Naya Diganta

গুলিবৃষ্টি থেকে বেঁচে আসা রহিমুল যা জানালেন

নয়া দিগন্ত অনলাইন

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৪:৪৪


রহিমুল মুস্তফা

রহিমুল মুস্তফা

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও উগ্রবাদী বৌদ্ধদের আক্রমণে লণ্ডভণ্ড সংখ্যালঘু মুসলিম পরিবারগুলো। তাদের অনেককে হত্যা করা হয়েছে। যারা বেঁচে গেছেন তারা বহু কষ্টে, লুকিয়ে লুকিয়ে পাহাড়, জঙ্গল, নদী পার হয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে প্রবেশ করেছেন বাংলাদেশে।

তাদেরই একজন রহিমুল। রহিমুল এসেছেন রাখাইন রাজ্যের ফোইরা গ্রাম থেকে। কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি সেখান থেকে পালান। তিনি জানিয়েছেন সেনাবাহিনীর গুলিবৃষ্টি থেকে বেঁচে কিভাবে বাংলাদেশে পৌঁছেছেন। আর সেখানকার পরিস্থিতি, যা তিনি দেখে এসেছেন। কক্সবাজারের একটি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রহিমুলের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার সংবাদদাতা কেটি আরনল্ড।

রহিমুল কথায়, ‘আমার নাম রহিমুল মুস্তফা। আমার বয়স ২২ বছর। এখানে আসার আগে আমি একটি মাদরাসার ছাত্র ছিলাম। আমি আমার শিক্ষার পাশাপাশি ছোটছোট ছেলেমেয়েদেরও শিক্ষা দান করতাম। আমার এলাকার অধিকাংশ লোক নিরক্ষর ছিল। তাই আমি চেষ্টা করতাম শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে।

আমার ইচ্ছা ছিল আমি একজন শিক্ষক হবো। সেনাবাহিনীর আক্রমণের আগ পর্যন্ত আমি আমার গ্রামে সুখেই ছিলাম।

তখন রাত ৩টা। সেনাবাহিনী আমাদের গ্রামে বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু করলো এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতে থাকলো। আমরা বাড়ি থেকে বের হতে পারছিলাম না। কারণ তারা যদি আমাদের দেখে ফেলে তাহলে তারা আমাদেরকে গুলি করবে। তাই আমরা বাড়ির ভেতরে লুকিয়ে ছিলাম। একসময় তারা আমাদের বাড়িতে পৌঁছে জানালা দিয়ে গুলি করতে লাগলো। একটি গুলি আমার হাঁটুতে লাগে। আমাদের গ্রামের বহু মানুষ সে রাতে মারা যায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে তিন প্রতিবেশীর মৃত্যু দেখেছি।

আমার বাবা এবং ভাই আমাকে একটি চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু হাসপাতালে আমাদের ঠাঁই হয়নি। তাই আমার আত্মীয়স্বজন আমাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসে। সেনাবাহিনীর ভয়ে তারা আমাকে নিয়ে আসে পাহাড়ি পথে লুকিয়ে লুকিয়ে।

সেটা ছিল দীর্ঘ এবং কষ্টকর যাত্রা। আমার ক্ষত গুরুতরভাবে সংক্রামিত হয়ে ওঠে। আমি এই ভেবে কষ্ট পাচ্ছি নাম যে, আমার পরিবার শুধু আমাকেই নিয়ে আসতে পেরেছে, আর কিছু আনা সম্ভব হয়নি।

আমি কৃতজ্ঞ যে, আমরা নিরাপদেই বাংলাদেশে পৌঁছতে পেরেছি এবং এখানে আমি এমএসএফ ডাক্তারদের (ডক্টরস উইদাউট বর্ডার, যাদের সাথে ফরাসি সম্পৃক্ততা রয়েছে)। কিন্তু এখনো আমাদের কোনো থাকার জায়গা নেই। নেই কেউ ভবিষ্যতও।

আমাদের তখনই ভবিষ্যত হতে পারে, যদি আমরা আমাদের বাড়িতে ফিরতে পারি। কিন্তু বড়ই কষ্টের বিষয় হলো, আমাদের চোখে সে আলো দেখতে পাচ্ছি না। আমরা বাড়ি ফিরে যেতে চাই এবং আমরা শান্তি চাই। আমার বিশ্বাস, বিশ্ব আমাদের দুর্দশা দেখছে এবং তারা অবশ্যই আমাদেরকে সাহায্যে এগিয়ে আসবে।’

বিশ্ববাসীর প্রতি রোহিঙ্গা বালক জসিমের আহ্বান

মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর অত্যাচার, নিপীড়ন থেকে বাঁচতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান সীমান্ত পাড় হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। অনেকে এখনো আছে সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে, পাহাড়ে, বন-জঙ্গলে লুকিয়ে। সীমাহীন কষ্ট করে যারা বাংলাদেশে আসতে পেরেছেন তারা এখানে নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করছেন। এদেরই একজন ১২ বছরের স্কুলছাত্র জসিম। আল-জাজিরাকে জানিয়েছে সে সেখানে তাদের উপর অত্যাচার ও তাদের পালিয়ে আসার গল্প।

রাখাইন থেকে ১৩ দিন ধরে কষ্টকর পথচলার পর মায়ের সাথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে জসিম। ইংরেজিতে কিছুটা পারদর্শী জসিম বিশ্ববাসীকে তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে।

জসিমের ভাষায়, ‘আমার নাম জসিম। আমার বয়স ১২ বছর। সহিংসতা শুরু হওয়ার আগে আমি স্কুলে পড়ছিলাম। আমার প্রিয় বিষয় ছিল ইংরেজি। কারণ আমি ভাবতাম, যদি আমি ইংরেজি বলতে পারি তাহলে আমি বিশ্বের বিভিন্ন জনগণের সাথে যোগাযোগ করতে পারব। তাদের কাছে তুলে ধরতে পারব আমার মতামত। আশা করি আমি শিগগিরই আবার আমার লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারব। কারণ আমি একজন শিক্ষক হতে চাই।’

‘যখন সেনাবাহিনী আমাদের গ্রামে ঢুকলো, তখন আমরা দৌড়ে পালালাম। আমি দেখলাম অনেক সৈন্য; ১০০ থেকে ২০০ হবে। তারা আমাদেরকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়লো এবং আমাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিল। আমি খুবই ভয় পেয়েছিলাম’, বলছিল জসিম।

‘আমরা একটি জঙ্গলে লুকিয়ে পড়ি এবং পরে বাংলাদেশের দিকে হাঁটতে থাকি। ১৩টি দিন আমাদেরকে বন জঙ্গলে কাটাতে হয়েছে।

এটি ছিল খুবই কঠিন একটি ভ্রমণ। আমাদেরকে হেঁটে অতিক্রম করতে হয়েছে বড় বড় পাহাড় ও কিছু ছোট নদী। আমি সব সময়ই ভীত ছিলাম যে, সেনাবাহিনী আমাদেরকে বাংলাদেশে প্রবেশের আগেই না ঘিরে ফেলে। এ পথে আমাদেরকে খুবই সতর্ক থাকতে হয়েছে। কারণ সেনাবাহিনী বিভিন্ন স্থানে মাটিতে ছোট ছোট বোমা পুঁতে রেখেছে।

আমি খুবই ব্যাথিত যে, আমার গ্রামটি আর সেখানে নেই। আমরা কিছুই আনতে পারি। তাই সবই হারালাম। আমি আমার মায়ের সাথে এসেছি। আমার বাবা এখনো রাখাইনে আছে। তিনি আমাদেরকে বলেছেন নিজেদের রক্ষা করতে এবং তিনি পরে আমাদের কাছে আসবেন। কিন্তু আমরা জানি না তিনি কোথায়, কেমন আছেন। তার কোনো খবরও পাওয়া যাচ্ছে না।

আমি উদ্বিগ্ন যে, সেনাবাহিনী তাকে ধরে বোমা মেরে হত্যা করেছে। আমরা নিরাপদ এজন্য আনন্দিত কিন্তু এখানে বসবাস করাও খুব কঠিন। কারণ এখানে বসবাস করার মতো কোনো ঘর নেই। আমাদেরকে ভেজা মাটিতে ঘুমাতে হচ্ছে।

বিশ্ববাসীর প্রতি আমার বার্তা, আমরা মিয়ানমারের নাগরিক। যদি তারা আমাদেরকে নাগরিক ঘোষণা করতো তাহলে আমরা ভালো থাকতে পারতাম। এটাই আমাদের চাওয়া।’

চট্টগ্রামের একটি ক্যাম্প থেকে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আল-জাজিরার সাংবাদিক কেটি আরনল্ড।

Logo

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,    
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫