদের ভূমিকার বিরুদ্ধে যেসব প্রস্তাব এসেছে তা গ্রহণযোগ্য মনে হয় না।

ক্ষমতাসীন দলের সাথে সংলাপে ইসি সরকারের কাছে কিছু চেয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, আওয়ামী লীগ সংলাপে এসেছে রাজনৈতিক দল হিসেবে, সরকার হিসেবে নয়।

সীমানা পুনর্নির্ধারণ প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, সীমানা নির্ধারণের আইন প্রণয়নের কাজ করছে। তার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবো।

সংলাপের শুরুতে সিইসি কেএম নূরুল হুদা বলেন, সংলাপের মধ্য দিয়ে আমরা মূল্যবান ও দিকনির্দেশনামূলক সুপারিশ ও পরামর্শ পেয়েছি। আগামী নভেম্বরে এসব সুপারিশ ও পরামর্শ সংকলন করে ডিসেম্বরে বই আকারে প্রকাশ করা হবে। গত তিন মাসব্যাপী রাজনৈতিক দলসহ ৪৫টি সংগঠনের সাথে সংলাপ করেছি। সংলাপের মধ্য দিয়ে যে সুপারিশ অর্জন করেছি, সচিব সাহেব তা তিনভাগে বিভক্ত করে তা সংগঠন ও সংস্থাগুলোর সামনে উপস্থাপন করেছেন।

সেগুলো হচ্ছে- সাংবিধানিক সংশ্লিষ্ট বিষয় যেমন নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার, নির্বাচনকালে সংসদ ভেঙ্গে দেয়া ইত্যাদি। আইন বিষয়ক যেমন আরপিও সংশোধন, সীমানা নির্ধারণ আইন তৈরি করা ইত্যাদি। তৃতীয়ত: নির্বাচন কমিশনের করণীয় বিষয় যেমন নির্বাচনে সেনা নিয়োগ, আইনের সঠিক প্রয়োগ ও নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন। এভাবে চার শতাধিক সুপারিশ অর্জন করেছি।

এ সময় তিনি আরো বলেন, মাত্র সংলাপ শেষ করলাম। নিজেরা বসে এসেসমেন্ট করে দেখবো সুপারিশগুলোর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবো।

সংলাপের পর ইসিকে সরকার চাপে রাখবে না কি ইসি সরকারকে চাপে রাখবে- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, আমাদের কাছে সরকার বা কোনো মন্ত্রী, এমপির কোনো চাপ আসেনি। কখনও চাপ আসেনি। তবে রাজনৈতিক দলগুলো থেকে চাপ এসেছে, যা সবসময় আসে। কখনও রাজনৈতিক দল পুলিশ বা প্রিজাইডিং কর্মকর্তার বিষয়ে ফোন করেছি। তখন ভেরিফাই করে ব্যবস্থা নিয়েছি। কিন্তু কখনও সরকারের দফতর পক্ষ থেকে আলাদা করে চাপ আসেনি। আগামীতে চাপ এলে সরাসরি প্রত্যাখান করবো।

সুশীল সমাজের সাথে গত ৩১ জুলাই সংলাপে বসে ইসি। এরপর সাংবাদিকদের সাথে দুই দিন, ৪০টি রাজনৈতিক দল, পর্যবেক্ষক, নারী নেত্রী ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সাথে সংলাপ করে। প্রায় তিনমাসব্যাপী সংলাপ গত মঙ্গলবার শেষ হয়। ওই সংলাপের পর বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করলো ইসি। এ সময় চার নির্বাচন কমিশনার, ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Logo

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,    
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫